বছরের প্রতিদিনই হোক মা দিবস

‘মা’— একটি মাত্র শব্দ। অথচ এই ছোট্ট শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশাল অনুভূতি, সবচেয়ে গভীর মমতা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। জন্মের আগ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের নাম মা। তার স্নেহ, ত্যাগ, ভালোবাসা আর প্রার্থনাতেই গড়ে ওঠে সন্তানের পৃথিবী। তাই মাকে ভালোবাসতে, সম্মান জানাতে কিংবা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে আলাদা কোনো […] The post বছরের প্রতিদিনই হোক মা দিবস first appeared on সারাবাংলা: লেটেস্ট বাংলা খবর | ব্রেকিং নিউজ | Sarabangla.net.

বছরের প্রতিদিনই হোক মা দিবস
১০ মে, ২০২৬ ১৯:৩৫  

‘মা’— একটি মাত্র শব্দ। অথচ এই ছোট্ট শব্দটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশাল অনুভূতি, সবচেয়ে গভীর মমতা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। জন্মের আগ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের নাম মা। তার স্নেহ, ত্যাগ, ভালোবাসা আর প্রার্থনাতেই গড়ে ওঠে সন্তানের পৃথিবী। তাই মাকে ভালোবাসতে, সম্মান জানাতে কিংবা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন হয় কি না—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

তারপরও আধুনিক বিশ্বে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার পালিত হয় ‘বিশ্ব মা দিবস’। করপোরেট সংস্কৃতির এই পৃথিবীতে বিশেষ দিবসের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে আবেগের বাণিজ্যও। কিন্তু মায়ের প্রতি ভালোবাসা কি কেবল একটি দিনের জন্য? বছরের বাকি দিনগুলোতে তবে কী হবে? মা কি তখন উপেক্ষিতই থেকে যাবেন?

আমার কাছে মা দিবস কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়। বছরের ৩৬৫ দিনই আমার কাছে মা দিবস। মায়ের জন্য ভালোবাসা সপ্তাহের সাত দিন, দিনের ২৪ ঘণ্টাই অবিচ্ছেদ্য। যারা সারা বছর মায়ের খোঁজ রাখেন না, হয়তো তাদের জন্যই বিশেষ এই দিবসের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু একজন সন্তানের কাছে মা তো প্রতিদিনের অনুভূতি, প্রতিটি নিঃশ্বাসের অংশ।

ইতিহাসবিদের মতে, এই দিনটি প্রাচীন গ্রিসের মাতৃ আরাধনার প্রথা থেকে সূত্রপাত হয়। কথিত আছে ১৬ শতকে ইংল্যান্ডে প্রথম মা দিবস পালন হয়। এটাই ছিল দেব-দেবীদের মা ছাড়া নিজের আসল মাকে নিয়ে মানে রক্ত মাংসের মাকে নিয়ে মা দিবস। দিবসটি তারা মাদারিং ডে হিসেবে পালন করতো। সেদিন সরকারি ছুটিও ছিল। পরিবারের সবাই তাদের মায়ের সাথে দিনটি কাটাতো। তবে এই দিবসটি ততোটা প্রসার লাভ করেনি। প্রায় ১০০ বছর পর ১৮৭০ সালে আমেরিকার জুলিয়া ওয়ার্ড হাও নামের এক গীতিকার মা দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। তিনি আমেরিকার গৃহযুদ্ধের সময় একটি দেশাত্মবোধক গান লিখেছিলেন। সে গানটা সে সময় বেশ জনপ্রিয় ছিলো। আমেরিকায় গৃহযুদ্ধের সময় হাজার মানুষকে হত্যা করা হচ্ছিলো কারণে বা অকারণে। এক মায়ের সন্তান আরেক মায়ের সন্তানকে হত্যা করছিলো অবলীলায়। এই সব হত্যায দেখে জুলিয়া খুব ব্যথিত হয়েছিলেন। তিনি এটা বন্ধ করার জন্য আমেরিকার সব মাকে একসাথে করতে চাচ্ছিলেন। আর এ কারণেই তিনি আন্তর্জাতিক মা দিবস পালন করতে চাচ্ছিলেন।

