এআই, আইওটি ও বিগ ডেটা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাকে শীর্ষবিন্দুতে নিয়ে যাবে : এস এম ইকবাল
দেশে টেলিকম প্রযুক্তির ইতিহাসে ৬ জুন বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ দিন। কেননা, ১৯৯৬ সালের এই দিনে বাংলাদেশে প্রথম ইন্টারনেট-ব্যবস্থা চালু হয়। সেই সময় টেলিফোন-সংযোগের সাহায্যে ইন্টারনেটে যুক্ত হতে হতো। যাকে বলা হতো ডায়ালাপ ইন্টারনেট। ঢাকার নিউ ইস্কাটন রোডে অবস্থিত ইন্টারনেট সংযোগদাতা প্রতিষ্ঠান (আইএসপি) ইনফরমেশন সিস্টেম নেটওয়ার্ক (আইএসএন) প্রথম ইন্টারনেট-সংযোগ দেওয়ার মাধ্যমে দেশে নতুন এই যুগের সূচনা করে। বাংলা ডটনেট ডোমেইন থেকে ৬৪ কেবিপিএস ব্যান্ডউইডথ দিয়ে অনলাইন ইন্টারনেট সেবা চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। এর প্রায় আড়াই যুগ পর, কাকতাল হলেও সেই একই দিনে ৫৩তম বাজেট প্রস্তাব করা হয়। তবে এই বাজেটে ইন্টারনেট সেবার ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাকে রাখা হয়েছে আইটিইএস সেবার বাইরে। এমন বাস্তবতায় ডিজিবাংলাটেক নির্বাহী সম্পাদক এস এম ইমদাদুল হক-কে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন আইএসএন সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহীন মাহমুদ ইকবাল যিনি এস এম ইকবাল নামে সমধিক পরিচিত।
প্রশ্নত্তরের আগে বাংলাদেশে ইন্টারনেটের অতীতে একটু ঘুরে আসা যাক। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষের দিকে বাংলাদেশে অনলাইন ইন্টারনেট চালু করার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে তার দেড়-দুই বছর আগে দেশে সীমিত আকারে ‘অফলাইন’ ইন্টারনেটে দেশে ই-মেইল সেবা দিতো অগ্নি সিস্টেমস লিমিটেড, প্রদেষ্টা ও দৃক। এই সেবাটি ব্যবহার করতো আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)। বাংলাদেশ থেকে তখন ইন্টারনেটে যুক্ত হতে কৃত্রিম উপগ্রহনির্ভর ভি-স্যাট (ভেরি স্মল অ্যাপারচার টার্মিনাল) প্রযুক্তি ব্যবহার হতো। এরপর ১৯৯৬ সালের ৬ জুন গুলশানের আইটোচু করপোরেশনের কার্যালয়ে অনলাইন ইন্টারনেট সেবা চালু করে আইএসএন। ইন্টারনেট ব্যবহারের খরচ ধরা হতো প্রতি মিনিট ৫টাকা হিসাবে। এই পথ ধরেই গ্রামীণ-সাইবারনেট, প্রশিকানেট, আইসিসি কমিউনিকেশনসহ আরও আইএসপির পথ চলা শুরু করে। বর্তমানে এই ইন্টারনেট সেবা দিচ্ছে আড়াই হাজারের মতো আইএসপি। এই আইএসপি ব্যবসায়ীদের সংগঠন আইএসপিএবি’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এস এম ইকবাল। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সাবেক সভাপতি তিনি। একইসঙ্গে ওয়ার্ল্ড ইনফরমেশন সার্ভিস অ্যালায়েন্স (উইটসা) এর সাবেক বাংলাদেশী পরিচালকও। জনাব শাহীন মাহমুদ ইকবাল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক শেষে ব্যাংককে গিয়ে স্নাতকত্তর করে দেশে ফিরে যোগ দেন আইসিডিডিআরবি-তে। এরপর গড়ে তোলেন আইএসএন।
ডিজিবিটেক : বাংলাদেশে ইন্টারনেট ৬ জুন একটি বিশেষ দিন। সেই দিনেই এবার বাজেট দেয়া হলো। এই দীর্ঘ প্রায় আড়াই যুগে ইন্টারনেট সেবায় কতটুকু এগিয়েছি আমরা?
