বিনা অপরাধে নিবর্তনের কথা জানালেন ডিজিটাল অ্যাক্টিভিস্টরা
ইশরাত জাহান রেইলি। টুইটারে লেখার দায়ে ২০২০ সালের ৬ নভেম্বর গ্রেফতার হন। তাকে আটকের সময় চলে লঙ্কা কাণ্ড। শুধু তার ল্যাপটপ ও ফোনই নয়, কেড়ে নেয়া হয় ছোট বোন, এমনকি মায়ের মোবাইল ফোনও। ২ বছর ৭ মাস কারাগার ভোগ শেষে অপরাধ প্রমাণিত না হলেও আদালতে দোষ শিকার করে মুক্তি পেতে হয়েছে তাকে। এর আগে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে বায়েজিদ মোল্লাসহ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। কোনে ক্ষেত্রেই কোনো নারী সেখানে ছিলো না বলে জানান অষ্টাদশী এই মেয়ে। তাই এখানেই থামা উচিত বলে মত দেন বন্দিনী পূণর্বাসন ফাউন্ডেশনের এই সহ-প্রতিষ্ঠাতা।
মোঃ আল আমিন হোসেন। সম্মাননা তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তিনি বিরোধিতা করেছিলেন নতুন শিক্ষা কারিকুলাম ২০২১ এর। ভিকারুন্নেসা নুন স্কুলের সামনে সচেতনতা মূলক মানববন্ধন করেন। এর জেরে ২০২৩ সালের নভেম্বরে আটক হয়ে কারাবাস করেছেন তিন মাস ১৮ দিন। এরই মধ্যে শিক্ষা জীবনের এক বছর হারিয়ে গেছে তার। চোরের মতো বেধে নেয়া হয় হাজতে। ডিবি অফিসে এডিসি শ্রিপা রানী তিন ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে ট্যাগিং করার চেষ্টা করেন। গ্রেফতারের পর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট নিজেদের দখলে নেন। শারীরিক ভাবেও নির্যাতন করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেট কোটে ৫ বার ও জজ কোর্টে এক বার জামিন না দেখিয়ে হাইকোর্ট দেখিয়ে ৬ মাসের জামিন দেয়া হয়। এখনো মামলা মাথায় নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে।
গোলাম মাহফুজ জোয়ার্দার। সফটওয়্যার নির্মাতা ও মানবাধিকার কর্মী। র্যাব, ডিজিএফআই এবং পুলিশ সহ যারা ক্রসফায়ারের সঙ্গে জড়িত এক বছর ধরে তাদের নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করতেন। এরেই পরিপ্রেক্ষিতে সাড়ে ১০ মাস জেলজীবন কাটাতে হয়েছে।

শনিবার রাধানীর ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটের সাগর-রুনী হলে ভয়েস ফর রিফর্ম এবং ডিএসএ ভিক্টিমস নেটওয়ার্কের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠি সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৪ (খসড়া) নিয়ে রাষ্ট্রীয় নিবর্তন ব্যবস্থা বহাল ও ভুক্তভোগীদের বয়ান অনুষ্ঠানে এসব কথা তুলে ধরেন তারা। তারা অবিলম্বে ডিএসএ ও সিএসএ মামলায় গ্রেফতারদের ছেড়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ওপর করা মামলা বাতিলের দাবি জানানো হয়। এছাড়াও এখন দেশ কি উপদেষ্টা চালাচ্ছে না ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলারাই চালাচ্ছেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বক্তারা। ভুক্তভোগীরা জানান, কোনো প্রমাণ ছাড়াই তাদের কারাবরণ করতে হয়। এখনো মামলা মাথায় নিয়ে চলতে হচ্ছে। বক্তারা মনে করেন, ভুক্তভোগীদের কাছে রাষ্ট্রের কেবল ক্ষমাই চাওয়া উচিত নয়; একইসঙ্গে তাদের ক্ষতি পূরণ করা উচিত।
ভয়ে ফর রিফর্ম সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুরের সঞ্চালনায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে স্বাগত বক্তব্য দেন ইআরকির সম্পাদক সিমু নাসের। এসময় অন্যান্যের ভুক্তভোগীদের মধ্যে আরো বক্তব্য রাখেন রাষ্ট্র চিন্তার সদস্য দিদারুল আলম ভূঁইয়া, রেজাউর রহমান লেনিন, অশোক বড়ুয়া, কামাল হক, প্রমীতি প্রভা প্রমুখ।
এছাড়াও মুঠোফেন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ, সাংবাদিক কামাল আহমেদ, সালিম সামাদ, রাজতীনিতিক হাসিব উদ্দিন হোসেন, প্রকৌশলী ও প্রাক্তন ব্লগার প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
এদের মধ্যে দিদারুল আলম ভূঁইয়া বলেন, আমাদের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে যারা আজ সরকারে উপেদষ্টা থাকার পরও আমরা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ নামে যে আইনটি পেলাম তা আমাদের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতির খেলাপ। আমরা সবাই ডেসপারেটলি সরকারের সফলতা চাই। কিন্তু সরকার কি চায়? তারা কি ডেসপারেটলি চায় সরকার ব্যার্থ হোক?
সভাপতির বক্তব্যে আলোকচিত্রশিল্পী, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী শহিদুল আলম বলেন, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশে মানবাধিকার কিংবা জনগণের স্বার্থের লেন্স ব্যবহার না করে নিপীড়নের লেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে পুলিশকে ও নিরাপত্তাবাহিনীকে অনেক ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে শেখ মুজিব, মেজর জিয়াউর রহমান মারা গেছেন। ক্রসফায়ার, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুম, নিপীড়ন যা যা হওয়ার সবই তারা করেছে। ২০২৪ সালে হেলিক্টপ্টার ও মাটি থেকে গুলি করে কিংবা পুড়িয়ে মানুষ মেরেছে তাদের ক্ষমতায়ন করার জন্য আমরা এই আইন বানাচ্ছি। সাংবাদিকতাকেও যদি ক্রিমিনালাইজ করা হয় তখন মিডিয়া বলে কিছু থাকবে না। পিআর হাউজ হয়ে যাবে। যা ইতিমধ্যেই হয়েছে। আমাদের ডিভাইস যেভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেভাবে ফেরত দেয়া হয় কিনা সেই ফরেনসিকও করা হয় না।







