হাদিকে গুলির ঘটনায় একজন শনাক্ত

অনুদানে গেইম নির্মতা দলের সদস্য সন্দেহভাজন ফয়সল করিম?

অনুদানে গেইম নির্মতা দলের সদস্য সন্দেহভাজন ফয়সল করিম?
১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ১২:১০  
১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ২৩:৫৬  

রাজধানীর বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকায় মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তদের হামলায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ওসমান হাদি গুরুতর আহত হয়েছেন। এই ঘটনায় সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেছে। তাকে খুঁজে বের করার জন্য সাধারণ জনগণের কাছে তথ্য চেয়ে সহায়তা চেয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। 

এদিকে মুখে মাস্ক থাকা হাদীর আততায়ীর চেহারা বের করার জন্য এরই মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুগল রিভার্স ইমেজ সার্চিং এবং ডিজিটাল মাধ্যমে থাকা বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গুলি ছোঁড়া ওই ব্যক্তি 'ব্যাটল অব ৭১' (Battle of 71) গেমটি তৈরি করেছে বাংলাদেশের সফটওয়্যার ও গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়াইসিইউ টেকনোলজি লিমিটেড (YCUE Technology Ltd.), এবং এর প্রধান প্রকল্প পরিচালক ছিলেন ফয়সাল করিম। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত দেশের প্রথম কম্পিউটার গেম, যা ২০১৬ সালে মুক্তি পায় এবং এতে মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মিশন ও ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। 

২০১৬ সালে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সহযোগিতা ও সরকারের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ‘ব্যাটল অব ৭১’ নামে একটি কম্পিউটার গেম তৈরি করেছিল ফয়সাল করিমের মালিকানাধীন ওয়াইসিইউ টেকনোলজি লিমিটেড। সে বছরের নভেম্বরে ওই গেমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বেসিসের তৎকালীন সভাপতি এবং পরে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারও উপস্থিত ছিলেন।

২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘আসনভিত্তিক নির্বাচন পরিচালনা ও সমন্বয়ক কমিটি’ করেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ঢাকা–১২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। এই আসনের সমন্বয়ক কমিটির সদস্য ছিলেন ফয়সাল করিম।

এই ফয়সাল করিমের আরেক দাউদ খান। সে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছিলো। আওয়ামী লীগ আমলে সে গেম ডেভেলপ করার জন্য আইসিটি মন্ত্রনালয় থেকে তিন কোটি টাকা পেয়েছিল। যদিও চেতনার সেই গেম আর আলোর মুখ দেখে নাই। সন্ত্রাস, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এগুলো ছিল তার নিয়মিত কর্মকান্ড।

৫ আগস্টের পর পরই সে ভোল পাল্টে ছাত্র সমন্বয়কদের সাথে জুটে যায়। মাত্র এক বছর আগেই সে একটি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে ১৭ লক্ষ টাকা ডাকাতি করে পুলিশের কাছে ধরা পড়েছিল। রহস্যজনকভাবে কোন এক ক্ষমতাবান ব্যক্তির সুপারিশে তখন তার জামিন হয়। কিছুদিন আগেই সে হাদীর ইনকিলাব মঞ্চের সাথে সংযুক্ত হয়ে তার জন্য নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছিল। আজ হাদীর মাথায় গুলি চালিয়ে দিয়েছে।

অপরদিকে হাদির নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তি ও ৯ ডিসেম্বর ইনকিবাল কালচারাল সেন্টারে যাওয়া ব্যক্তির একাধিক ছবি তুলনামূলকভাবে যাচাই করে মিল খুঁজে পেয়েছে ডিজিটাল ইনভেস্টিগেটিভ মিডিয়া দ্য ডিসেন্ট।  ইনকিলাব কালাচারাল সেন্টার থেকে সংগৃহীত ৯ ডিসেম্বরের সিসিটিভি ফুটেজ, পুলিশের সংগৃহীত ১২ ডিসেম্বরের হামলার সিসিটিভি ফুটেজ, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এবং ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে ফয়সাল করিম মাসুদ নামক অ্যাকাউন্ট এবং আওয়ামীপন্থি বিভিন্ন পেজ ও ব্যক্তির প্রোফাইলে পোস্ট করা ৫০টিও বেশি ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, ওসমান হাদির ওপর বাইকের পেছন থেকে গুলি করা ব্যক্তিটির চেহারার সঙ্গে ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান নামের এক ব্যক্তির চেহারা মিলে যাচ্ছে। 