এস এম ইকবাল : ১৯৯৬ সালের ৬ জুন বাংলাদেশ প্রথম অনলাইন ইন্টারনেটে প্রবেশ করেছে। সেই হিসেবে আমাদের দেশের ইন্টারনেট সেবার বয়স ২৮ বছর অর্থাৎ দুই যুগের বেশি। আগের দিনের ডায়ালাপ, পরবর্তীতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট, মধ্যে ওয়াইম্যাক্স ইন্টারনেট, বর্তমানে মুঠোফোনে ইন্টারনেট এমনকি স্যাটেলাইট ফোনেও ইন্টারনেট নিয়ে অগ্রগতি নিঃসন্দেহে অনেক। ব্যাকবোনে স্যাটেলাইট ছেড়ে একাধিক সাবমেরিন ক্যাবল এবং টেরিস্টেরিয়াল লিংকে প্রতিবেশী দেশ থেকে কানেক্টিভিটি ইন্টারনেট সেবাকে অনেক বেশি সহনশীল এবং নিরবিচ্ছিন্ন করেছে।
ডিজিবিটেক : দেশে অনলাইন ইন্টারনেট সেবা যুগের প্রবেশের দিনে প্রস্তাবিত বাজেটে ইন্টারনেট কর বাড়ানো নিয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই -
এস এম ইকবাল : শুরুর দিকে লাইসেন্স বলতে তো কিছু ছিলই না, সেই সঙ্গে ছিল না কোন ভ্যাট। পরবর্তীকালে লাইসেন্স এবং ভ্যাট যুক্ত হয়। প্রস্তাবিত স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে ইন্টারনেট মূল অনুষঙ্গ। তাই এর উপরে কোন কর বা ভ্যাট আরোপ, আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে বাধা প্রদান করবে।
ডিজিবিটেক : প্রায় আড়াই যুগ আগে দেশে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়ার অভিজ্ঞতা থেকে আজকের সময়ের আইএসপি ব্যবসায় কতটা নির্ভার মনে হয়?
এস এম ইকবাল : প্রাথমিক অবস্থায় টেলিফোন লাইনের সঙ্গে মডেম বসিয়ে ডায়ালআপ এর মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা দেওয়া হতো। এরপর শুরু হয় লাস্ট মাইল অর্থাৎ প্রান্তিক পর্যায়ে ফাইবার অপটিক ক্যাবল এবং ইউটিপি (Unshielded Twisted Pair) কেবল বসিয়ে ব্রডব্যান্ড কানেক্টিভিটির মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা, ব্যাকবোনে থাকত ভিসাট (VSAT - Very Small Aperture Terminal) satellite কানেক্টিভিটি। এটা করতে যেয়ে আমরা পুরো শহরকে অনেকটা তারের জঙ্গলে পরিণত করে ফেলেছিলাম। ব্যাক-বোনের ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট এর পরিবর্তে সাবমেরিন ক্যাবল যুক্ত হলেও লাস্ট মাইলে এখনো সেই তারের জঙ্গল রয়েই গেছে। মধ্যে ওয়াইম্যাক্স এই তারের জঙ্গল অপসারণে অপার সম্ভাবনার সৃষ্টি করলেও তৎকালীন কেয়ারটেকার সরকারের বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশনের হঠকারী সিদ্ধান্তে দেশের দুই ওয়াইম্যাক্স সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানই আজ অবলুপ্ত। তাদের তৃতীয় লাইসেন্সটি কেউ কিনতেই সাহস করেনি। অবশ্য বর্তমানে দুইটি প্রতিষ্ঠান অপটিক্যাল ফাইবার মাটির নিচ দিয়ে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা করলেও এর ব্যাপ্তি বেশি দূর প্রসারিত হয়নি। টেলিফোন কোম্পানিগুলো এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রতিষ্ঠান বিটিসিএল এর প্রচেষ্টায় দেশব্যাপী অপটিক্যাল ফাইবারের নেটওয়ার্ক তৈরি হওয়াতে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সেবা ছড়িয়ে পড়েছে। মুঠোফোন কোম্পানিগুলো থ্রি-জি এবং ফোর-জি এর মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছে দিচ্ছে। এতে করে তারের জটলা থাকে না। তবে অধিকাংশ গ্রাহকেরই পছন্দের শীর্ষে ব্রডব্যান্ড সেবা। গতি-মূল্য সব বিবেচনায় এই সংযোগগেই তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। স্মার্ট ব্যবহারকারীরা অবশ্য দু’টোর মাধ্যমেই তাদের সার্ভিসের নিরবিচ্ছিন্নতা ও উৎকর্ষ বজায় রাখে।
ব্যবসায় নিরাপত্তা অনেকটা প্রতিষ্ঠানগত, যে সকল প্রতিষ্ঠান আয়-ব্যায়ের সঠিক প্রয়োগ করেন তারা লাভ করেন। আর যারা এটা করতে পারেন না তারা বিদায় নেন। এই মর্মার্থ উপলব্ধি করেই কয়েক হাজার সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান টিকে আছে।
ডিজিবিটেক : ইন্টারনেট ব্যবাসায়ীদের স্বার্থ সুরক্ষায় এবং দেশে স্মার্ট ইন্টারনেট সেবা প্রতিষ্ঠায় আইএসপিএবি কি সঠিক পথে চলছে?
