আইসিটি খাতের শ্বেতপত্র প্রকাশ
গত ১৫ বছরে দেশের তথ্য প্রযুক্তি খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে বহু প্রতীক্ষিত শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ। ৮ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার আইসিটি বিভাগের ওয়েবসাইটে শ্বেতপত্রটি প্রকাশ করা হয়। এতে আইসিটি অধিদপ্ত, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, এটুআই এর বিভিন্ন প্রকল্পের দুর্নীতির সলুক সন্ধান করা হয়েছে। শুধু অভিযোগ নয় প্রতিটি বিষয়ে অভিযুক্তদেরও ইন্টারভিউ করে এই শ্বেতপত্র তৈরি করা হয়।
মোট ১৩টি অধ্যায়ে ৪৭২ পৃষ্ঠায় এই খাতের বিভিন্ন অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে অনুসন্ধানের পাশাপাশি ডিজিটাল রূপান্তরের নামে কী ধরণের পরিহাস হয়েছে তারও উপাত্ত সংযুক্ত করা হয়েছে প্রতিবেদনে। উন্নয়ন ও অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহ'র নেতৃত্বে আরও ৭ জন ছিলেন এই শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটিতে। পিজিসিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেজওয়ান খান, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক চৌধুরী মফিজুর রহমান, পাড্রু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মুহাম্মদ মুস্তাফা হোসেন, বুয়েট অধ্যাপক রিফাত শাহরিয়ার, আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার আফজাল জামি সৈয়দ আলী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আসিফ শাহরিয়ার সুস্মিত ও সাংবাদিক মো. শরিয়ত উল্লাহ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিজিটাল রূপান্তরের নামে বিগত সময়ে নানা রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের নিরিখে নেওয়া হয়েছে। শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন, সিআরআই এর মাধ্যমে মুজিব ভাই এর মতো চলচ্চিত্র নির্মাণে ৪২১১.২২ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। খোকা সিনেমা বানাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৬ কোটি টাকা। রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রয়োজনের দিকে না তাকিয়ে হাইটেক পার্ক ও আইটি ট্রেনিং সেন্টার করা করা হয়েছে। পাশাপাশি আইসিটি খাতের বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারের আলামত পেয়েছে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি। ১২ আইটি পার্ক, ডিইইআইডি, ইডিসি,আইডিয়া, ফোর টায়ার ডাটা সেন্টারের মতো একাধিক বড় প্রকল্পে স্বজনপ্রীতি, সিন্ডিকেশন ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যাপক ফারাক দেখা গেছে, যার ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবা জনগণের কাছে পৌঁছায়নি। একই সঙ্গে কিছু প্রকল্প রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনুমোদন ও বাস্তবায়নের অভিযোগও হোয়াইট পেপারে উঠে এসেছে। আইটি ট্রেনিং, ফ্রিল্যান্সার ও ই-কমার্স ইত্যাদি ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনায় নেয়া অনেক প্রশিক্ষণেই ডুপলিকেশন, অপরিকল্পনা স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত নন এমন নিশ্চিত হওয়ার পরেই ফ্রিল্যান্সিংয়ের নামে দলীয়দের মধ্যে ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়েছে।এলইডিপি প্রকল্পে জাল প্রশিক্ষকও খুঁজে পেয়েছে অনুসন্ধান দলটি।
হোয়াইট পেপারে আরও বলা হয়, গত এক দশকের বেশি সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সুবিধাভোগী চক্র নীতিনির্ধারণে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করে। এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয় এবং দেশীয় আইটি শিল্পের একটি বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত বিকাশ থেকে বঞ্চিত হয়।
শ্বেতপত্রের মুখবন্ধে জানানো হয়, এই হোয়াইট পেপার কোনো ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক দলিল নয়; বরং ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি প্রামাণ্য ভিত্তি তৈরি করাই এর লক্ষ্য। প্রতিবেদনে চিহ্নিত দুর্বলতা ও অনিয়ম নিরসনে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বাধীন অডিট ব্যবস্থা জোরদার এবং প্রযুক্তি খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হোয়াইট পেপারের তথ্য ও পর্যবেক্ষণ জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করবে। তবে এর সুপারিশ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থা না থাকলে এটি কাগুজে দলিলেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তারা।
ডিবিটেক/এমইউএম/ইকে







