আপডেট:
বিটিআরসি’র কর্মশালায় টেলিকম খাতে সক্রিয় অবকাঠামো শেয়ারিং জোরদারের তাগিদ
রাজধানীতে টেলিযোগাযোগ খাতের কাঠামোগত সংস্কার, ব্যয়-সাশ্রয়ী নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি প্রস্তুতির লক্ষ্যে সক্রিয় অবকাঠামো শেয়ারিং নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে এক বহুপক্ষীয় কর্মশালায়। ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী এই কর্মশালার আয়োজন করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর, ন্যাশনওয়াইড টেলিকম ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক অপারেটর, টাওয়ার কোম্পানি, স্যাটেলাইট ও সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি, আন্তর্জাতিক গেটওয়ে অপারেটর, ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী, টেলিকম যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞসহ প্রায় ১৩০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।
আলোচনায় নতুন টেলিকম নীতির আলোকে অবকাঠামো শেয়ারিং নীতিমালা যুগোপযোগীকরণ, নেটওয়ার্ক ব্যয় কমানো, সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় অবকাঠামো শেয়ারিং, প্রান্তিক পর্যায়ে ফাইভ-জি প্রস্তুতি এবং গ্রাহকবান্ধব সেবা নিশ্চিতের বিষয় গুরুত্ব পায়।
কর্মশালার স্বাগত বক্তব্যে বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইকবাল আহমেদ (অব.) বলেন, “একটিভ শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে পাশাপাশি বেশকিছু চ্যালেঞ্জও উঠে আসবে। টেলিকম স্টেকহোল্ডারগণ সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে যেহেতু বাস্তব প্রতিবন্ধকতাসমূহ বেশি অবগত থাকেন, সেহেতু একটিভ শেয়ারিং গাইডলাইন কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে অংশীজনদের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
উদ্বোধনী বক্তব্যে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.) বলেন, “দেশের শতভাগ এলাকা নেটওয়ার্ক কাভারেজের আওতায় আসলেও ফাইভ-জি চালু এবং গ্রাহককে মানসম্মত ভয়েস ও ডাটা সেবা নিশ্চিতকরণের জন্য একটিভ শেয়ারিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশে ফাইভ-জি চালু করতে প্রচুর বিনিয়োগ ও রিসোর্স মবিলাইজেশনের প্রয়োজন হবে। টেলিকম অবকাঠামোয় একটিভ শেয়ারিংয়ে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ উভয় দিক রয়েছে, তাই সেসব বিষয় মাথায় রেখে অংশীজনদের সাথে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে একটিভ শেয়ারিং গাইডলাইন প্রস্তুত করা হবে।” তিনি মত দেন যে, “একটিভ শেয়ারিং নিরাপদ ইকোসিস্টেম, সুস্থ প্রতিযোগিতা এবং টেলিযোগাযোগ খাতের প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।”
কর্মশালায় টাওয়ার কোম্পানির প্রতিনিধিরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, শেয়ারড অবকাঠামো ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বল্প খরচে দ্রুত কানেক্টিভিটি সম্প্রসারণ সম্ভব। এতে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়বে এবং সারাদেশে দ্রুত সেবা চালু করা সহজ হবে। একই কাঠামোয় বিভিন্ন সেবা প্রদান সম্ভব হওয়ায় এটি ভবিষ্যৎ টেলিকম ইকোসিস্টেমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করবে বলেও তারা মত দেন।
ন্যাশনওয়াইড টেলিকম ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক অপারেটরদের প্রতিনিধিরা বলেন, একটিভ অবকাঠামো শেয়ারিং কার্যকর করতে হলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। এটি মূলধনী ব্যয় কমালেও বহুস্তরীয় লাইসেন্সিং কাঠামোর কারণে বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।
