সৌরবিদ্যুৎ লক্ষ্যে শুল্ক ছাড় ও ওয়ান-স্টপ সেবার জোর দাবি

৪ মে, ২০২৬ ২০:১৩  

২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে স্বচ্ছ নীতিমালা, শুল্ক ছাড় এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর সুপারিশ জানিয়েছে নাগরিক সমাজ।

৪ মে, সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব–এ আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে  অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ, বিএসআরইএ এবং জেটনেট বাংলাদেশ–এর উদ্যোগে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ ও পরিবেশবিদরা এই সুপারিশ তুলে ধরেন।

তারা বলেন, আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোই দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। কৃষিজমি রক্ষা করে ‘এগ্রো-ভল্টাইক্স’, শিল্প-কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত ছাদ এবং ভাসমান সৌর প্রকল্পের মাধ্যমে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

জ্বালানি বিশ্লেষকরা মনে করেন, গ্রিড আধুনিকায়ন, ব্যাটারি স্টোরেজ স্থাপন এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। একইসঙ্গে সৌর যন্ত্রাংশ আমদানিতে উচ্চ শুল্ক কমানো এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত সেবা প্রদানের জন্য ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ চালুর দাবি জানানো হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ালে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। পাশাপাশি প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে একটি ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তরের ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।

তারা আরও বলেন, সঠিক নীতিনির্ধারণ ও সমন্বিত পরিকল্পনা থাকলে ২০৩০ সালের সৌরবিদ্যুতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব এবং এতে দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশ—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

একশনএইড বাংলাদেশ-এর জাস্ট এনার্জি ট্রানজিশন টিমের ম্যানেজার ও জেটনেট বিডির সদস্য সচিব আবুল কালাম আজাদের সঞ্চালনায় সেমিনারে উলাশী সৃজনী সংঘ (ইউএসএস)-এর নির্বাহী পরিচালক খন্দকার আজিজুল হক মনিসহ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, পরিবেশবিদ ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, "আমরা যদি ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যোগ করতে পারি, তবে এটি কয়েক হাজার কোটি ডলারের এলএনজি বা কয়লা আমদানির বোঝা কমিয়ে দেবে।" তার ভাষায়, সৌরবিদ্যুৎ এখন আর বিকল্প নয়, বরং এটিই হবে দেশের জ্বালানি খাতের মূল চালিকাশক্তি। এজন্য তিনি ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম (BESS) এর ওপর বিশেষভাবে জোর দেন। এর ফলে দিনের বাড়তি বিদ্যুৎ রাতেও ব্যবহার করা যায় এবং গ্রিড স্থিতিশীল থাকবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন এই জ্বালানী বিশেষজ্ঞ।

সৌরশক্তির প্লান্টের জমির অভাব নিয়ে প্রচলিত বিতর্ক নাকচ করে দিয়ে ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশন (বিজিইএফ)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান দীপাল চন্দ্র বড়ুয়া বলেন, “আমাদের কৃষি জমিতেই বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।” তিনি 'এগ্রো-ভল্টাইক্স' মডেলের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে প্যানেলের নিচে ছায়া-সহিষ্ণু ফসল উৎপাদন হবে এবং উপরে বিদ্যুৎ মিলবে। এছাড়া নদী তীরবর্তী চরাঞ্চল এবং ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ (Floating Solar) প্রকল্পগুলোকে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মূল উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মূল বক্তব্য উপস্থাপনকালে আইইইএফএ (IEEFA)-র লিড জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম পরিসংখ্যান দিয়ে দেখান যে, কেবল গার্মেন্টস ও বড় শিল্প কারখানার ছাদগুলো ব্যবহার করে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তিনি বলেন, "নেট মিটারিং পদ্ধতিকে আরও উৎসাহিত করলে শিল্প মালিকরাই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। এতে সরকারের ওপর চাপ কমবে এবং কারখানার উৎপাদন খরচও হ্রাস পাবে।"

জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ ও চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম. জাকির হোসেন খান বলেন, "জ্বালানি খাতের অস্বচ্ছতা দূর করতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানিতে যে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, তার একটি অংশ যদি সৌরবিদ্যুৎ খাতে স্থানান্তর করা যায়, তবে কোনো বিদেশি ঋণ ছাড়াই এই ১০ হাজার মেগাওয়াট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব।" 

তিনি জলবায়ু তহবিলের অর্থ সরাসরি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যবহারের দাবি জানান। তিনি বলেন, “দেশের জরুরি বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে সৌরবিদ্যুৎ (রুফটপ ও সেচ) সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি। প্রশাসনিক সদিচ্ছা থাকলে ৩-৬ মাসের মধ্যেই এই খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি সম্ভব। পরনির্ভরশীল মেগা প্রজেক্টের পরিবর্তে দেশীয় ও নবায়নযোগ্য উৎসের দিকে গুরুত্ব না দেওয়া আমাদের জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।”

ট্যাক্স ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ব্যবসায়ী সংগঠন বিএসআরইএ (BSREA)-র সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, সোলার প্যানেল ও ইনভার্টার আমদানিতে বিদ্যমান উচ্চ শুল্ক এই খাতের বড় বাধা। তিনি বলেন, “আমরা বিনিয়োগ করতে চাই, কিন্তু ১০টি দপ্তরে দৌড়াতে গিয়ে প্রকল্প ঝুলে যায়। এই খাতের জন্য একটি 'ফাস্ট ট্র্যাক' ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এখনই সময়ের দাবি।” 

অনুষ্ঠানে নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা ও পথনকশা উপস্থাপন শীর্ষক ধারণাপত্র পাঠ করেন জেটনেটবিডির সদস্য লিপি রহমান। তিনি বলেন, এই ১০ হাজার মেগাওয়াট যেন কেবল বড় শিল্পপতিদের পকেটে না যায়। প্রান্তিক নারী, কৃষক এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করে একটি 'জাস্ট ট্রানজিশন' বা ন্যায়সঙ্গত জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।

জ্বালানি সংকট নিরসনে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার কথা উল্লেখ করে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া বলেন “আমদানিকৃত জ্বালানির মোহ ত্যাগ করে আমাদের নিজস্ব নবায়নযোগ্য সম্পদের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। স্মার্ট গ্রিড এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে আমরা সৌরবিদ্যুৎকেই দেশের মূল শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারি।”

ডিবিটেক/জেইএইচ/এমইউএম