বিটিআরসি প্রহসনের কমিশনে পরিণত হয়েছে : চেয়ারম্যান

১৭ অক্টোবর, ২০২৪ ১৩:৪৪  

মন্ত্রণালয় নয় বিটিআরসি-কে স্বাধীন কমিশন হিসেবে দেখতে চান এই খাতের ব্যবসায়ীরা। তারা মনে করেন, সংস্কারের জন্য রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা (পলিটিক্যাল অ্যাফিলিয়েশন) বা ক্ষমতাপুজারী ব্যবসায়ীদের প্রতি আনুকূল্য থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের মধ্যে বদলাতে হবে স্বৈরাচারী আচরণ। এছাড়াও লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখ এবং সবার জন্য সমান সুযোগ দাবি করা হয়।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবনের সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত টেলিকম খাতের ইকো সিস্টেম পুণর্বিবেচনা নিয়ে স্টেক হোল্ডার বৈঠকে এই দাবি করা হয়। অনুষ্ঠানে কি-নোট উপস্থাপন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোঃ রোকনুজ্জামান। উপস্থাপনায় তিনি মার্কেট মনোপলি ভাঙার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এমদাদ উল বারীর সভাপত্বিত্বে বৈঠকে টেলিকম খাতের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা ও ব্যাসায়ী প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলেন, মোবিলিটি নয় সংযোগ ও কানেক্টিভিটির জন্য বাংলাদেশে মোবাইল সার্ভিস চালু হয়। সংযোগ স্থাপনই ছিলো মূল উদ্দেশ্য। তাই ভয়েস কল নেটওয়ার্ত ছড়াতেই অবকাঠামো স্থাপন করা হয়। কিন্তু ডাটা কানেকশন চালুর পর ভিওআইপি’র জুুজুর ভয় আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এক্ষেত্রে টেলিকম বিশ্ব ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বিশ্বের মতো আমরাও বুঝতে পারছি ডাটা এখন লাইফ লাইন। সেখানে আমাদের নেটওয়ার্ক টপোলজি রেখে এগিয়ে যাওয়া দুরুহ হয়ে উঠছে। তাই এখন রিফর্ম করা জরুরী। স্টেট মনোপলি ভাঙতে গিয়ে এখন প্রাইভেট মনোপলি গড়ে উঠছে। এটার জন্য রেফারিং দরকার। সেটাই বিটিআরসি করছে। বিটিআরসি স্বাধীন কমিশন হিসেবে লাইসেন্স দেয়া থেকে পরামর্শক নিয়োগ করে। ২০১০ সালে একটি শৈল্পিক পরিবর্তন হয়। সেখানে সরকারি পূর্বানুমোদন যুক্ত হয়। এর মাধ্যমে বিটিআরসি প্রহসনের কমিশনে পরিণত হয়েছে। লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা দেয়া হয়েছে। এখান থেকে আমাদের পরিবর্তন করতে হবে। অতীতের ড্যামেজ রিপিয়ার করতে হবে। একইসঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজন পূরণে ইকো-সিস্টেম রিফর্ম করতে হবে। ২০২৭ সালের মধ্যে অনেক লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হবে। এর মধ্যেই আমাদের কাজ করতে হবে। আমরা চাই গ্রাহকের সেবা বান্ধব অবকাঠামো। সে লক্ষ্যেই আমরা লেয়ারগুলো রিফর্ম করবো। মধ্যস্বত্বভোগী কমাবো।

বৈঠকে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির, রবি’র সিইও রাজিব শেঠী, এমটব সাবেক সভাপতি মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, ম্যাংগো টেলিকেমের সিইও মান্নান খান, বাংলাফোনের এমডি আমজাদ হোসেন খান, ই ডট কো কান্ট্রি ম্যানেজার সুনীল আইজ্যাক, নভোকম এমডি হাসিবুর রহমান, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (আইআইজিএবি) সদস্য সচিব অবসরপ্রাপ্ত মেজর মাহমুদ শাহেদ, আইএসপিএব সভাপতি ইমদাদুল হক, টেলিকম বিশেষজ্ঞ টি আই এম নুরুল কবির, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) এস এম ফরহাদ প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।  

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, আইএসপি ও আইআইজি’র জন্য দাম বেধে দেয়া হলেও মোবাইল অপারেটরদের জন্য না করায় এবং লাস্ট মাইলে সিডিএন স্থাপনের বাধা থাকায় লেভেল প্লেয়িং করা হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন আইএসপিএবি সভাপতি ইমদাদুল হক। খাতে খাতে ট্যাক্স-ভ্যাট থাকায় তৃণমূলে ইন্টারনেট খরচ কমানো যাচ্ছে না।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবো বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, আগে পছন্দের মানুষদের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। টেকসই লাইসেন্স দেয়া হয়নি, অপ্রয়োজনীয় লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। ফলে সেবা নষ্ট হয়ে গেছে। বিটিআরসিকে টেলিকমিউনিকেশন থেকে ডিজিটাল সার্ভিস প্রোভাইডারে পরিনত করা লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। এখন পরিস্কার ও নির্ভরযোগ্য আইনের প্রয়োজন। এই ভরসা পেলে গুগল ফেসবুক আমাদের দেশে বিনিয়োগ করবে। ২ বা ১ সপ্তাহের মধ্যে ইন্ডাস্ট্রি, একডেমিয়া ও রেগুলেটর এক্সপার্টদের নিয়ে টেলিকমখাতের রিফর্ম করা হবে।