মোবাইল অপারেটরদের প্রতিনিধিরা জানান, প্যাসিভ শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে ইতোমধ্যে পরিচালন ব্যয় অনেকটাই কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে ফাইভ-জির জন্য একটিভ শেয়ারিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা বলেন, কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য পারস্পরিক আস্থা, সমন্বিত কাঠামো এবং প্রণোদনা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের প্রতিনিধি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে অবকাঠামো নির্মাণের ফলে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। অবকাঠামো শেয়ারিং এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর হতে পারে। যেখানে স্থলভিত্তিক নেটওয়ার্ক পৌঁছায় না, সেখানে নন-জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট ব্যবহারের মাধ্যমে সংযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা বলেন, একটিভ শেয়ারিং চালু হলে একই অবকাঠামো একাধিক ইন্টারনেট সেবাদাতা ব্যবহার করতে পারবে, ফলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং শহরের ঝুলন্ত তারের জট কমানো সম্ভব হবে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা আরও বলেন, অবকাঠামো শেয়ারিং পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে রিসোর্সের পুনরাবৃত্তি কমবে, সুশৃঙ্খল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে এবং গ্রাহক পর্যায়ে সেবার মান বাড়বে। একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডেটার যৌক্তিক পৃথকীকরণ এবং কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। লাস্ট মাইল সংযোগে অপারেটরদের অনাগ্রহের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয় ভূমিকার প্রয়োজনীয়তাও উঠে আসে।
কর্মশালায় স্থানীয় পর্যায়ে যৌথ উদ্যোগে অবকাঠামো উন্নয়ন, ফাইবার ব্যাংক গঠন, গেটওয়ে পর্যায়ে পিয়ারিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় ডেটা স্থানীয়ভাবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি এবং অপারেটরদের পরিচালন ব্যয় কমাতে বিদ্যুৎসহ অন্যান্য অবকাঠামো যৌথ ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়। অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ডিডস আক্রমণের ঝুঁকি কমানো এবং নেটওয়ার্কের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
সমাপনী বক্তব্যে বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান মো. আবু বকর ছিদ্দিক অংশগ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, সকল অংশীজনের স্বার্থ বিবেচনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবকাঠামো শেয়ারিং গাইডলাইন প্রণয়ন করা হবে এবং এ কর্মশালায় প্রাপ্ত মতামত এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সামগ্রিকভাবে কর্মশালাটি টেলিযোগাযোগ খাতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তিগত সমন্বয়, ব্যয় সাশ্রয় এবং মানসম্মত সেবা নিশ্চিতের জন্য সক্রিয় অবকাঠামো শেয়ারিংকে অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, টেলিযোগাযোগ খাতে সক্রিয় অবকাঠামো শেয়ারিং হলো একাধিক মোবাইল অপারেটর বা টেলিকম সেবাদাতার মধ্যে নেটওয়ার্কের ইলেকট্রনিক বা সক্রিয় সরঞ্জামগুলো যৌথভাবে ব্যবহার করার প্রক্রিয়া। এটি কেবল টাওয়ার বা জায়গা শেয়ার করার (প্যাসিভ শেয়ারিং) চেয়ে উন্নত একটি ব্যবস্থা । সক্রিয় শেয়ারিংয়ের শেয়ার করা প্রধান উপাদানের আওতায় রয়েছে রেডিও অ্যাক্সেস নেটওয়ার্ক (RAN), বেস স্টেশন (BTS), কোর নেটওয়ার্ক (Core Network) এবং ট্রান্সমিশন সিস্টেম। দ্রুত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, পরিচালনা ব্যয় (OPEX) এবং মূলধনী ব্যয় (CAPEX) হ্রাস করা এবং সেবার মান উন্নত করতে এই শেয়ারিং করা হয়। এর মাধ্যমে অপারেটররা ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় সাশ্রয় করতে পারে।
এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে বিটিআরসি অ্যাকটিভ শেয়ারিংয়ের ওপর জোর দিচ্ছে। টাওয়ারের পাশাপাশি এন্টেনা এবং সক্রিয় সরঞ্জাম শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে ইন্টারনেটের মান উন্নত করার লক্ষ্যে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। নীতিমালার অধীনে টাওয়ার, বিদ্যুৎ সংযোগ, শেল্টার শেয়ারের পাশাপাশি ফ্রিকোয়েন্সি এবং রেডিও ইকুইপমেন্ট শেয়ার করার মাধ্যমে নেটওয়ার্কের ভিড় কমানো এবং একই সাথে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে সুবিধাভোগীরা পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হিসেবে কাজ করতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদী নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
ডিবিটেক/এএএম/ইকে



