টানা পাঁচ মাস বন্ধ খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)’র শিক্ষা কার্যক্রম। এ নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন এবং হতাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে পাঁচ সহস্রাধিক শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকরা। শিক্ষার্থীরা অস্থির ক্লাসে ফিরতে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম চালু করার জন্য অনতিবিলম্বে ভাইস-চ্যান্সেলর (ভিসি) নিয়োগের দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ২৩ জুলাই, বুধবার বেলা ১১টায় কুয়েটের দুর্বার বাংলা চত্বরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকবৃন্দের যৌথ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন কুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি প্রফেসর ড. মো. সাহিদুল ইসলাম। বক্তৃতা করেন সমিতির সাধারণ সম্পাদক প্রফেসর ড. মো. ফারুক হোসেন, ড. মো. রফিকুল ইসলাম, ড. সুলতান মাহমুদ, অভিভাবক বিথি আক্তার, শিক্ষার্থী মো. সায়েম।
শিক্ষার্থী সায়েম বলেন, ‘আমরা ক্লাস ও পরীক্ষায় ফিরতে চাই। এজন্য দ্রুত উপাচার্য প্রয়োজন। আমাদের পরীক্ষা গ্যাপ আছে। তারও নিরসন প্রয়োজন।’
অভিভাবক বিথি আক্তার বলেন, ‘একটা বিশ্ববিদ্যালয় অভিভাবকহীন থাকলে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো কঠিন। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
প্রফেসর ড. মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারি থেকেই কুয়েট অভিভাবকহীন। এখন আমরা নিরুপায়। দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন। ছাত্র, শিক্ষক ও অভিভাবক সকলে মিলেই আমরা উপাচার্য নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
সভাপতি সাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সকলেই ক্লাস চালুর পক্ষে। কিন্তু এখন সমস্যা হচ্ছে ক্লাস চালু করতে উপাচার্যের নির্দেশনা প্রয়োজন। এ কারণে দ্রুত সময়ের মধ্যে উপাচার্য নিয়োগ প্রয়োজন।’
প্রসঙ্গত, ২১ জুলাই থেকে কয়েকটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ক্লাসে বসে প্রহর গুণছেন শিক্ষকদের ক্লাসে ফিরে আসার। কুয়েট গার্ডিয়ান ফোরাম দ্রুত একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে মানববন্ধন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি’র) চেয়ারম্যান ও শিক্ষা উপদেষ্টা বরাবর স্মারক লিপি প্রদান করেছেন। শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের সাথেও সাক্ষাৎ করে ক্লাস শুরুর দাবি জানিয়েছেন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার বিষয় নিয়ে রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ‘র সাবেক সচিব ও চেয়ারম্যান ড. মোঃ আবদুল মজিদকে প্রদান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
ওই দিন শিক্ষক সমিতির নবম সাধারণ সভায় উপস্থিত ১৫/২০ জন সিনিয়র শিক্ষকসহ অধিকাংশ শিক্ষক ক্লাসে ফিরে যাওয়ার সম্মতি প্রকাশ করেন।
কিন্তু সমিতির কয়েকজন শিক্ষক সেটি খন্ডন করে একটি মতৈক্যে উপনীত হন, সেটি হল শিক্ষকদের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সাথে নিয়ে একই প্লাটফর্মে থেকে প্রথমত দ্রুত ভিসি নিয়োগের ব্যাপারে জোর দাবি জানানো, দ্বিতীয়ত ভিসি নিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে ক্লাস শুরু করা হবে। তবে শিক্ষক লাঞ্ছনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের বিচারের বিষয়ে ভিসি’র কাছে উপস্থাপন করা হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তাব রাখা হবে। সভায় সমিতির চলমান কর্মসূচি স্থগিত বা ওই কর্মসূচির কার্যকারিতা নেই বলা হয়। সমিতির সাধারণ সম্পাদকের ভাষ্য অনুযায়ী যদি সমিতির দেওয়া কর্মসূচি বহাল না থাকে তাহলে ক্লাসে ফিরতে শিক্ষকদের আর কোন বাধা থাকার কথা নয়।
টানা সাড়ে তিন ঘন্টা চলা ওই সভায় ভিসি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত ক্লাসে ফিরে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে সমিতির অনেক শিক্ষক দ্বিমত পোষণ করেন। শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায়ও উপস্থিত শিক্ষকদের অধিকাংশ ক্লাস শুরুর ব্যাপারে সম্মতি প্রকাশ করেছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সভায় উপস্থিত একজন শিক্ষক গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন সিনিয়র শিক্ষক বলেন, ‘একজন শিক্ষক হিসেবে আমি সমিতির সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারি না। আমার ব্যক্তিগত মতামত যদি চান সে ক্ষেত্রে সেক্ষেত্রে বলব, শিক্ষকদের আর রাগ না করে, সময় প্রলম্বিত না করে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাড়ে পাঁচ সহস্রাধিক সাধারণ শিক্ষার্থীর কথা বিবেচনা করে আমাদের উচিত ক্লাসে ফিরে যাওয়া। ছেলে মেয়েদের আমি বলেছিলাম, তোমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় শিক্ষকদের কাছে ক্ষমা না চেয়ে সরাসরি ডীন অথবা ডিপার্টমেন্টের প্রধানদের সাথে যোগাযোগ করে শিক্ষকের একত্রিত করে তাদের কাছে ক্ষমা চাও। তাহলে সমস্যা হয়তো এত দূর সামনে এগোতো না।’
সব মিলিয়ে শিক্ষক সমিতির উপর চাপ বাড়ছে দ্রুত শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে। কিন্তু শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ শুরু থেকেই ভিসি নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত ক্লাসে না ফেরার ব্যাপারে অনড় অবস্থানে রয়েছে। এর নেপথ্যের কারণ অজ্ঞাত।