সাইবার দুনিয়ায় নারীর নিরাপত্তা কোথায়?

আফরিনা খান লোটাস

সাইবার দুনিয়ায় নারীর নিরাপত্তা কোথায়?
১২ জুন, ২০২৫ ১১:৫৯  
১২ জুন, ২০২৫ ১৪:১২  

ঢাকা শহরের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া নুসরাত (ছদ্মনাম) সম্প্রতি একটি ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। হঠাৎ করেই তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে আপত্তিকর ছবি ছড়িয়ে পড়ে। হ্যাকারেরা তার ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নিয়ে ব্ল্যাকমেইল শুরু করে। বিষয়টি শুধু ভার্চুয়াল জগতে আটকে ছিল না—এর প্রভাব পড়ে তার বাস্তব জীবনে, শিক্ষা ও পারিবারিক পরিবেশে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের নারীরা দিনে দিনে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষ হয়ে উঠলেও, একই সাথে বেড়ে যাচ্ছে সাইবার সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কাও। নানা ধরনের প্রযুক্তি নির্ভর অপরাধের মধ্যে হ্যাকিং, ফিশিং, ডিপফেইক ভিডিও তৈরি, পরিচয় চুরি, প্রাইভেট চ্যাট প্রকাশের মত কাজ দেখা যায়। এসবই বর্তমানে নারীদের প্রতি সহিংসতার নতুন রূপ হয়ে উঠেছে।

একবার কল্পনা করুন, একজন অপরিচিত ব্যক্তি আপনাকে এমন একটি বার্তা পাঠিয়েছে যেখানে আপনার দৈনন্দিন জীবনের ভয়াবহ নিখুঁত বিবরণ রয়েছে। অথবা ভাবুন, আপনার ভিডিও ফুটেজ ডিজিটালি বিকৃত করে অশ্লীল কনটেন্টে পরিণত করা হয়েছে এবং তা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে।

এটি কোনো কল্পিত ডিজিটাল নির্যাতনের ঘটনা নয়—আজকের ডিজিটাল জগতে লক্ষ লক্ষ নারী ও মেয়েদের জন্য এটি একটি ভয়াবহ বাস্তবতা। সাইবার সহিংসতার মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে কাউকে হেয়, ভয়ভীতি, লাঞ্ছিত বা ব্ল্যাকমেইল করার মত অপরাধ থাকে। নারীদের ক্ষেত্রে এটি আরও বেশি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, কারণ সামাজিক সংস্কার, পারিবারিক শঙ্কা এবং আইনি জটিলতার কারণে অধিকাংশ নারীই অভিযোগ করতে ভয় পান। ফলে অপরাধীরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে শহরাঞ্চলের ৭৮% নারী স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, তবে তাদের ৬৫% কখনও না কখনও অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়েছেন। হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক, ইউটিউব প্ল্যাটফর্ম এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, অনেক ক্ষেত্রেই নির্যাতনের ক্ষেত্রেও রূপ নিয়েছে।

আমরা অনেকেই মনে করি, প্রযুক্তি জানলে নিরাপদ থাকা সম্ভব। কিন্তু বিষয়টি এতটা সহজ নয়। অনেক শিক্ষিত নারীও সাইবার আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। কারণ অধিকাংশ ব্যবহারকারী জানেন না, কীভাবে নিজের তথ্য সুরক্ষিত রাখতে হয়, কীভাবে ফিশিং ইমেইল চিনতে হয়, কিংবা কীভাবে থ্রিডি অথেন্টিকেশন ব্যবহার করতে হয়। আমি নিজে একজন তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী হিসেবে বলতে পারি, আমাদের সমাজে নারীদের সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রথম ধাপ হিসেবে সচেতনতা বাড়াতে হবে। স্কুল-কলেজে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। মেয়েদের শেখাতে হবে—অজানা লিংকে ক্লিক না করা, ব্যক্তিগত ছবি কখনও প্রকাশ না করা, ২-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন ব্যবহার করা ইত্যাদি। নারী শিক্ষার্থীদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আলাদা কর্মশালা আয়োজন করা উচিত। এছাড়াও নারীদের শুধু ব্যবহারকারী না হয়ে প্রযুক্তির মাস্টার হতে হবে। কীভাবে ডিভাইস সুরক্ষিত রাখা যায়, কিভাবে ফেক অ্যাপ চিনে ফেলা যায়, কিভাবে রিপোর্ট ও ব্লক করতে হয়—এসব বিষয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। আমি নিজে কয়েকটি স্কুল ও নারী উদ্যোক্তা কেন্দ্রে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেছি। অংশগ্রহণকারীদের প্রতিক্রিয়া দেখে বুঝেছি—তারা আগ্রহী, কিন্তু সুযোগ পাচ্ছেন না।

অনলাইনে হয়রানির শিকার হওয়া মানেই লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। এই মনোভাব আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন রয়েছে, তবে অনেক নারী আইন সম্পর্কে জানেন না বা থানায় যেতে ভয় পান। এজন্য ৯৯৯ নম্বরের মত একটি বিশেষ হেল্পলাইন থাকা দরকার, যেখানে নারী অফিসাররা নিরাপদে অভিযোগ গ্রহণ করবেন এবং তাৎক্ষণিক পরামর্শ দেবেন। নারীরা যদি প্রযুক্তি খাতে আরও বেশি যুক্ত হন, তাহলে তারা নিজেরা যেমন নিরাপদ থাকবেন, তেমনি অন্য নারীদের নিরাপদ রাখতে ভূমিকা রাখতে পারবেন। বর্তমানে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে, কিন্তু এখনও তা মাত্র ১৩%-এর মতো। প্রতিটি স্কুল-কলেজে অন্তত একজন নারী আইটি শিক্ষক থাকলে ছাত্রীদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল ব্যবহার শেখানো সহজ হবে। তাছাড়া, গৃহিণী, নারী উদ্যোক্তা, নারী সাংবাদিক—যারা নিয়মিত প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন, তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থাকা দরকার।

প্রযুক্তি যেমন আশীর্বাদ, তেমনি সতর্ক না থাকলে এটি অভিশাপেও পরিণত হতে পারে। আমাদের নারীরা আজকাল অনলাইন মার্কেটিং, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি, এমনকি প্রোগ্রামিংয়েও কাজ করছেন। এই অগ্রযাত্রায় তাদের পাশে থাকতে হবে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে। নারীদের সাইবার নিরাপত্তা কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিষয় নয়—এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। প্রতিটি নারীকে নিজের ডিজিটাল অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে, একই সাথে সমাজকেও প্রস্তুত করতে হবে নারীদের জন্য একটি নিরাপদ ভার্চুয়াল জগত গড়ে তোলার জন্য।

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী

দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।