স্মার্ট টাস্কফোর্সের মাধ্যমে হবে ত্রিমাত্রিক সমন্বয়
ইন্ডাস্ট্রি, একাডেমিয়া ও সরকারের মধ্যে ত্রিমাত্রিক বন্ধন তৈরির মাধ্যমে ডিজিটাল থেকে স্মার্ট পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তথ্য প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জন ও গবেষনার সুযোগ সৃষ্টি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনিবেটর স্থাপনের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলে এই অভিযাত্রকে টেকসই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, স্মার্ট বাংলাদেশ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদের তত্ত্বাবধানে স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য ইন্ডাস্ট্রি, গভর্নমেন্ট এবং একাডেমিয়ার কোলাবরেশন করবো।
এর মাধ্যমেই আগামী ২০৪১ সাল নাগাদ সফটওয়্যার ও আইটি, আইটিইস খাত থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক আয় হবে বলে জানিয়েছেন জুনাইদ আহমেদ পলক।
শুক্রবার রাতে বেসিস সফট এক্সপো-তে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদ সভার মূলপ্রবন্ধে কীভাবে ডেটা বিশ্লেষণ ও কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়াগুলো কী ভাবে ব্যবহার করছে তা উল্লেখ করে তিনি বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার অলিগলি তুলে ধরেন। জানান, ৯৯৯ থেকে চলতি সাত বছরে ৫ কোটি সেবা দেয়া হয়েছে। ৩৩৩ থেকে সেবা পেয়েছেন সাড়ে ৭ কোটি নাগরিক। সরকারের ৫২ হাজার ওয়েবসাইটের প্রতিটির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন বেসিস উদ্যোক্তারা। ডিজিটাল সুরক্ষা কার্যক্রম গ্রহণে বিশ্বে ৩২তম অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। আশাকরা হচ্ছে, ২০২৫ সালে ই-কমার্স খাতে প্রবৃদ্ধি বেড়ে দাঁড়াবে ৮০ শতাংশ। ডিজিটাল ফাইন্যান্সে ৫০০ শতাংশ এবং ডিজিটাল ডিভাইসে ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হবে।
রাজধানীর পূর্বাচলে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী প্রদর্শনী কেন্দ্রে ‘ফ্রম ডিজিটাল বাংলাদেশ টুওয়ার্ডস স্মার্ট বালাদেশ’ শীর্ষক এই সভায় হাইটেকপার্ক, সফটওয়্যার পার্ক এবং আইটি ট্রেনিং ইনকিউবেশন সেন্টারের মধ্যে পার্থক্যগুলো তুলে ধরেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আমরা ৫৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে রোবটিক্স, এআই, মেশিন লার্নিং, মাইক্রোচিপ ডিজাইনিং, ভিএলস এসআই ও সাইবার সুরক্ষা নিয়ে ল্যাব স্থাপন করবো। ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সেন্টার ফর ফোর আইআর স্থাপন করবো। ৪১ সাল নাগাদ আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়ে তুলবো।
প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশে আমরা পরিণত হয়েছি। বৈশ্বিক পেক্ষাপটে ১০ শতাংশ সফল হলেও আমরা যেসব স্টার্টআপ কোম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ করেছি তাদের সফলতার হার ৩০ শতাংশের ওপর। বিশ্বের বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের সর্বোত্তম জায়গা হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিচ্ছে। ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশে পরিণত হতে চাই। তখন আমাদের মাথাপিছু আয় ১২ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
পলক বলেন, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, একটি টাইম ফ্রেম, অ্যাকশন প্ল্যান ও জব ডিস্ট্রিবিউশন–এই চারটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে উঠেছে। ২০০৮ সালের আগে দেশে ডিজিটাল সেন্টার বলে কিছু ছিল না। ইন্টারনেটের দাম এখন খুবই কম। যার ফলে এখন সারা দেশে ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে মানুষ সেবা পাচ্ছে। দুই হাজারের বেশি সেবা ও সরকারের প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যক্রম এখন অনলাইনের মাধ্যমে চলছে।