অপরদিকে রবির সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, সবারে আগে বিটিআরসিকে রিফর্ম করতে হবে । বিটিআরসির সাথে টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় জড়িত রয়েছে। তিনটি পার্ট না রেখে শুধু বিটিআরসিকে একক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশেরে টেলিকম অপারেটরে ৬০-৭০% রেভিনিউ ভয়েস কল থেকে তাই ডাটা প্রাইজে হস্তক্ষেপ করা যাবে না এবং লাইসেন্সিং বেরিয়ার না রেখে ইউনিফাইড লাইসেন্স প্রদান করতে হবে যেটা বৈশ্বিক প্রাকটিস হিসেবে বিবেচিত। টাওয়ার নির্মাণ টাওয়ারকো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হতে হবে। এমএনও কর্তৃত টাওয়ার নির্মাণ করলে যার সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার রয়েছে ক্রিটিক্যাল সাইটসমূহে তার সাথে টাওয়ার শেয়ারিং করা যায় না। তাই একটিভ শেয়ারিং ও প্যাসিভ শেয়ারিং উভয়টি থাকতে হবে। সাবমেরিন ক্যাবলের আনইউটিলাইজড ব্যান্ডউইডথ রয়েছে সেটা ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। দেশীয় ডাটা সেন্টার আইসিটি ডিভিশন এর অধীন থেকে বিটিআরসির অধীনে আনতে হবে। টাকা সংগ্রাহকের ভূমিকায় না থেকে বিটিআরসিকে দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির দিকে ভূমিকা রাখতে হবে।

ইডটকো এর কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টের সুনিল আইজ্যাক জানান, বাংলাদেশে যেকোনো ফরেইন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় নেয়-বিটিআরসি-সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিতে হয়। আমাদের একটি সিংগেল উইন্ডো দরকার। দ্বিতীয়ত রুরাল কাভারেজ প্রসারের ক্ষেত্রে একটিভ শেয়ারিং করতে পারি কিনা সেটা বিবেচনায় নিতে হবে। তৃতীয়ত দেশের ৯০ ভাগ আইডটোর কাভারেজ-১০ ভাগ ইনডোর কাভারেজ—ইনডোর কাভারেজ বাড়াতে হবে। ইনডোর কাভারেজের প্রসারণ করতে হবে। এমটব এর সাবেক মহাসচিব টিআইএম নূরুল কবীর বলেন, আমি পরবর্তী ২০ বছরের টেলিকম খাতে কি ভিশন দেখতে চাই সেটা গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাসিভ লেয়ার অব লাইসেন্সিং সিমলেস অপারেশনের ক্ষেত্রে বাধা।  যখন বিনিয়োগকারীর আসে তখন বিনিয়োগকারীরা কমফোর্ট লেভেলটা গুরুত্বপূর্ণ। কনভারজেন্সটা গুরুত্বপূর্ণ । ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে ডিজিটাল সার্ভিসেসকে গুরুত্ব দিতে হবে। বর্তমান সরকার রিফর্ম এ গুরুত্ব দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (আইআইজিএবি) সদস্য সচিব  মেজর (অব.) মাহমুদ শাহেদ বলেন,  ২০১৪ সালে আইআইজি ৩৪ লাইসেন্স দেয়া হয়। রেভিনিউ শেযারিং প্রপার হওয়া উচিত। সরকারি-বেসরকারি আইআইজি অপারেটর এর সাথে বৈষম্য রয়েছে। সরকারি আইআইজিকে কোনো ট্যিারিফ দিতে হয় না। আইআইজি থানা আইএসপিদের সহজে ব্যান্ড্উইডথ দেয়। ৩ হাজারের বেশি আইএসপি লাইসেন্স রয়েছে। আইআইজি এসওফ ফান্ডে অবদান রাখে , তাই এটা টেলিকম অবকাঠামোর জন্য ব্যয় করা উচিত। বিটিআরসিকে রেভিনিউ কালেক্টর হিসেবে না ফেসিলেটিটের হিসেবে কাজ কাজ করতে হবে।

আইআইজি প্রতিষ্ঠান নভোকম লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, স্টেট মনোপলি থাকায় পূর্বে ব্যান্ডউইডথ ব্যবহার কমেছে। বর্তমানে ২০০ টাকা পার এমবিপিএস ব্যান্ডউইডথ এর মূল্য এর  এটা কমার কারণ হলো আইটিসি। আমাদের বাজারকে সঠিকভাবে সজ্ঞায়িত করতে হবে যাতে মার্কেট মনোপলি তৈরি না হয়। ফ্লোর প্রাইস বিটিআরসি নির্ধারণ করে। প্রাইস রেগুলেশন করা হয় রেভিনিউ কালেক্ট করার জন্য।