বন্দর লজিস্টিকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান বিনিময়ের তাগিদ

বন্দর লজিস্টিকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান বিনিময়ের তাগিদ
৩০ জুন, ২০২৫ ০০:০৪  
৩০ জুন, ২০২৫ ১১:৩০  

স্থল, নৌ, সমুদ্রবন্দরহ সার্বিক লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় বৈশ্বিক বিনিয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান বিনিময়ের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে লজিস্টিক খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক সেমিনারে এই অভিমত ব্যক্ত করেন বক্তারা। 

রাজধানীর ডিসিসিআই মিলনায়তনে ২৯ জুন অনুষ্ঠিত সেমিনারে জানানো হয়, কেবল লজিস্টিক খাতে ২৫ শতাংশ ব্যয় কমালে প্রায় ২০ শতাংশ রফতানি বাড়ানো সম্ভব। সেই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় ১ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব হলে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ রফতানি বৃদ্ধি করা সম্ভব। এ জন্য জাতীয় লজিস্টিক নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নে সেক্টর ডেভেলপমেন্ট রোডম্যাপ মাস্টারপ্ল্যান একান্ত আবশ্যক। আর বৈশ্বিক বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাণিজ্য সহযোগিতা এবং লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাশরুর রিয়াজ। মূল প্রবন্ধে তিনি বলেন, গত কয়েক দশকে আমাদের বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে পরিচালিত অর্থনৈতিক অগ্রগতি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত এবং কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দেশ ও অঞ্চলের বাজারের ওপর আমাদের রফতানি পণ্যের নির্ভরশীলতা ঝুঁকির বিষয়। সেই সঙ্গে প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ নতুন মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এমন বাস্তবতায় আমাদের অর্থনীতির বৃহত্তর স্বার্থে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণের পাশাপাশি রফতানি বাজার সম্প্রসারণে বেশি মনোযোগী হওয়ার ওপর তিনি জোরারোপ করেন। একইসঙ্গে বিদেশী বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞান বিনিময়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন মাশরুর রিয়াজ। 
তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাণিজ্য সহযোগিতা এবং লজিস্টিক সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে  প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয়) ড. শেখ মইনউদ্দিন বলেন, এলডিসি পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যে আমাদের প্রতিযোগী সক্ষমতা বাড়াতে সড়ক, রেল, নৌ, বিমান ও সমুদ্রবন্দর এবং ইনফরমেশন সুপার হাইওয়ের সমন্বয়ে একটি বহুমাত্রিক পরিবহন ইকোসিস্টেম প্রয়োজন, অন্যথায় আমাদের অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

লজিস্টিকের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি উল্লেখ করেন, কেবলমাত্র এখাতে যদি ২৫ শতাংশ ব্যয় হ্রাস করা যায়, তাহলে প্রায় ২০ শতাংশ রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব, সেই সাথে পরিবহন ব্যয় ১ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব হলে ৭.৪ শতাংশ রপ্তানি বৃদ্ধি করা সম্ভব। জাতীয় লজিস্টিক নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সেক্টর ডেভেলপমেন্ট রোডম্যাপ মাস্টারপ্ল্যান একান্ত আবশ্যক।        
তিনি  আরো বলেন, লজিস্টিক খাতের উন্নয়নে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা হলো আমাদের কোনো দীর্ঘমেয়াদি বৃহৎ মাস্টারপ্ল্যান অনুপস্থিতি। তিনি জানান, আগামী ২৫-৫০ বছরের জন্য উপযোগী একটি সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। নীতি প্রণয়নে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারার কারণে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রেই গৃহীত নীতিমালা থেকে কাক্সিক্ষত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন।

অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ‘লজিস্টিক পারফরম্যান্স ইনডেক্স ২০২৩’-এর তথ্য মতে লজিস্টিক খাতে বিশ্বের ১৩৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮। বন্দরে যানজট, কাস্টমস প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করা ও অপ্রতুল অবকাঠামো আমাদের আমদানি-রপ্তানির পাশাপাশি সামগ্রিক ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াকে প্রতিনিয়ত ব্যাহত করছে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর দিয়ে আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের ৯২ শতাংশ হয়ে থাকে। জিডিপিতে বন্দর দুটোর অবদান প্রায় ৩০ শতাংশ, এমতাবস্থায় উল্লিখিত বন্দরসহ দেশের সকল রেল, স্থল, নৌ, সামুদ্রিক ও বিমান বন্দরগুলোসহ সার্বিক লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি এবং এক্ষেত্রে কালক্ষেপণের কোনো সুযোগ নেই, তা না হলে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ব।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিল্ডের চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান বলেন, বাস্তবতা হলো বিশেষ করে লজিস্টিক খাতে আমরা একটি জায়গায় আটকে আছি, আমাদের অগ্রগতি কাক্সিক্ষত মাত্রায় নয় এবং বিষয়টি বেশ হতাশার। তিনি  আরও বলেন, দেশের অর্থনীতিতে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অবকাঠামো ও লজিস্টিক খাতে জিডিপির ৮-১০ শতাংশ বা প্রতি বছর প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রয়োজন, যেখানে আমরা বেশ পিছিয়ে রয়েছি।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর সক্ষমতা দাঁড়াবে ১০ মিলিয়ন টিইইউস, যার ব্যবহার নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতকে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি জানান, যেহেতু প্রতি পাঁচ বছরে প্রায় ২ শতাংশ করে জমি কমে যাচ্ছে, তাই লজিস্টিক বিশেষ করে পরিবহন পরিসেবায় রেলওয়ে হতে পারে সবচেয়ে ব্যয় সাশ্রয়ী উপযোগী ব্যবস্থা।

সেমিনারের নির্ধারিত আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত সচিব মোঃ হাবিবুর রহমান, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল)-এর নির্বাহী পরিচালক আলমগীর মোর্শেদ, ডিপি ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ’র কান্ট্রি ডিরেক্টর শামীম উল হক, বাংলাদেশ সাপ্লাইচেইন ম্যানেজমেন্ট সোসাইটির সভাপতি নকিব খান এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)’র সিনিয়র প্রজেক্ট অফিসার (ট্রান্সপোর্ট) হুমায়ুন কবীর অংশগ্রহণ করেন।

মুক্ত আলোচনায় চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়ার এ্যাডমিরাল এম খালেদ ইকবাল (অবঃ), বারবিভার সভাপতি আব্দুল হক, ঢাকা চেম্বারের প্রাক্তন সভাপতি ওসামা তাসীর, প্রাক্তন সহ-সভাপতি এম আবু হোরায়রাহ, প্রাক্তন পরিচালক এ কে ডি খায়ের মোহাম্মদ খান এবং ডিসিসিআই’র স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক আবরারুল আলম প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন। আলোচকবৃন্দ কমপ্লায়েন্স অনুসরণ করে বেসরকারিখাতে আরো বেশি হারে আইসিডি স্থাপন, নদীর নাব্যতা বাড়াতে ঢ্রেজিং কার্যক্রম বাড়ানো, বন্দর ভিত্তিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং সরকারের সংস্থার মধ্যকার সমন্বয় সম্প্রসারণের উপর জোরারোপ করেন।       

এ সময় ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মোঃ সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ সহ সংশ্লিস্ট স্টেকহোল্ডারবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।