অনুষ্ঠানে বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন তুলে ধরেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী, যেখানে বলা হয়েছে- ইন্টারনেট ও তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনৈতিক উন্নতি পৃথিবীর অন্য যেকোন দেশের তুলনায় অতুলনীয়। বেসিস সভাপতি রাসেল টি আহমেদের সভাপতিত্বে সভায় মূলপ্রবন্ধের ওপর আলোচনা করেন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু।
আলোচনায় অংশ নিয়ে কৃষিমন্ত্রী বলেন, একসময় জিডিপি’র প্রায় ৬০ শতাংশ অবদান ছিলো কৃষি খাতের। এখন এটা ১৩ ভাগে নেমে এসেছে। অবশ্য গত ১৩ বছরে আর্থিক হিসেবে মোট জিডিপি বেড়েছে ৮ গুণ, যা বিশ্বে রেকর্ড। তবে এখন আমরা খাদ্যে অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ। কৃষিকে এখন আমরা আধুনিক কৃষিতে রূপান্তর করে আয় বৃদ্ধি করতে চাই। কৃষির বাণিজ্যিকী করণে স্মার্ট এগ্রিকালচার করতে হবে। এখানে আইসিটির ব্যবহার করতে হবে। ইতিমধ্যেই আমরা বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। আইসিটি বিভাগ আমাদের সহায়তা করছে। আমরা অচিরেই একটা কৃষি স্মার্ট কার্ড করতে যাচ্ছি। এর মাধ্যমে জমি ও আবহাওয়া অনুযায়ী কৃষকরা তাৎক্ষণিক সেবা পাবেন।
কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এখন ফল পাড়তে জাপানে রোবট ব্যবহৃত হচ্ছে। ড্রোনের ব্যবহার হচ্ছে। আমরা কৃষিটাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে স্মার্ট কৃষিতে রূপান্তরিত করতে চাই। বীজ বোনা থেকে মার্কেটিং তথা ভোক্তার কাছে নিয়ে যেতে প্রতিটি ধাপে ডিজিটালাইজেশনের দরকার হবে। সেটাকেই আমরা বলছি স্মার্ট এগ্রিকালচারার। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও এর মাধ্যমে সম্ভব হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, গ্রাহকদের স্বাচ্ছন্দ্য দিতে মন্ত্রণালয় আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। প্রযুক্তিই গ্রাহকদের সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ দিয়ে স্বস্তি নিশ্চিত করবে।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, গ্রাহকদের স্বস্তির জন্য স্মার্ট গ্রিড, অ্যাডভানস্ড মিটারিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার (এএমআই) সিস্টেমসহ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগে বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, প্রযুক্তি খুব দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের তাল মিলিয়ে চলতে হবে। সম্মিলিত ও সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে বাংলাদেশ অতিদ্রুত স্মার্ট বাংলাদেশে পরিণত হবে।
সঞ্চালক হিসেবে বেসিস সভাপতি রাসেল টি আহমেদ এসময় বলেন, করোনা পরবর্তী সময়ে যখন আমরা আর্থ-সামাজিক ব্যবসায়িক প্রতীকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন আমরা পরিপূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগে এতো বড় পরিসরে এই আয়োজনটা করেছি। এর পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলো দেশপ্রেম। স্মার্ট বাংলাদেশ ঘোষণার পাশে থাকার দায়বদ্ধতা থেকে আমরা এখানে আমাদের শিল্পের সক্ষমতা দেখানোর পাশাপাশি সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরছি। নতুন প্রজন্ম যেনো বুঝতে পারে; তারাও অংশ নিতে পারে সেই চেষ্টাটাই করেছি।
এ সময় প্যানেল আলোচনায় মন্ত্রীদের প্রত্যেক মন্ত্রণালয় থেকে স্থানীয় সফটওয়্যার দিয়ে সমাধান দেয়ার জন্য নির্দিষ্ট বাজেট ছাড়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত বিষয়ে প্রশ্ন রাখেন বেসিস সভাপতি। তার প্রশ্নের জবাবে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী বলেন, এমন পরিকল্পনা আমাদের আছে। এটা স্টার্টআপ পলিসিতে। সেটা খসড়া পর্যায়ে রয়েছে।







