কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসককে ফিরিয়ে নিলেও নগদ থাকছে ডাকে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসককে ফিরিয়ে নিলেও নগদ থাকছে ডাকে
৫ মার্চ, ২০২৬ ০০:১৮  

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠান নগদে নিযুক্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসককে ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তবে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা ও পরিচালনাগত দায়িত্ব বাংলাদেশ ডাক বিভাগের হাতেই থাকছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের বলছে, ডাক বিভাগের বাইরে নগদের অন্যান্য মালিকানাসংশ্লিষ্টদের অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটির নিট সম্পদ (নেট অ্যাসেট) নেতিবাচক হয়ে পড়েছে। ফলে সংশ্লিষ্টদের আর ব্যবস্থাপনায় ফেরার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকে নগদের প্রশাসক টিমের সঙ্গে ৪ মার্চ, বুধবার গভর্নরের বৈঠকে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। তিনি জানান, বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা হিসেবে অন্য কোনও প্রতিষ্ঠানে প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করা দীর্ঘমেয়াদে উপযুক্ত নয় বলে নগদের বর্তমান প্রশাসক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক মো. মোতাসেম বিল্লাহকে বার্তা দিয়েছেন গভর্নর। জবাবে প্রশাসক জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকেই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।  প্রয়োজনে ডেকে নেওয়া হলে তিনি ফিরে আসবেন। 

এ বিষয়ে মুখপাত্র আরও জানান, নগদে বিশেষ পরিদর্শনে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। আগের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা বর্তমানে অনুপস্থিত। যেহেতু প্রতিষ্ঠানটির মালিক ডাক বিভাগ, তাই তারাই এটি পরিচালনা করবে। প্রয়োজনে নতুন বিনিয়োগকারীর কাছেও মালিকানা হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিতে পারে ডাক বিভাগ।

তিনি আরও জানান, নগদ এখনও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণাঙ্গ লাইসেন্স পায়নি, অন্তর্বর্তীকালীন লাইসেন্সের আওতায় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি গ্রাহকের লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক মনে করে, গ্রাহকের স্বার্থ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি অব্যাহত থাকবে।

প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২১ আগস্ট নগদে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমে ২২ আগস্ট কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান দিদারকে প্রশাসক করা হয়। প্রশাসক নিয়োগের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন টিম এবং আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান কেপিএমজি–এর ফরেনসিক অডিটে গুরুতর জালিয়াতির তথ্য উঠে আসে। 

পরিদর্শনে দেখা যায়, ভুয়া পরিবেশক ও এজেন্ট দেখিয়ে আর্থিক জালিয়াতি এবং অনুমোদনবিহীন অতিরিক্ত ই-মানি সৃষ্টি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ২ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকার হিসাবে গরমিল ধরা পড়ে। এছাড়া অনুমোদন ছাড়াই ৪১টি পরিবেশক হিসাব খুলে ১ হাজার ৭১১ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা সরকারি ভাতা বিতরণের জন্য নির্ধারিত ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে গত বছরের জুনে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, প্রকৃত অর্থ জমা ছাড়াই অন্তত ৬৪৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত ই-মানি ইস্যু করেছে নগদ, যার ফলে সরকারের বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

গত ৫ আগস্টের পর নগদের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর আহমেদসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা আত্মগোপনে চলে যান। অনুপস্থিত থাকায় ২১ আগস্ট প্রশাসক দায়িত্ব নেওয়ার পর সিইও তানভীর আহমেদ, নির্বাহী পরিচালক নিয়াজ মোর্শেদ (এলিট) ও মারুফুল ইসলাম (ঝলক), উপপ্রধান মার্কেটিং কর্মকর্তা খন্দকার মোহাম্মদ সোলায়মান (সোলায়মান সুখন) এবং মানবসম্পদ কর্মকর্তা অনিক বড়ুয়াসহ সংশ্লিষ্টদের বরখাস্ত করা হয়। বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের অনেকে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। 

এরপর এমএফএস প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক বসানোর পর বাংলাদেশ ব্যাংক এর তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছিলেন,  'নগদ' অবৈধভাবে ই-মানি তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬৩০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ই-মানি তৈরি করেছে। এর মানে তারা প্রকৃত তহবিল গ্রহণ করেনি। কিন্তু, এখনো তাদের হাতে টাকা আসছে। ই-মানি ব্যবহার করে তারা বেতন, বোনাস, যাতায়াতসহ অন্যান্য পরিচালন খরচ পরিশোধ করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকার জিটুজি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই তহবিল জব্দ করার জন্য কাজ করছে।

ডিবিটেক/ডিএইচই/এমইউএম