পারস্পারিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিতে শেষ হলো ২৪তম এসএটিআরসি সম্মেলন
ফাইভজি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, ব্রডব্যান্ড সংযোগ বিস্তার, টেকসই ডিজিটাল ভবিষ্যত বিনির্মাণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে তরঙ্গ ব্যবস্থাপনায় সদস্য দেশসমূহের মধ্যে পারস্পারিক জ্ঞান ও সহযোগিতা বিনিময়, সীমানা লঙ্ঘন করে তরঙ্গ অনুপ্রবেশ এবং স্যাটেলাইট ও টেরিস্ট্রিয়াল সেবায় তরঙ্গ ব্যবহারের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ খাতের উন্নয়নে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার শেষ হলো তিন দিনব্যাপী দক্ষিণ এশিয়ার টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমূহের (SATRC) ২৪তম আন্তর্জাতিক সম্মেলন।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ও এশিয়া প্যাসিফিক টেলিকমিউনিটি (এপিটি) আয়োজিত সম্মেলনে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার ৯টি দেশ- ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, আফগানিস্তান, মালদ্বীপ ও ইরানের টেলিযোগাযোগ ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক রেগুলেটরি সংস্থার প্রধান, টেলিকম অপারেটরস, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিসহ ১০০ (একশ) জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছেন। সম্মেলনের সমাপনীতে প্রধান অতিথি ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার ।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী সম্মেলন উদ্বোধন করার পর টেকসই ডিজিটাল ভবিষ্যতের নির্মাণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা এবং উদ্ভাবন (Regulators’ Roundtable: Regulatory Interventions and Innovations for Sustainable Digital Future) দুটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে আফগানিস্তান, ভূটান, মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার প্রতিনিধিবৃন্দ অংশগ্রহণ করে নিজ নিজ দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। আলোচকরা জানান, তরঙ্গ একটি দুর্লভ সম্পদ এবং এর সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০৩০ সাল নাগাদ এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশসমূহের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ ফাইভজি প্রযুক্তির আওতায় আসবে এবং সারাবিশ্বের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ফাইভজি এক লাখ কোটি ডলারের বেশি অবদান রাখবে।
দ্বিতীয় দিনে নিয়ন্ত্রক-শিল্প সংলাপ: ভবিষ্যতের জন্য তরঙ্গ (Regulator-Industry Dialogue: Spectrum for Future) বিষয়ে অনুষ্ঠিত হয় দুইটি গোলটেবিল আলোচনা। এতে এশিয়া প্যাসিফিক-টেলিকমিউনিটি, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, ইরান, জিএসএমএ, হুয়াওয়ে টেকনোলজিস, অষ্ট্রেলিয়ার উইন্ডশোর প্লেস কনসাল্টিং টেলিনর এশিয়া, আজিয়াটা গ্রুপ বারহাদ, হিউলেট-প্যাকার্ড এন্টারপ্রাইজ এর প্রতিনিধিরা অংশ্রহণ করেন।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, ভবিষ্যতে ফাইভজি প্রযুক্তির সম্প্রসারণে যথোপযুক্ত তরঙ্গ ব্যবস্থাপনা এবং নেটওয়ার্ক অবকাঠামো নির্মাণ হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। টেসকই টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো তৈরিতে রেগুলেটর-অপারেটর এর পারস্পারিক আলোচনার মাধ্যমে পলিসি প্রণয়ন করলে তা ফলপ্রসু হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় ইউরোপ ও অ্যামেরিকার দেশগুলোর মত দ্রুত সময়ে ফাইভজি বিস্তার না ঘটলেও ক্রমান্বয়ে ফাইভজি সম্প্রসারণে এগিয়ে যাচ্ছে বলেও মতামত জানান তারা। ডিজিটিাল কানেক্টিভিটিকে ফলপ্রসু করতে শক্তিশালী ব্রডব্যান্ড এবং ওয়াইফাই কানেক্টিভিটির অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন আলোচকরা।
সম্মেলনের তৃতীয় দিনে SATRC এর ওয়ার্কিং গ্রুপ পলিসি এন্ড রেগুলেশনস, ওয়ার্কিং গ্রুপ অন স্পেকট্রাম এবং ক্যাপাসিটি বিল্ডিং বিষয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এতে ২০২৪ সালে ভারতে SATRC এর ২৫তম আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং পাকিস্তানে ২০২৫ সালে ২৬তম আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়া, ভারতকে SATRC এর ভাইস-চেয়ারম্যান মনোনীত করা হয় ।২০২৫ সালে বাংলাদেশে SATRC ওয়ার্কিং গ্রুপ অন পলিসি এন্ড রেগুলেশনস বিষয়ক কর্মশালা এবং ভারতে SATRC ওয়ার্কশপ অন স্পেকট্রাম অনুষ্ঠিত হবে।
