বাংলাদেশে উপসর্গহীন করোনাসংক্রমিত মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। অপরদিকে সংক্রমণমুক্ত হবার পর কভিড-পরবর্তী স্মৃতিদুর্বলতা, শারীরিক ব্যথা এবং ঘুমে সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিলতটায় ভুগছেন আক্রান্ত মানুষদের একটা বড় অংশ। এদের ৯০ ভাগেরই আগে সবগুলো টিকা নেয়া আছে।
আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা এলসেভিয়ার এর অন্তর্ভুক্ত এবং ফ্রান্স থেকে প্রকাশিত গবেষণা সাময়িকী ‘নিউ মাইক্রোবস এন্ড নিউ ইনফেকশান’ এর সম্প্রতিক প্রবন্ধে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
দেশে করোনার হটস্পট ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়নগঞ্জে ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে জুুলাই পর্যন্ত ১০২১ জন রোগীর উপর পরিচালিত এই গবেষণায় নেতৃত্ব দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক ডঃ আদনান মান্নান।
গবেষণায় তার সঙ্গী ছিলেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ এইচ এম হামিদুল্লাহ মেহেদী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডাঃ ফারহানা আক্তার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক ডঃ মুশতাক ইবনে আয়ুব। তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষনের দায়িত্বে ছিলেন স্বাস্থ্য অর্থনিতিবিদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডঃ নঈম উদ্দিন হাছান চৌধুরী।
গবেষণা তত্বাবধায়কের দায়িত্বে ছিলেন রোগতত্ববিদ ডাঃ মো : ওমর কাইয়ুম, ঢাকা মহানগর হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ডাঃ সানজিদা হোসেন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ডাঃ প্রসূন বিশ্বাস এবং চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডাঃ আবদুর রব মাসুম।
গবেষণায় দেখা যায়, উপসর্গযুক্ত রোগীদের মধ্যে অর্ধেকেরই ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী। আক্রান্তদের ৭৫ ভাগই পুরুষ এবং ৩০-৩৯ বছর বয়সের মানুষ সবচেয়ে বেশী (৩০%)। আক্রান্তদের মধ্যে ৩০% এর অধিক রোগীর উল্লেখযোগ্য পরিমানে ডি ডাইমার এবং ফেরিটিন বেড়ে যায়। কভিড থেকে সুস্থ হওয়ার চার সপ্তাহ পরেও আক্রান্তদের এক চতুর্থাংশের মধ্যে ব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা, বিষন্নতা ও নিরবিচ্ছিন্ন ঘুম বাধাগ্রস্ত হতে দেখা গেছে। ৭০ ভাগ রোগীর চিকিৎসাতেই অ্যাজিথ্রোমাইসিন বা জিমাক্স এবং ৪৫ ভাগের ক্ষেত্রে ডক্সিসাইক্লিন ব্যবহৃত হয়েছে। শ্বাসকষ্টের রোগীদের মধ্যে কভিড থেকে সুস্থ হওয়ার পরেও উল্লেখযোগ্য হারে স্মরণশক্তি কমে যাওয়া, মনোসংযোগ কমে যাওয়া, বিভিন্ন অঙ্গে ব্যথা ও ঘুমের সমস্যা পরিলক্ষিত হয়েছে। এপ্রিল থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত প্রায় দেড়গুন করে বেড়েছে প্রতিমাসে উপসর্গহীন রোগীর সংখ্যা।
এ প্রসঙ্গে গবেষকদলের অন্যতম প্রধান ডাঃ হামিদুল্লাহ মেহেদী বলেন,“এই গবেষণায় কভিড-পরবর্তি প্রতিক্রিয়াকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে এবং দেখা গেছে দীর্ঘ মেয়াদী রোগে ভোগা মানুষজন বেশী ঝুঁকির মুখে থাকে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের পর্যবেক্ষণের সাথে আমাদের এই গবেষণাফল সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া গবেষণায় কভিড-পরবর্তী জটিলতার যে চিত্র পাওয়া গেছে তা ভবিষ্যতে এ রোগ থেকে সেরে ওঠা মানুষজনের অন্যান্য রোগের ধরন অনুসরণে সহায়ক হবে।”
গবেষণায় আরো উঠে আসে-, দেশের কভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তিদের ৯০ ভাগেরই ইতিপূর্বে সবগুলো টিকা নেয়া আছে। সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হয়েছে বি পজেটিভ (৩৬%) এবং ও পজেটিভ (২৯%) ব্লাড গ্রুপের রোগীরা। কভিড এর পুর্বে যারা দীর্ঘমেয়াদী ঔষধ গ্রহণ করছিলেন তাদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশী দেখা যাচ্ছে কভিড পরিবর্তি জটিলতা। এছাড়াও যাদের দির্ঘমেয়াদী রোগ আছে যেমন ডায়বেটিস, উচ্চরক্তচাপ, শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগ তাদের কভিডে আক্রান্ত হওয়ার হার এবং কভিড পরবর্তি জটিলতা’র সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেশী পাওয়া গেছে। রোগীদের অর্ধেকেরই পরিবারের বা বাইরের কোন কভিড আক্রান্ত রোগীর সাথে আক্রান্ত হওয়ার আগে এক সপ্তাহের মধ্যে দেখা হয়েছে এবং মাত্র পাঁচ ভাগের বিদেশ-ফেরত কোন ব্যক্তির সাথে সাক্ষাৎ হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডঃ আদনান মান্নান বলেন, “ইতোপূর্বে আমরা ডায়বেটিস রোগীদের মধ্যে করোনার প্রকোপ দেখতে পেয়েছিলাম আরেকটি গবেষণায়। এই গবেষণায় দেখা গেছে, অন্যান্য দেশে যেভাবে নির্দিষ্ট কিছু রক্ত গ্রুপের মানুষের কভিড হবে বা বেশী আক্রান্ত হবে এমন তথ্য দেয়া হয়েছে, আমাদের দেশে তেমন কোন সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি।"
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ডাঃ ফারহানা আক্তার বলেন, “বিসিজি টিকা কভিড থেকে সুরক্ষা দিতে পারে এরকম কোন শক্ত প্রমাণ আমরা দেখতে পাইনি। এছাড়াও ভবিষ্যতে সুস্থ রোগীদের এন্টিবডি’র মাত্রা নিয়ে তথ্য প্রয়োজন। তবে আরও অনেক বেশী রোগী (অন্তত এক লাখ) এর উপর গবেষণা পরিচালিত হওয়া উচিত।“
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডঃ মুশতাক ইবনে আয়ুব বলেন, “দেশে উপসর্গবিহীন রোগীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। তাদের নমুনা বিশ্লেষন করে দেখা উচিত কোন নতুন প্রজাতির বা ভিন্ন ধারার জিনগত গঠনের করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি এর পেছনে দায়ী কিনা।"
গবেষণার সামগ্রিক তত্ত্বাবধানে ছিল ডিজিজ বায়োলজি এন্ড মলিকুলার এপিডেমিওলজি রিসার্চ গ্রুপ চট্টগ্রাম।