বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতায় হুমকির মুখে ফেনীর টেলিযোগাযোগ
ভারতীয় সীমান্তের উজান থেকে আসা ঢলে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদনদীর পানি হঠাৎ যেন ফুঁসে উঠেছে।মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বাঁধ ভেঙে একের পর ডুবছে এক জনপদ। স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, নোয়াখালীর আট উপজেলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া ও কসবা, রাঙামাটির সাজেক, কুমিল্লা, ফেনী, মৌলভীবাজারের দুটি উপজেলা, চট্টগ্রামের মিরসরাই, চাঁদপুর, সিলেট ও হবিগঞ্জ। বন্যার কবলে পড়ে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ফেনী সদর, পরশুরাম, ফুলগাজী, দাগনভূঞা ও ছাগলনাইয়া উপজেলা।
পানির তোড়ে বিচ্ছিন্ন হয়েছে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট। বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক নিয়েও দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে স্থানীয়দের। ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বন্য কবলিত জনপদ। এমন পরিস্থিতিতে বন্যা দুর্গতদের জন্য ত্রাণ সহায়তা নিয়ে মাঠে নেমেছে স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সেনাবাহিনী, বিজিবি কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা সহায়তা ও উদ্ধার অভিযানে তৎপর রয়েছেন। তৎপর স্বেচ্ছাসেবী ও সংস্কার আন্দলনের শিক্ষার্থীরাও। বসে নেই প্রযুক্তি উদ্যোক্তারাও।
বুধবার (২১ আগস্ট) রাতে সমন্বয়ক মো. আবু বাকের মজুমদার জানিয়েছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সারাদেশে রেসকিউ অপারেশন এবং ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি চালু করছে। কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি পাবলিক ফান্ড রেইজিং উদ্যোগ শুরু করছে। সকল ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক এবং ভলান্টিয়ারদের আহ্বান জানিয়ে এ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আপনারা নিজ নিজ জেলা-উপজেলায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং জনসাধারণের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করুন। কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল আপনাদের সঙ্গে সমন্বয় করে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষদের জন্য রেসকিউ অপারেশন ও ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আক্রান্ত এলাকাগুলিতে উদ্ধার বা ত্রাণ কাজে যারা যাচ্ছেন তাদের এবং আক্রান্তদের মধ্যে সংযুক্ত করতে জিওলোকেশনের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে সমন্বয় স্থাপন করতে এরইমধ্যে বন্যার জন্য সাবডোমেইন খুলেছে প্রতিরোধ ডটনেট। অনলাইন ভিত্তিক একটি সল্যুশনটিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপাত্ত এবং উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছানো বিভিন্ন রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে লাইভ হিটম্যাপ রয়েছে দুর্গত এলাকাগুলিকে শনাক্তের জন্য। এই প্ল্যাটফর্মে সাইন আপ করলে একটি লাইভ ম্যাপে দৃশ্যমান হচ্ছে যেখান থেকে জানা যাচ্ছে কোন এলাকায় যথেষ্ট স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে এবং কোন এলাকায় আরও স্বেচ্ছাসেবকের প্রয়োজন। তাই এখানে যুক্ত করা হয়েছে, ডোনেশন, ভলান্টিয়ার লগইন ও রিপোর্ট অপশন।
ভয়াবহতা তুলে ধরে উদ্যোক্তা ইকবাল জাহিদ বাহার বলেছেন, গতকাল রাত থেকে ফুলগাজী ও পরশুরামের সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ... কাউকে পাচ্ছি না...। মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করছে না, ইলেক্ট্রিসিটি নাই...। স্পীড বোট ছাড়া ফেনী থেকে ফুলগাজী ও পরশুরাম যাবার আর কোন ব্যবস্থা নেই। হাজার হাজার বাড়ীতে লাখো মানুষ পানি বন্দি। গতকাল পর্যন্ত সবার কান্নার শব্দ শুনেছি, আজ আর কিছুই জানতে পারছি না। আমাদের টীম চেষ্টা করছে তাঁদেরকে উদ্ধার ও কিছু খাবার পৌঁছে দেয়ার জন্য কিন্তু কাছাকাছি গিয়ে সবাই অসহায়...।
পরশুরামের সাতকুচিয়া এলাকার বাসিন্দা আবদুর রহমান জানান, বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি সব ডুবে গেছে। পানির তীব্র স্রোতের কারণে ঠিকভাবে উদ্ধার কাজও করতে পারছেন না। এর মধ্যে বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় আরও দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
ফেনী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী হোসেন মাহমুদ শামীম ফরহাদ জানিয়েছেন, সেখানকার প্রায় ৭০ শতাংশ গ্রাহক বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভবনগুলোর নিচ তলায় পানি ঢুকে মিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাই পানি নেমে না যাওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ থাকবে। বন্যার পানি কমার আগে সংযোগ স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মেহেদি হাসান জানান, তার বাড়ি ফেনীর ফুলগাজীতে। চাকরির সুবাধে ঢাকায় থাকলেও পরিবার থাকে গ্রামে। বধবার বিকাল থেকে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। একই অবস্থা জানাগেলো ঢাকায় পড়তে আসা ফুলগাজীর এক যুবতীর। তিনি জানান, বিদ্যুৎ না থাকার কারণে মনে হয় বাড়িতে কারও ফোনে চার্জ নেই। বারে বারে ফোন করেও সংযুক্ত হতে না পেরে পরিবারের নিয়ে ব্যাপক দুশ্চিন্তায় সে।
ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার হাওলাদার ফজলুর রহমান জানিয়েছেন, জেলায় চার লাখ গ্রাহকের মধ্যে তিন লাখের বেশি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছেন। ভারী বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকার লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত জেলার সোনাগাজী ও দাগনভূঞা উপজেলার অল্প কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ স্বাভাবিক ছিলো।
বিদ্যুৎ স্বাভাবিক রাখা গেলে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থাও সচল রেখে দুর্যোগ পরিস্থিতিতে আতঙ্ক কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মোবাইল বিটিএস গুলিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং স্বাভাবিক রাখতে দ্রুত জেনারেটর ব্যবস্থার আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে বিটিআরসি এবং টেলিযোগাযোগ বিভাগের নেতৃত্বে একটি টিম সেনাবাহিনীর সহায়তায় দুর্গত এলাকায় নিয়োজিত করতে অন্তবর্তী সরকারের ডাক টেলি যোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তির প্রতিমন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ করেছেন।







