প্রযুক্তিনির্ভরজেন্ডার সহিংসতা প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
ডিজিটাল রূপান্তরের এই সময়ে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা (টিএফজিবিভি) একটি ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও মানবাধিকারগত উদ্বেগ হিসেবে সামনে এসেছে। বিশেষ করে নারী, কন্যাশিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এ ধরনের সহিংসতার ঝুঁকিতে বেশি থাকায় সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, আইনি সহায়তা এবং কার্যকর সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ প্রেক্ষাপটে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন-এর যৌথ উদ্যোগে ৭ মে, বুধবার রাজধানীতে ‘প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা: প্রতিরোধ, প্রশমন ও করণীয় এবং এনজিওদের ভূমিকা’ শীর্ষক জাতীয় পর্যায়ের পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডার সহিংসতার ধরন, মানসিক ও সামাজিক প্রভাব, প্রতিরোধ কৌশল এবং বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে আইনি জটিলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পাশাপাশি এনজিওগুলো কীভাবে তাদের চলমান ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে টিএফজিবিভি প্রতিরোধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে পারে, সে বিষয়েও দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়।
পরামর্শ সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনজিও বিষয়ক ব্যুরো-এর মহাপরিচালক ডক্টর মোহাম্মদ জকরিয়া। সভাটি আয়োজন করা হয় ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায়। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড কর্মসূচির অধীনে। এতে অর্থায়ন করছে সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ।
সভা সঞ্চালনা করেন ব্যারিস্টার মোঃ খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা বিষয়ে এনজিওদের করণীয় এবং ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে টিএফজিবিভি অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন শাশ্বতী বিপ্লব, মোঃ হারুন-অর-রশিদ এবং জাকির হোসাইন। সভায় বিভিন্ন খাতের ৩৮টি এনজিওর ৬৭ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।
মোঃ নুরুল ইসলাম বলেন, জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিংয়ের মতো প্রযুক্তিকেও এখন মূলধারায় আনার সময় এসেছে। প্রকল্প অনুমোদনের সময় প্রযুক্তি, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও টিএফজিবিভি-সংক্রান্ত নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা গেলে ডিজিটাল সচেতনতা তৈরিতে বড় অগ্রগতি সম্ভব হবে।
এ সময় ডক্টর কে. এম. মামুন উজ্জামান বলেন, আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। কমিউনিটি রেডিও, আঞ্চলিক গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে এ ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডক্টর মোহাম্মদ জকরিয়া বলেন, টিএফজিবিভি শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়; এটি মানবাধিকার, জেন্ডার ন্যায়বিচার, সামাজিক নিরাপত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য ও আইনের শাসনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তিনি জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং এনজিও, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শক্তিশালী রেফারেল কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএইচএম বজলুর রহমান। তিনি বলেন, প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব ভুক্তভোগীর অফলাইন জীবন, মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপরও পড়ে। তিনি ভুক্তভোগীকে দোষারোপের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে অধিকারভিত্তিক ও সহমর্মিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানান।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেওয়া এনজিও প্রতিনিধিরা শিশু ও তরুণদের ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আসক্তি রোধ, অনলাইন গেম ব্যবহারে সচেতনতা, ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, পুলিশ ও বিচার বিভাগের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভুক্তভোগীবান্ধব সহায়তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
অংশগ্রহণকারীরা পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন সেবার প্রচার ও পরিধি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে নারী ও কন্যাশিশুর পাশাপাশি পুরুষ ও কিশোরদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
সভায় বক্তারা বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল নিরাপত্তা, জেন্ডার ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার সুরক্ষাকে উন্নয়ন কার্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। টিএফজিবিভি প্রতিরোধে সরকার, এনজিও, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি খাত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই।
ডিবিটেক/এইচপি/এমইউএম



