৬০% নারী কোটা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য ভাইরাল

ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ শুধু ডিভাইস নয়, এটা পেডাগজি-রিফর্ম

ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ শুধু ডিভাইস নয়, এটা পেডাগজি-রিফর্ম
২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১১:৩৮  

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিক নিয়োগে নারীদের ৬০ শতাংশ কোটা পুনর্বহালের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এরপর ওই বক্তব্য নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

ভিডিওটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ওই বক্তব্য তিনি মন্ত্রী হওয়ার পরে দেননি। বরং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রচারণাকালে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মন্তব্যটি করেছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৮ জানুয়ারি চাঁদপুর-১ (কচুয়া) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি প্রচারে অংশ নেওয়ার সময় তিনি এক বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেন। সম্প্রতি সেই সাক্ষাৎকারের একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

সাক্ষাৎকারে এহছানুল হক মিলন বলেন, নারী শিক্ষার প্রসারে উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু করেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি প্রথমে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এবং পরে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত উপবৃত্তির ব্যবস্থা করেন। পুনরায় দায়িত্ব পেলে তা ডিগ্রি পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তারেক রহমান ডিগ্রি লেভেল পর্যন্ত উপবৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারণ করবেন।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ প্রসঙ্গে এহছানুল হক মিলন বলেন, নারীরা ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষিকা নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ কোটা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে বিগত সরকার বাতিল করে। সেই কোটা পুনর্বহাল করা হবে বলেও তিনি সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন।

এছাড়া বক্তব্যে তিনি মাদরাসা শিক্ষা ও ইংরেজি শিক্ষার মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করার কথা বলেন। কর্মমুখী শিক্ষা সম্প্রসারণ, প্রবাসীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব বাড়িয়ে একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

ত্রয়োদয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন এহছানুল হক মিলন।

মন্ত্রী হওয়ার পর প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগে নারী কোটা ফেরানোর বিষয়ে তিনি আর কোনো মন্তব্য করেননি। সংবাদ সম্মেলনে তার কাছে এ বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি তা এড়িয়ে যান। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি 

আমরা আমাদের সময়ে হেরিটেজ, কালচার, হিস্ট্রি, রিলিজিওন্সকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাপিডিয়াতে অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম। কিন্তু আমরা তখন ওদেরকে (ইংলিশ মিডিয়ামকে মন্ত্রণালয়ের) রেগুলেটরিতে আনতে পারিনি। সেই সময় এ উদ্যোগটা নিয়েও নেওয়া হয়নি। সেটা ভিন্ন গল্প। এবার আমার সঙ্গে প্রতিমন্ত্রীর কথা হয়েছে। আমরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোকে কীভাবে মন্ত্রণালয়ের রেগুলেটরির আন্ডারে আনা যায়, সেই ব্যবস্থা আমাদের নিতেই হবে। 

গত অর্থবছরে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উন্নয়ন তহবিলের প্রায় ৫৩ শতাংশ অব্যবহৃত থেকে ফেরত যাওয়ার ব্যর্থতা যেন পুণরাবৃত্তি না হয় সেজন্য পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা কমিশনের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অনুমোদন ও প্রকল্প গেটকিপিং স্কুল বর্ষপঞ্জির সঙ্গে রি-অ্যালাইন করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন এহসানুল হক মিলন। তার ভাষায়, অর্থ বিভাগের ক্যাশ রিলিজ সমান কিস্তিতে না করে মাইলস্টোনভিত্তিক করব কোড, টেক্সটবুক, প্রশিক্ষণ, নির্মাণ সবগুলোর আলাদা মাইলস্টোন থাকবে। ই-জিপি (ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা) বাধ্যতামূলকভাবে আগেভাগে চালু করে প্রকিউরমেন্ট প্ল্যানিং করব, যাতে জুনে এসে দরপত্রের ভিড় না হয়। কন্ট্রোলার জেনারেল অব অ্যাকাউন্টসের লেজার পর্যন্ত হিসাব থাকবে, কিন্তু সেই হিসাবের শেষ গন্তব্য হবে ক্লাসরুমের আওয়ার মানে পাঠদানের ঘণ্টা।’

অগ্রাধিকার কাজ নিয়ে তিনি বলেছেন, আমাদের অগ্রাধিকার হবে শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, বিজ্ঞানাগার, গ্রন্থাগার, ভাষা ল্যাব তৈরি করা, ডিজিটাল কনটেন্ট ও মূল্যায়ন সক্ষমতা তৈরি করা, স্কুলের অবকাঠামো বিশেষ করে পানি, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিক করা।

মন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ শুধু ডিভাইস নয়, এটা পেডাগজি-রিফর্ম। আমাদের ইশতেহারে আছে, ‘ফ্রি ওয়াই-ফাই, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব। আমরা এটাকে ‘গ্যাজেট প্রজেক্ট’ বানাব না। আমরা এটাকে বানাব শিক্ষণ-শেখার অপারেটিং সিস্টেম। আমরা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সাথে সমন্বয় করে স্কুল পর্যায়ে ডিজিটাল লিটারেসি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সচেতনতা, সাইবার সেফটি এই তিনটি বাধ্যতামূলক সক্ষমতা হিসেবে নিয়ে আসব। শিক্ষক ট্যাবের ভেতর থাকবে, পাঠ-পরিকল্পনা টেমপ্লেট, প্রশ্নব্যাংক, উপস্থিতি ও শিখন-প্রমাণ (লার্নিং এভিডেন্স) আপলোড যাতে ‘শেখা’ ট্র্যাক করা যায়। আর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘ডিজিটাল দক্ষ বাংলাদেশ’ ভিশন বাস্তবায়নে জাতীয় ডিজিটাল দক্ষতা কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রতিশ্রুতির সাথে শিক্ষা খাতকে যুক্ত করব।

তিনি আরও বলেন, আমরা মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই বিজ্ঞান শিক্ষা, প্রযুক্তি সাক্ষরতা ও প্রজেক্টভিত্তিক কাজকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেব। প্রতিটি উপজেলায় নির্বাচিত স্কুলে রোবটিক্স ও মেকার কর্নার তৈরি হবে। বিজ্ঞানকে বই থেকে বের করে টার্মভিত্তিক প্র্যাকটিক্যাল রুটিনে আনা হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে বিষয়জ্ঞান ও অ্যাসেসমেন্ট লিটারেসি বাধ্যতামূলক করা হবে। এই উদ্যোগগুলো তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ যৌথভাবে চালাবে।’

কারিগরি ও সাধারণ শিক্ষায় সেতুবন্ধন রচনার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ে ক্রেডিট ব্রিজ কোর্স তৈরি হবে। মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া ইন্টার্নশিপ ও ক্যারিয়ার সেন্টার বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে বাধ্যতামূলক করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ক্লাস নেবে না, গবেষণা ও উদ্ভাবন করবে। উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ইনোভেশন গ্র্যান্ট চালু করা হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্ট লোন ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা সহায়তার ব্যবস্থা থাকবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিকায়ন ও মানোন্নয়ন করা হবে। এটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার রোডম্যাপের অংশ।