সমাপনী অনুষ্ঠানে এশিয়া-প্যাসিফিক টেলিকমিউনিটি’র মহাসচিব মাসানোরি কুণ্ডো (Mr. Masanori Kondo) বিটিআরসি এবং অংশগ্রহণকারী সকল সদস্যসমূহের প্রতিনিধিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ২৪তম আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মাধ্যমে সদস্য দেশসমূহের টেলিযোগাযোগ খাতের উন্নয়ন, তরঙ্গের যথাযথ ব্যবহার, টেকসই টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণে পলিসি প্রনয়ণ, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং ভবিষ্যত লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
সভাপতির বক্তব্যে বিটিআরসির চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) শ্যাম সুন্দর সিকদার ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিতব্য SATRC এর ২৪তম সম্মেলনের কর্ম পরিকল্পনার কাঠামো বাস্তবায়নে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, আঞ্চলিক এই সম্মেলন দক্ষিণ এশিয়ার সদস্য দেশসমূহের মধ্যে নব নব প্রযুক্তি বিনিময়, প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় পারস্পারিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থা, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও মোবাইল অপারেটরদের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে। সদস্য দেশসমূহ পারস্পারিক ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, সমৃদ্ধশালী ও উন্নত দেশ গঠনে ডিজিটাইজেশনের বিকল্প কিছু নেই, আর ডিজিটাল কানেক্টিভিটি হবে ডিজিটাইজেশনের মুল ভিত্তি। দক্ষিণ এশিয়ার নয়টি দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার মধ্যে মিল রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থার উত্তরণ ঘটিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে ডিজিটাল কানেক্টিভিটি সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে সদস্য দেশসমূহের মধ্যে ডিজিটাল কানেক্টিভিটি বাস্তবায়ন, প্রযুক্তিগত তথ্য আদান-প্রদান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর গুরুত্বরোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আফগানিস্তান টেলিকম রেগুলেটরি অথোরিটি (এআরটিএ) এর চেয়ারম্যান Mr. S. Barat Shah Nadim, কমিউনিকেশন অথোরিটি অব মালদ্বীপ এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা Mr.Ilyas Ahmed, নেপাল টেলিকমিউনিকেশন অথোরিটি এর চেয়ারম্যান Mr. Purushottam Khanal, পাকিস্তান টেলিকমিউনিকেশন অথোরিটি এর চেয়ারম্যান Major General (R) Hafeez Ur Rehman, টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন অব শ্রীলংকা এর মহাপরিচালক Mr. Delana Madhushanka Dissanayake, কমিউনিকেশন রেগুলেটরি অথোরিটি অব ইরানের পরিচালক alireza darvishi , টেলিকম রেগুলেটরি অথোরিটি অব ইন্ডিয়া এর সচিব Mr. V Raghunandan, ভূটান ইনফো কমিউনিকেশন এন্ড মিডিয়া অথোরিটি’র পরিচালক Mr. Jigme Wangdi নিজ নিজ দেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন
সম্মেলনে SATRC এর সহযোগী সদস্য প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে আজিয়াটা গ্রুপ বারহাদ, বাংলালিংক ডিজিটাল, গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা, জিএসএমএ (হংকং) , হুয়াইয়ে টেকনোলজিস, টেলিনর এশিয়া, টেলিনর পাকিস্তান, ইনমারসেট সিংগাপুর, আইটিইউ-এপিটি ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়া, নোকিয়া সলিউশনস এন্ড নেটওয়ার্কস ইন্ডিয়া এবং থাইল্যান্ডের ন্যাশনাল ইলেক্ট্রনিকস এন্ড কম্পিউটার টেকনোলজি সেন্টার সম্মেলনে অংগ্রহণ করেছে।
১৯৯৭ সালে দক্ষিণ এশিয়ার টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে SATRC প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংস্থা বেতার তরঙ্গ সমন্বয়, স্টান্ডার্ডাইজেশন, রেগুলেটরি প্রবণতা, টেলিযোগাযোগ খাত উন্নয়নের কৌশল এবং টেলিযোগযোগ সংক্রান্ত আঞ্চলিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী সম্পর্কে কর্মকৌশল নির্ধারণ করে থাকে। সদস্য দেশগুলোর স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে প্রতি বছর এ কাউন্সিলের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।