এদিকে ভার্জিনিয়ার একটি মহিলাদের দল জুলিয়া ওয়ার্ড হাও-এর প্রস্তাবিত মা দিবসটি পালন করতো বেশ মর্যাদার সঙ্গেই। অ্যানা রিভেস জারভিস তার জীবনের সুদীর্ঘ ২০ বছর কাটিয়েছিলেন ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রাফটনের একটি গির্জায়। সেখানে তিনি সানডে স্কুলের শিক্ষকতা করেছেন। তার মৃত্যুর পর তার মেয়ে অ্যানা এম জারভিস মা দিবস ঘোষণা আন্দোলনের হাল ধরে। অ্যানা জীবিত ও মৃত সব মায়ের প্রতি সম্মান জানানোর তথা শান্তির জন্য এই দিবসটি পালন করতে চাচ্ছিলেন। এই লক্ষ্যে তারা ১৯০৮ সালে গ্রাফটনের ওই গির্জার সুপারিনটেনডেন্টের কাছে একটি আবেদন জানায়। তার অনুরোধে সাড়া দিয়ে সে বছরই ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ও পেনসিলভেনিয়ার কয়েকটি গির্জায় মা দিবস পালিত হয়। এভাবে অনেকেই প্রতিবছরই মা দিবস পালন করতে শুরু করে।

এরপর অনেক পথ পেরিয়ে ১৯১৪ সালে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে জাতীয় মা দিবসের মর্যাদা দেয়। আরও পরে ১৯৬২ সালে এই দিবসটি আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

তবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মায়ের মর্যাদা সর্বোচ্চ। ইসলাম ধর্মে মায়ের প্রতি সম্মান ও সদাচরণের ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে এবং তাদের সামনে ‘উহ’ শব্দটিও উচ্চারণ না করতে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন, “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত।” অর্থাৎ মায়ের সন্তুষ্টির মধ্যেই নিহিত রয়েছে সন্তানের মুক্তি ও কল্যাণ।

শুধু ইসলাম নয়, অন্যান্য ধর্মেও মায়ের মর্যাদা অসীম। সনাতন ধর্মে বলা হয়েছে— ‘দশজন উপাধ্যায় (ব্রাহ্মণ) অপেক্ষা একজন আচার্য্যরে গৌরব অধিক, একশত আচার্য্যরে গৌরব অপেক্ষা পিতার গৌরব অধিকতর; সর্বোপরি,সহস্য পিতা অপেক্ষা মাতা সম্মানার্হ।’ (মনু,২/১৪৫)

তাছাড়া, উপনিষদে মাকে দেবীর মর্যাদায় অভিষিক্ত করা হয়েছে। বলা হয়েছে—“মাতৃ দেব ভব”। অর্থাৎ মা দেবী স্বরূপিনী, জীবন্ত ঈশ্বরী। তাছাড়া হিন্দুধর্মে মহাশক্তি, আদিশক্তি, রক্ষাকর্ত্রীর ভ‚মিকায় আমরা যাঁদের পেয়েছি, তাঁদের কিন্তু আমরা মাতৃরূপেই চিনেছি৷ এ জন্য কুসন্তান বলা হলেও, কুমাতা কখনও বলা হয় না।

সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পকলাতেও মায়ের প্রতি এই অসীম ভালোবাসার প্রতিফলন দেখা যায়। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘মা’ কবিতায় তিনি মায়ের যে অপরূপ ছবিটি এঁকেছেন তা অতুলনীয়: “যেখানেতে দেখি যাহা/ মা-এর মতন আহা।”

প্রখ্যাত কবি কাজী কাদের নেওয়াজ মা সম্পর্কে তার ‘মা’ কবিতায় বলেছেন: “মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই/ ইহার চেয়ে নাম যে মধুর ত্রিভুবনে নাই।”

মুহাম্মদ হাবীব উল্লাহ- মায়ের প্রতি ভালবাসা, হুমায়ূন আজাদ- আমাদের মা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর- বীরপুরুষ/মনে পড়া/লুকোচুরি, শামসুর রাহমান- কখনো আমার মাকে, কামিনী রায়- কত ভালবাসি কবিতা লিখেছেন।

শিল্পীরা রসপ্রবন। সাধারণ মানুষের চেয়ে তারা একেবারেই আলাদা। মায়ের প্রতি তারা তাদের শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালোবাসা ব্যক্ত করেছেন তাদের গানে। খুরশীদ আলম- মাগো মা ওগো মা, আমারে বানাইলি তুই দিওয়ানা , ফকির আলমগীর- মায়ের একধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম, ফেরদৌস ওয়াহিদ- এমন একটা মা দে না, জেমস- রাতের তারা আমায় কি তুই বলতে পারিস, রাশেদ- ওই আকাশের তারায় তারায়, নচীকেতা ঘোষ- ছেলে আমার মস্ত বড় মস্ত অফিসার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়- পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব মাগো।

এ দিনে আন্তর্জাতিক মা দিবস হলেও সব দেশ এই দিবসটি পালন করা হয় না। আসলে অনেক দেশেরই আলাদা আলাদা মা দিবস আছে বাংলাদেশেও দিবসটি আজ নানা আঙ্গিকে পালিত হচ্ছে। ২০০৩ সাল থেকে আজাদ প্রোডাক্টস প্রা. রত্নগর্ভা মায়েদের সম্মাননা জানিয়েও আসছে। অবশ্য কিছু দেশ ব্যতিক্রম রয়েছে এক্ষেত্রে। তবে কিছু দেশে রয়েছে মা দিবস উদযাপনের মজার ব্যতিক্রমধর্মী রীতি।

