চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে অপূর্ণ থাকছে ৬৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা: বিআইডিএস গবেষণা

আয়ের ৩৫ শতাংশ চিকিৎসায় ব্যয় করছে দরিদ্র পরিবার

ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি খরচ

আয়ের ৩৫ শতাংশ চিকিৎসায় ব্যয় করছে দরিদ্র পরিবার
৮ মে, ২০২৬ ১২:৫৩  

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে ৬৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশই যাচ্ছে ওষুধ ও বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষায়। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠী চিকিৎসা ব্যয়ের চাপে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

‘দেশে অপূর্ণ থাকা স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়ের গতিশীলতা পুনর্বিবেচনা’ শীর্ষক এ গবেষণা পরিচালনা করেছে বিআইডিএসের জনসংখ্যা অধ্যয়ন বিভাগ। গবেষণায় ২০২২ সালের গৃহস্থালি আয় ও ব্যয় জরিপের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এতে ১৪ হাজার ৪০০টি পরিবার এবং ৬২ হাজার ৩৮৭ জন ব্যক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।

গবেষণার সারসংক্ষেপে বলা হয়, দেশের মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ মানুষ প্রতি মাসে অন্তত একবার চিকিৎসার প্রয়োজন অনুভব করেন। তবে এর মধ্যে ১৫ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ৬৫ শতাংশই গ্রহণ করতে পারেন না। গ্রামীণ এলাকায় অপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা চাহিদার হার বেশি। গ্রামে এ হার ৬৮ শতাংশ, যেখানে শহরে তা ৫৯ শতাংশ।

২০২৪ সালের তথ্য যুক্ত করে গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯ শতাংশই ব্যক্তিকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। অর্থের অভাবে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জেলা ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণে সবচেয়ে পিছিয়ে নড়াইল। এ জেলায় ৮১ শতাংশ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চাহিদা পূরণ করতে পারেন না। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে হবিগঞ্জ, যেখানে এ হার ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে কম অপূর্ণ স্বাস্থ্য চাহিদা রয়েছে ফেনী জেলায়, যেখানে এ হার ১৮ শতাংশ।

গত ৭ মে, বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি পরিবার গড়ে প্রতি মাসে চিকিৎসায় ব্যয় করে ৩ হাজার ৪৫৪ টাকা, যা মোট পারিবারিক ব্যয়ের প্রায় ১১ শতাংশ। এ ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যায় ওষুধ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষায়।

সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবা তুলনামূলক সমভাবে বণ্টিত হলেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা গ্রহণ মূলত উচ্চ আয়ের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যদিও ধনী মানুষের মোট চিকিৎসা ব্যয় বেশি, তবে দরিদ্র পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ চিকিৎসায় ব্যয় করে, যেখানে ধনীদের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ৫ শতাংশ।

গবেষণায় হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের ব্যয়ের খাতও তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, মোট ব্যয়ের ২৬ শতাংশ যায় ওষুধে। অস্ত্রোপচারে ব্যয় হয় ২৩ শতাংশ, রোগ নির্ণয় ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ১৭ শতাংশ, শয্যা ভাড়ায় ১৬ শতাংশ, অন্যান্য খাতে ৭ শতাংশ এবং যাতায়াতে ৬ শতাংশ। চিকিৎসকের ফি বাবদ ব্যয় হয় মোট খরচের মাত্র ৫ শতাংশ।

গবেষণায় দেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, অসুস্থতা এখন দেশের মানুষের দরিদ্র হয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ চিকিৎসার অধিকাংশ ব্যয় তাদের নিজেদের বহন করতে হয়।

গবেষকরা মনে করেন, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে কার্যকর ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে বড় হাসপাতালের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং মানুষের ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়ের চাপও হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

ডিবিটেক/বিবি/ইকে