বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর প্রতিবেশীসহ অনেক উন্নত দেশের জন্য বিস্ময়কর ঘটনা বলে মন্তব্য করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে কম্পিউটার আমদানিতে শুন্য শুল্ক সুবিধা প্রাপ্তি, মোবাইল ফোনের মোনোপলি ব্যবসা ভেঙ্গে দেয়া এবং দেশে এক দেশ এক রেট ইন্টারনেট বাস্তবায়নকে এর ভিত্তি বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।
সোমবার রাতে গুলশানের একটি রেস্তোরায় আইসিটি পাইওনিয়ার ক্লাব ‘ডিজিটাল বিপ্লব ও বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন মোস্তাফা জব্বার। সভায় আব্দুল্লাহ এইচ কাফির
‘আবর্ত এনালগ থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ ও আমরা’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এই বইকে ঘিরেই তথ্যপ্রযুক্তির শক্তিতে ডিজিটাল বাংলাদেশ হয়ে ওঠার পেছনের মানুষগুলোর কথা বারবারই ফিরে আসে বক্তাদের কণ্ঠে।
এসময় বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এস এম কামাল, বেসিস প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এ তৌহিদ, এডিটরস গিল্ডের সভাপতি মোজাম্মেল বাবু, বিটিআরসি চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদার, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ডঃ শাহজাহান মাহমুদ, বিসিএস এর প্রতিষ্ঠাতা কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য আফতাব উল ইসলাম, সাইপ্রোকো কম্পিউটার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাফকাত হায়দার, এডুকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বার্ড) প্রধান নির্বাহী আকি-রাব্বানি ও বেসিস সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ফারহানা এ রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেছেন, “কম্পিউটার ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প খাতটি যে একটি দেশের রূপান্তরের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারে আমরা এই ইন্ডাস্ট্রির মানুষেরা তা প্রমাণ করতে পেরেছি। ১৫ জনের কম্পিউটার সমিতি থেকে আজ বেসিস’র দুই হাজার, বিসিএস এর আড়াই, আইএসপিএবি’র দুই হাজার, বাক্যের দুই হাজার ২০ জন সদস্য। প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা জাতি হয়েও নন কম্পিউটারের লোকজনই এটা ঘটিয়ে ফেলেছে।আর পেছনে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিসহ পুরো জাতিকেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।”

আগামী বছরের মধ্যেই দেশ শতভাগ উচ্চগতির ইন্টারনেটে সংযক্ত হবে জানিয়ে মোস্তাফা জব্বার বলেন, যেসব জায়গায় মোবাইল টাওয়ার বা ক্যাবল দিয়ে ইন্টারনেট দেয়া যায় না, বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে এরই মধ্যে সেসব চর ও দ্বীপগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে যেতে শুরু করেছি। আগামী ২০২৩ সালের মধ্যে বাকি থাকা ৯০টি ইউনিয়নেও আশা করি কানেক্টিভিটি পৌঁছে দিতে পারবো। বিটিআরসি’র এসওএফ তহবিলের মাধ্যমে চলমান ৬১৭টি ইউনিয়নও চলতি বছরেই ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের অধীনে আসবে। অর্থাৎ ২০২৩ সালের মধ্যেই দেশ শতভাগ উচ্চগতির ইন্টারনেটে সংযুক্ত হবে।
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে এক দেশ এক রেট বাস্তবায়নে বিটিআরসি মহাপরিচালক নাসিম পারভেজের প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, “২০০৮ সালে প্রতি এমবিপিএস ইন্টারনেটের দাম ছিলে ২৭ হাজার টাকা। আর নাসিম পারভেজ যে এক দেশে এক রেট করেছে সেটি যদি ২০ এমবিপিএস প্যাকেজে যায় তাহলে দাম পড়ে মাত্র ৬০ টাকা। এটা আমারই কল্পনার বাইরে ছিলো। কল্পনাও করতে পারিনি যে অবস্থাটা হবে।”
বক্তব্যে মন্ত্রী হওয়ার পরের আমলাতান্ত্রিক দুরভিজ্ঞতার বয়ান নিয়ে সামনেই একটি বই লেখার ইচ্ছের কথা জানিয়েছেন তিনি। তবে গত চার বছরে ওই অবস্থার উত্তরণে করণীয় কাজটি সেরে ফেলেছেন বলেও জানিয়েছেন বিজয় বাংলা জনক।
তবে বিটিআরসি চেয়ারম্যান শ্যাম সুন্দর সিকদারের প্রশংসা করে মোস্তাফা জব্বার বলেন, ”যে ভদ্রলোকের ৫০টি বই প্রকাশিত হয়েছে সেই ভদ্রলোক তো প্রচলিত আমলা থাকতে পারেন না। যিনি কবিতা লেখেন তিনিও এমন প্রচলিত মানুষ থাকতে পারন না। আমলাতান্ত্রিকতা তো ওনার কাছে ঠাঁই পেতে পারে না। কেননা কবিতা লিখতে যে গুণাবলীগুলো দরকার সেটাতে আমলাতন্ত্র কোনো জায়গা পায় না।”
বইয়ের লেখক বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, যে কাফি-রে আমরা আন্তর্জাতিক দুনিয়াতে পাঠাইলাম বাংলাদেশকে প্রতিনিধত্ব করতে সে আবার বাংলা ভাষায় অ্যানলাগ থেকে ডিজিটাল যুগের কাহিনী লিখবে এটি আসলেই প্রত্যাশিত ছিলো না। তাই আমরা সবাই কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ দেই যে কাফি একটা শুভ সূচনা করে দিয়েছে, যেটার ভিত্তিতে কেউ না কেউ আরো ভালো ভাবে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ইতিহাস লেখার প্রচেষ্টা করবে। আমারও সাহস হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বিডিও এসএন সাধারণ সম্পাদক মুনীর হাসান, আইএসপিএবি সভাপতি ইমদাদুল হক, ডিজিটাল ডিভাইস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিডিএমইএ) সভাপতি মাহবুব জামান, বেসিস প্রাক্তন সভাপতি শামীম আহসান, প্রথম আলো’র ফিচার এডিটর পল্লব মোহাইমেন, বিআইজিএফ সভাপতি মোজাহেদুল ইসালাম ঢেউ, সাধারণ সম্পাদক হাসান জাকির প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
১৯৮০ সালে কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা লেখক আব্দুল্লাহ এইচ কাফি তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, অসংখ্য বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে হাতেগোণা কয়েকজন মানুষ দেশের তথ্য প্রযুক্তি ইন্ডাস্ট্রি বিকাশের ভিতটি গড়ে দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশের ডিজিটাল প্রযুক্তি খাতকে এক অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা যখন তরুণ ছিলাম আজকের বাংলাদেশ ডিজিটাল প্রযুক্তিখাতে এই জায়গায় উপণীত হবে তা কল্পনাও করতে পারতাম না। বইটিতে ডিজিটাল প্রযুক্তি বিকাশের নায়কদেরকেই তুলে এনেছেন বলে তিনি জানান।
বক্তারা বলেন, ১৯৬৪ সালে ঢাকায় কম্পিউটার আসে কিন্তু ৮০ দশকের আগ পর্যন্ত কম্পিউটারের ব্যবহার ছিল না বললেই চলে। এই অবস্থাটা বিশদভাবে লেখক আবর্তে তুলে এনেছেন যা নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস্ হিসেবে কাজ করবে।