সুইডেন: সুইডেনে মে মাসের শেষ রবিবার মা দিবস পালিত হয়। মা দিবস উপলক্ষে শিশুরা ছোট প্লাস্টিকের ফুল বিক্রি করে। ফুল বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যায়, তা দিয়ে মাকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়াও মাকে নিয়ে যাওয়া হয় তার প্রিয় রেস্তোরাঁয়, উপহার দেয়া হয় ফুলের গুচ্ছ।

যুগোস্লভিয়া: যুগোস্লভিয়ায় মা দিবস উদযাপন করা হয় ডিসেম্বর মাসে। এখানের মা দিবস উদযাপনের রীতি সম্ভবত সবচেয়ে অদ্ভুত। এ দেশে শিশুরা মা দিবসের সকালে মায়ের বিছানায় উঠে তাকে বেঁধে ফেলে শক্ত করে। সন্তানকে উপহার না দেয়া পর্যন্ত এই বাঁধন থেকে মুক্তি মেলে না মায়ের।

জাপান: মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস উদযাপিত হয় জাপানে। এখানে মা দিবসকে বলা হয় ‘হাহা নো হি’ শিশুরা নিজের হাতে চিত্রাঙ্কন করে এবং নাম দেয়- ‘আমার মা’ এসব চিত্রাঙ্কনের প্রদর্শনী করা হয় এবং সব চিত্রাঙ্কন বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। অনেক বছর ধরে জাপানে এই রীতি চলে আসছে।

মেক্সিকো: মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মা দিবস পালিত হয় মেক্সিকোতে। এখানে মা দিবস উদযাপিত হয় উৎসবমুখর পরিবেশে। মা দিবসের আগের সন্ধ্যায় সন্তানরা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে যায় এবং মাকে হাতে তৈরি কার্ড, উপহার এবং ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়।

তাইওয়ান: তাইওয়ানে মা দিবসের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে, কেননা এ দেশে মা দিবস পালিত হয় মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার, যেদিন বুদ্ধর জন্মদিন। এজন্য তাইওয়ানে মা দিবস একটি অত্যন্ত পবিত্র উৎসব। দেশজুড়ে মহা ধুমধামের সঙ্গে উদযাপিত হয় দিনটি।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজকের সমাজে অনেক মা-বাবাকেই জীবনের শেষ সময়ে অবহেলার শিকার হতে হয়। কেউ কেউ তাদের বোঝা মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসেন। অথচ একসময় এই মা-ই সন্তানকে বুকে আগলে রেখে বড় করেছেন, নিজের সুখ-স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। সন্তান বড় হওয়ার পর সেই মায়ের চোখের জল কি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় না?

সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো— সন্তানের অবহেলা, কষ্ট কিংবা অপরাধের পরও মা ক্ষমা করে দিতে পারেন। পৃথিবীতে এমন নিঃস্বার্থ ক্ষমাশীল হৃদয় আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। হয়তো এ কারণেই মা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।

যাদের মা আজ বেঁচে আছেন, তারা পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষ। আর যাদের মা নেই, তারা জানেন—মায়ের অভাব কোনো কিছু দিয়েই পূরণ হয় না। পৃথিবীর সব সম্পর্ক কোনো না কোনো প্রতিদান চায়, কিন্তু মা একমাত্র মানুষ, যিনি বিনিময়হীন ভালোবাসতে জানেন।

তাই মা দিবস শুধু আনুষ্ঠানিকতা হয়ে না থেকে আমাদের জীবনের প্রতিদিনের চর্চা হোক। মায়ের মুখে হাসি ফোটানো, তাঁর পাশে থাকা, তাঁর কষ্ট বোঝা এবং তাকে সম্মান করাই হোক প্রকৃত মা দিবসের প্রতিফলন।

পরিশেষে প্রার্থনা একটাই— পৃথিবীর সব মা ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। আর যারা আমাদের ছোটবেলায় ভালোবাসা দিয়ে আগলে রেখেছেন, মহান সৃষ্টিকর্তা যেন তাঁদেরও ঠিক সেভাবেই আগলে রাখেন।

প্রতিদিনই হোক মা দিবস।

লেখক: নিউজরুম এডিটর, সারাবাংলা ডটনেট

The post বছরের প্রতিদিনই হোক মা দিবস first appeared on সারাবাংলা: লেটেস্ট বাংলা খবর | ব্রেকিং নিউজ | Sarabangla.net.