ফয়সাল করিম মাসুদ (ছদ্মনাম দাউদ বিন ফয়সাল) নামের এই ব্যক্তি সাবেক ছাত্রলীগ সহ-সভাপতি, ঢাকা মহানগর উত্তর এবং আদাবর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি।
ছবিতে লালবৃত্তে চিহ্নিত ফয়সাল গত ৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ওসমান হাদির ঠিক পাশে বসে ছিলেন একটি বৈঠকে। সূত্রমতে, জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং আসাদুজ্জামান খান কামালের বিশ্বস্ত অনুসারী বলে জানা গেছে।

দুটি ফেইস ডিটেকশন অ্যাপে ফয়সাল করিমের একাধিক ছবি তুলনামূলকভাবে যাচাই করেও ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের সিসি ফুটেজে দৃশ্যমান ব্যক্তির মিল পাওয়া গেছে। এই যেমন- গুলি করা ব্যক্তির বাম হাতে থাকা বিশেষ ডিজাইনের ঘড়িটির সঙ্গে একই ডিজাইনের ঘড়ি পরা একাধিক ছবি ফয়সাল করিম মাসুদের ইনস্টাগ্রাম এবং ফেসবুক প্রোফাইলে পাওয়া গেছে। ফেসবুক প্রোফাইল ও বিভিন্ন সংবাদ বিশ্লেষণ করে দেখা গেঝে ওসমান হাদির উপর গুলিবর্ষণ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত। 

পেশাদারদের যোগাযোগমাধ্যম লিংকডইনে ফয়সাল করিমের নামে প্রোফাইল আছে। এই অ্যাকাউন্টটি যে ফয়সালেরই তা ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক এক নেতা নিশ্চিত করেছেন। লিংকডইনে ফয়সাল নিজেকে অ্যাপল সফট আইটি, ওয়াইসিইউ টেকনোলজি ও এনলিস্ট ওয়ার্ক নামে তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

লিংকডইন প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী, ফয়সাল করিম ২০১৩ সালে ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটারবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। পরে আরেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এমবিএ করেছেন বলে সেখানে উল্লেখ রয়েছে।

এখন পলাতক ওই সন্দেহভাজন হন্তারক সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। ১৩ ডিসেম্বর, শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই অনুরোধ জানানো হয়।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, শুক্রবার (১২ ডিসেম্বর) রাজধানীর বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকায় মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তদের হামলায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি গুরুতর আহত হন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হামলাকারীদের গ্রেফতারে রাজধানীতে জোর অভিযান পরিচালনা করছে।

এতে আরও বলা হয়, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ছবির ব্যক্তিকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। এই ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো তথ্য থাকলে বা তার সন্ধান পেলে দ্রুত নিম্নলিখিত মোবাইল নম্বর অথবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে পুলিশকে জানানোর জন্য বিনীত অনুরোধ করা হলো।

ডিসি মতিঝিল: 01320040080

ওসি পল্টন: 01320040132

সন্ধানদাতার পরিচয় গোপন রাখা হবে এবং উপযুক্ত পুরস্কৃত করা হবে। তবে এরই মধ্যে হাদীর আততায়ী ফয়সাল করিম, ওরফে দাউদ খান, ওরফে রাহুল এর দুটি ফোন নাম্বার সোশ্যাল হ্যান্ডেলে প্রকাশ পেয়েছে। এগুলো হলো- 01795075226 এবং 01684480803। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গত কয়েকদিনে এই ফোনের লোকেশন এবং কল লিস্ট ট্র্যাক করে সহসাই তাকে গ্রেফতারে সক্ষম হবেন বলে আশা করছেন নেটিজেনরা। 

পুলিশের পিসিআর (PCR) প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ফয়সাল করিম মাসুদের স্থায়ী ঠিকানা বাউফল উপজেলার কেশবপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে কেশবপুর কলেজ সংলগ্ন এলাকায়। তার বাবা হুমায়ুন কবির। তবে বর্তমানে তিনি ঢাকার আদাবর থানাধীন পিস কালচার হাউজিং সোসাইটি এলাকায় বসবাস করতেন।

আদাবর থানায় তার বিরুদ্ধে একটি মামলাও রয়েছে বলে জানা গেছে। ফয়সাল করিম মাসুদের পিসিআর রিপোর্টসংক্রান্ত তথ্য ও ছবি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

ডিবিটেক/আইএইচ/এমইউএম