এস এম ইকবাল : আইএসপিএবি এর সমস্যা অনেক। অন্তত অন্যান্য আইসিটি অ্যাসোসিয়েশনের তুলনায় তো বটেই। ট্যাক্স ভ্যাট ছাড়াও, বিভিন্ন ধরনের লাইসেন্স জনিত সমস্যা রয়েছে তাদের। এ নিয়ে প্রায়ই সরকারের সঙ্গে দরবার করতে হয় তাদের। ফলে সঠিক পথে চলা বেশ কঠিন। তবে বিষয়গুলো সম্বন্ধে তারা সবসময়ই বেশ সোচ্চার। সমাধান না হলেও চেষ্টা চালায়। দুই হাজারের অধিক সদস্য নিয়ে বনানীর কেন্দ্রে অফিস, তাদের উন্নত সংগঠনিক অবকাঠামোর পরিচায়ক।
ডিজিবিটেক : বিদ্যমান বন্ধুর পথ উত্তরণে করণীয় কী?
এস এম ইকবাল : নিঃসন্দেহে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা সবচেয়ে বড় অনুঘটকের কাজ করবে। তবে এর পাশাপাশি আমাদের বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তি, তথ্যপ্রযুক্তির নতুন সম্ভাবনা গুলোকে কাজে লাগানো এবং এগুলোর মাধ্যমে উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখতে হবে। একইসঙ্গে গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তি সংযোজন করে দেশ জাতির জন্য অবদান রাখতে হবে।
ডিজিবিটেক : ইন্টারনেটকে নাগরিকের ক্ষমতায়ন ও জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে আমারা কতটা টেকসই করতে পারলাম?
এস এম ইকবাল : চিরায়ত পিরামিড ধরনের ম্যানেজমেন্টকে পরিবর্তন করে এক ধরনের সমতল কাঠামোতে পরিণত করে ইন্টারনেট। আমাদের দেশেও এর পরিবর্তন হওয়ার কথা নয়। কারণ উপরে কোন তথ্য আদান-প্রদানের জন্য তার ইমেইল এড্রেসই যথেষ্ট। এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য অ্যাপস সুতরাং স্পষ্টতই বলা যায় যে নাগরিকদের সেই অর্থে ক্ষমতায়ন তো হয়েছেই। তবে এতে ব্যবস্থাপনায় কতটা অগ্রগতি হয়েছে সেটা অবশ্য বস্তুনিষ্ঠভাবে অবজারভেশনের ব্যাপার। সরকারি ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তি তথা ইন্টারনেটের ব্যবহার এর প্রবৃদ্ধিকে অনেক সমৃদ্ধ করেছে বলা যায় নিঃসন্দেহে। সব ক্ষেত্রেই আরো উন্নতির সুযোগ থাকে, এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। আর টেকসই কিনা? সে সম্বন্ধে মন্তব্য করাটা বেশ কঠিন। সরকারি স্থাপনা নিরবিচ্ছিন্নভাবে সেবা প্রদান করছে এমন কথা সব সময় বলা যাবে না। এছাড়া মাঝেমধ্যে যে হ্যাকিং এর কথা শোনা যায় না, তা নয়। অতএব টেকসই এর ব্যাপারটা সময় নেবে।
ডিজিবিটেক : ইন্টারনেট আজ যতটা না ব্যবসা, তারচেয়ে বেশি সেবা। সেক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সম্ভবনা ছোঁয়ার ক্ষত্রে ব্রডব্যান্ড সেবার ভবিষ্যত কী?
এস এম ইকবাল : ইন্টারনেট ব্যবসা এবং সেবা দুটোই। আমি মনে করি একটা আর একটার পরিপূরক। ব্যবসা না থাকলে সেবার মানসিকতা উড়ে যাবে। নিক্তির বিচারে কোন পাল্লাটা বেশি ভারী সেটা খুব বেশি একটা বিচার্য নয়।
এক সময় ইন্টারনেটের কনটেন্ট পাওয়া অত্যন্ত দূরহ ছিল। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অন্যান্য মাধ্যমে এর অফুরন্ত সম্ভাবনা এবং চাহিদা তৈরি হয়েছে। তার উপরে Big Data, AI (Artificial Intelligence) এবং IoT (Internet of Things) যুক্ত হওয়াতে ইন্টারনেটের ডাটা ভলিউম exponentially বেশি প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের প্রয়োজন স্বভাবতই বেশি হবে এবং এই প্রয়োজন একে সম্ভাবনার শীর্ষবিন্দুতে নিয়ে যাবে।
ডিজিবিটেক : সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
এস এম ইকবাল : আপনাকেও ধন্যবাদ। ধন্যবাদ ডিজিবাংলাটেক পরিবারের সদস্য ও পাঠকদের যারা এতোক্ষণ আমার সাক্ষাৎকারটি পড়লেন।







