বাংলাদেশের কৃষিতে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে গবেষণাগার স্থাপনে ইএটিএল-সালফোর্ড চুক্তি সই
দেশের কৃষিকাজের উন্নয়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে গবেষণাগার প্রতিষ্ঠায় ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারভিত্তিক সালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বুধবার সমঝোতা চুক্তি করেছে ইনোভেশন হাব লিমিটেড। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্কে ইএটিএল ইনোভেশন হাবে এই গবেষণাগারটিতে থাকবে দেশের কৃষির উন্নয়নে এআই, আইওটি ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তির ব্যবহারের ডিভাইস ও অ্যাপ্লিকেশন।
সন্ধ্যায় রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ক্রিস্টাল বলরুমে চুক্তিতে সই করেন সালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য মারগারেট রো এবং ইএটিএল ইনোভেশন হাব লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ মুবিন খান।
চুক্তি সইয়ের আগে একই ভ্যেনুতে প্রযুক্তিগতভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও কীভাবে কাজে লাগিয়ে সামনের দিনগুলোতে কৃষিকাজকে এগিয়ে নেয়া যায় এবং দেশের আপামর কৃষক সমাজকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া যায় সে সম্পর্কে ‘বাংলাদেশে উন্নত কৃষিকাজের জন্য এআই এবং আইওটি ব্যবহার’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে বক্তারা জানান, মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে গাছের রোগ, পানির প্রয়োজনীয় পরিমাণ, কতখানি ফসল ফলবে সে বিষয় ছাড়াও আবহাওয়ার পূর্বাভাস আরও নিখুঁতভাবে দেওয়া যায়। এর সঙ্গে আইওটি ও রিমোট সেন্সিং যুক্ত করা গেলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ভালোভাবে নিশ্চিত করা যাবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব ও ইএটিএল ইনোভেশন হাব লিমিটেডের চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুল করিম। তিনি বলেন, স্মার্ট বাংলাদেশের নির্মাণে খাদ্য নিরাপত্তা বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের ভূমির স্বল্পতা আছে, ফলে বিদ্যমান ভূমিতে অধিক উৎপাদন নিশ্চিত করাই কঠিন চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের কৃষিতে এআই, আইওটি এবং ডেটা সায়েন্সের প্রয়োগ সময়ের দাবি। কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির যে চ্যালেঞ্জ তা মোকাবেলা আজকের আয়োজন যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বাংলাদেশের মানুষ প্রগতিশীল। এ ছাড়া বাংলাদেশ বিনিয়োগবান্ধব। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। ফসলি জমি কমছে। তাই পরিমিত পানি ব্যবহার করতে হবে। ফসলকে রোগ থেকে রক্ষা করতে হবে। এসব কারণে এআই, আইওটি ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তিতে আমাদের অভ্যস্ত হতে হবে।
সেমিনারে সালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক ন্যান্সি কুক বলেন, ‘বর্তমান পৃথিবীর সমস্যাগুলো একা একা সমাধান করা সম্ভব নয়। অংশীদারির ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশ বন্যার মতো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অসাধারণ। যতবারই আমরা এ দেশে আসি, ততবারই বন্যা মোকাবিলায় নতুন কিছু শিখি।’
স্বাগত বক্তব্যে ইএটিএল ইনোভেশন হাব লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ মুবিন খান বলেন, আজকের আয়োজন দেশের কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি, এআই, আইওটি এবং রিমোট সেনসিং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে অসামান্য অবদান রাখবে। কৃষি ক্ষেত্রে গবেষণা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং যৌথ গবেষণার দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্যে কাজ করছে ইএটিএল বাংলাদেশ। ২০৪১ সালে স্মার্ট বাংলাদেশ পেতে হলে সবাইকে প্রযুক্তি বুঝতে হবে। বিশেষত তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে দেশের কৃষকদের অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হবে। কারণ, বাংলাদেশের বড় জনগোষ্ঠী কৃষক। স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে তাদের সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে।
স্যালফোরড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক ন্যান্সি ডোনা কুক বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা আজ বিশ্ববাসীর জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ এবং সে কারণে এটি সম্মিলিতভাবেই মোকাবেলা করতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও প্রাকৃতিক বিরূপতার মাঝেও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি, এআই, আইওটি এবং ডেটা সায়েন্সের প্রয়োগ আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে কৃষি ক্ষেত্রে সম্মিলিত নিবিড় গবেষণা এবং গবেষণালব্ধ ফলাফল ব্যবহার করা জরুরি।
এছাড়াও সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- কৃষি এক্সটেনশন (ডিএই) মহাপরিচালক মি. বাদল চন্দ্র বিশ্বাস, স্যালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য এবং স্বাস্থ্য ও সমাজ ফ্যাকাল্টির ডিন প্রফেসর মারগারেট রো প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
সেমিনারে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘প্রতিবছর দেশে প্রায় ১ শতাংশ কৃষিজমি কমছে। তবু চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ পৃথিবীতে তৃতীয়। এর কারণ, আমরা প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত হয়েছি। জাইকার সহায়তায় মানিকগঞ্জে ধানি জমির মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে। মাটির গুণাগুণ বুঝতে আমরা স্যাটেলাইট ব্যবহার করছি।’
বক্তব্য শেষে এআই ও আইওটি এবং আরএস প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন স্যালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পরিবেশ ফ্যাকাল্টির অধ্যাপক প্রফেসর মঁ সারে। তিনি জানান, মেশিন লার্নিং পদ্ধতি দিয়ে মূলত অতীতের প্রচুর তথ্য ঘেঁটে প্যাটার্ন খুঁজে বের করা হয়। এর ফলে পূর্বাভাস দেওয়া যায়। এ কারণেই কৃষিকাজে বিশেষজ্ঞ না হয়েও মেশিন লার্নিং দিয়ে কৃষিবিষয়ক কাজ করা যায়। মাটির পুষ্টির অবস্থা, পোকামাকড়ের আক্রমণ, জলবায়ু পরিবর্তন-এসব বিষয়ে মেশিন লার্নিং কার্যকর হবে। তিনি সালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিএসএআই হাব নামের ডেটাসায়েন্স ও এআই কেন্দ্রের গবেষণা কার্যক্রম নিয়ে কথা বলেন। তিনি জানান, শক্তির রূপান্তরের একক ‘জুল’ যার নামে, সেই ইংরেজ পদার্থবিজ্ঞানী, গণিতবিদ জেমস প্রেসকট জুলের বাড়িও এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ।
সেমিনারে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হন সালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মোহাম্মদ হাম্মাদ সালিম। তিনি সালফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি ফসলের উৎপাদন পর্যবেক্ষণ করার মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন দেখান। তিনি বলেন, এই অ্যাপ সার ও পানির অপচয় রোধ করবে। ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমবে। এ ছাড়া এটি রোগ প্রতিরোধ ও পোকামাকড় রোধেও কার্যকর হবে।
ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসের মধ্যপ্রাচ্যের মুখ্য প্রযুক্তিবিদ শিবগামি গুগান বলেন, স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে কোন জমিতে কী ফসল কী পরিমাণে উৎপাদিত হচ্ছে, তা জানা যায়। জমির সীমানা বোঝা যায়। অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসের এ রকম একটি সফটওয়্যার রয়েছে। এটি বাংলাদেশের কৃষি খাতের উপযোগী।







