ওয়াক আউট করে ফেসবুকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ! শোনালো জামায়াত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ প্রত্যখ্যান করে সংসদ থেকে ‘ওয়াকআউট’ করে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তবে নিজেদের ভেরিফায়েড ফেজবুকে ওয়াক আউটের পরেও রাষ্ট্রপতির ভাষণ অনুসারীদের সামনর সরাসরি সম্প্রচার করছে দলটি।
একইভাবে লাইভ ব্রস্টকাস্টেরা ষ্ট্রপতি তিনটি অপরাধে অপরাধী দাবি করেছে বলে জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘এই প্রেসিডেন্ট তিনটা কারণে অপরাধী। তার বক্তব্য এই মহান সংসদে আমরা শুনতে পারি না। প্রথম কারণ, তিনি সব খুনের সহযোগী ছিলেন। দ্বিতীয়ত, তিনি ২০২৪ সালের আগস্টের ৫ তারিখ তিনি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ভাষণে তিনি বলেছিলেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা মঞ্জুর করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি তা অস্বীকার করেছেন। তিনি জাতির সামনে মিথ্যাবাদী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন।
তৃতীয় কারণ হিসেবে জামায়াত আমির বলেন, রাষ্ট্রপতি নিজের হাতে অর্ডিন্যান্স স্বাক্ষর করেছেন। নির্বাচনে দুটি ভোট হবে, এতে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবে তারা সংস্কার সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হবেন। একই দিনে উভয় শপথ একই ব্যক্তি পড়াবেন।
এই শপথ দুটি আমরা নিলেও সরকারি দল নেয়নি। রাষ্ট্রপতির প্রথম দায়িত্ব ছিল অধ্যাদের জারির ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা। তিনি সেই অধিবেশন ডাকেননি। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি এই ৭০ শতাংশ মানুষকে অপমান করেছেন। এখানেও তিনি অপরাধ করেছেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী অনুযায়ী ভাষণ দিতে রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন। এ সময় বিরোধী দল জামায়াতের সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। তাদের হাতে প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। প্ল্যাকার্ডে ‘জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না’, ‘জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বন্ধ কর’–সহ বিভিন্ন স্লোগান লেখা রয়েছে। স্পিকার এ সময় সবাইকে শান্ত থাকতে আহ্বান জানান।
এসময়।জাতীয় সংসদের অধিবেশনের দর্শক সারিতে সদ্য সাবেক অন্তর্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সেনাপ্রধান ওয়াকার–উজ–জামান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী জুবায়দা রহমান, কন্যা জাইমা রহমানসহ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী প্রধান প্রমুখকে দেখা গেছে।
হট্টগোল, প্রতিবাদ, চিতকারের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি সংসদের অধিবেশনে প্রবেশ করেন ও স্পিকারের পাশে বসেন। এসময় সংসদে হইচই করতে থাকেন বিরোধী দল জামায়াতের সংসদ সদস্যরা। তবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গিত পরিবেশনার সময় চিৎকার-চেচামেচি বন্ধ করে সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে যান জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা।
শেষ হওয়া মাত্র আবারো শুরু হয় হট্টগোল। এর মধ্যেই বক্তব্য শুরু করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তার বক্তব্য চলাকালে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সংসদ সদস্যদের টেবিল চাপড়াতে দেখা যায়। স্পিকার বার বার রাষ্ট্রপতির ভাষণ শোনার অনুরোধ জানালেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ওয়াক আউট করেন।
ভাষণে রাষ্ট্রপতি জাতিকে জানান, বর্তমানে দেশে ভোটার সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ‘পোস্টাল ব্যালট অ্যাপ’র মাধ্যমে ১৫ লাখের বেশি প্রবাসী ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন। তিনি এটিকে নির্বাচন কমিশনের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনআস্থা অনেকটাই কমে গিয়েছিল। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা আবার ফিরে এসেছে। নির্বাচন কমিশন যাতে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অটুট রাখতে পারে, সে জন্য ভবিষ্যতের নির্বাচনী কার্যক্রমেও সরকার সেটি সমুন্নত রাখবে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান যাতে আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, সরকার তা নিশ্চিত করবে।
তিনি আরও বলেন, হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সবার সম্মিলিত আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ২০০১ সালের জুনে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ২০০১ সালের অক্টোবরে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ প্রণয়ন করে। এর ফলে বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি পায় বাংলাদেশ।
মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন এক পর্যায়ে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। দেশের ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, প্রবাসী তথা সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলসহ সবার সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে। হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়।
এদিকে বিরোধী দল ওয়াক আউট করলে নবনির্বাচিত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীরবিক্রম) অধিবেশন আগামী রোববার (১৫ মার্চ) সকাল ১১টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেছেন। ওই দিন সকাল ১১টায় ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় কার্যদিবস শুরু হবে।
ডিবিটেক/ডিপিএমবিটি/এমইউএম







