ন্যানোটেকের উন্নয়নে বাজেটে সরাসরি বরাদ্দে প্রধানমন্ত্রীকে প্রস্তাব দেবেন প্রতিমন্ত্রী পলক
২০৪১ সাল নাগাদ আইসিটি রফতানির এক পঞ্চমাংশই আসবে চিপ-সেমিকন্ডার থেকে
বাংলাদেশে উল্কা সেমাই, নিউরাল সেমিকন্ডাক্টার, প্রাইম সিলিকন ও ডিএসআই চিপ উৎপাদন ও নকশা করে বছরে ৫ মিলিয়ন ডলার আয় করছে। কিন্তু এখনো দেশে চিপ ফ্রেব্রিকেশনের কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। চিপ অ্যাসেম্বিলিং, টেস্টিং এবং প্যাকেজিং এরও কোনো সুযোগ এখানে নেই। এমন পরিস্থিতিতে ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট ও সেমি কন্ডাক্টর নীতিমালা প্রণয়ের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে আইসিটি খাত থেকে প্রাক্কলিত আয় ৫০ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার অর্জন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার। অর্থাৎ আইসিটি রপ্তানির এক পঞ্চমাংশই আসবে চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনিং ও ফেব্রিকেশন থেকে।
সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ‘স্বপ্ন আর কল্পনায় ডুবে না গিয়ে’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আইসিটি উপদেষ্টা জয় ভাইয়ের দেয়া বেধে দেয়া করণীয় অনুযায়ী দেশে এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত ইলকট্রনিক্স পণ্য উৎপাদন শিল্পের ভ্যালু চেইন আরো শক্তিশালী করা হবে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। এজন্য হাইএন্ডের সফিসটিকেটেড টেকনোলজিতে সরকার মনোযোগী হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেছেন, দেশে চিফ ডিজাইনিং ক্যাপাসিটি বিল্ডিং এর জন্য আমরা এনহেন্সিং গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইকোনোমি প্রকল্পের অধীনে ১ লাখ তরুণ-তরুণীকে গড়ে তোলা হবে। এর মধ্যে দেশের চারটি কোম্পানিতে কর্মরত দেড় হাজার প্রকৌশলীদের মতো আরো ৫০ হাজার সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনে পুল অফ ট্যালেন্ট তৈরি করা হবে। এটা করতে পারলে পুরো বাংলাদেশ বাংলাদেশ মুখী হবে।
এছাড়াও হায়ারঅ্যান্ড ট্রেনিং প্রকল্পের অধীনে মাইক্রোটিপ ডিজাইনিং, এই এক্সপার্ট, মেশিন লার্নিং, ডেটা এনালিটিক্স ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ে প্রধান্য দেয়া হচ্ছে। বুয়েট, ঢাবি সহ ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ট্রেনিং দেয়া হবে। একইসঙ্গে চিপ ডিজাইনিং নিয়ে কর্মরত ৪টি স্টার্টআপকে ইনসেন্টিভ, পালিসি সাপোর্ট ও ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট দেয়া হবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
পাশাপাশি সেমি কন্ডাক্টর খাতে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করতে সরকারের পক্ষ থেকেও বিনিয়োগ সহায়তা এবং স্টার্টআপ, গবেষণা ও উন্নয়নে সরকার আরো মনোযোগ দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেছেন, সেমি কন্ডাক্টর কোম্পানিতে কেউ যদি বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায় তবে সরকারও ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এজন্য ম্যাচিং ফান্ড সৃষ্টিতে বাজেটে সরাসরি বরাদ্দ রাখাতে আমি মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব দিবো। এছাড়াও এখনই স্টার্টআপ কোম্পানি লিমিটেড থেকে প্রতি রাউন্ডে এক মিলিয়ন ডলার ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট করতে পারবো।
বুধবার মতিঝিলের ডিসিসিআই অডিটরিয়ামে বাংলাদেশে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক।
মন্ত্রী বলেন, আমাদের সাহসী ও মেধাবী উদ্যোক্তা দরকার। আমরা যদি এখন থেকে শুরু না করতে পারি তবে আরও পিছিয়ে যাবো। বিগত ১৫ বছরে টেকনোলজি-বেসড ইকোসিস্টেমের ভিত্তি আমরা দাঁড় করাতে পেরেছি। ২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশে আমাদের লক্ষ্য তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় করা। সেখানে আগামী ১৭ বছরে সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি থেকে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারি।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বুয়েটের অধ্যাপক ড. এ এস এম এ হাসিব। তিনি জানান, মোবাইল থেকে মিসাইল কিংবা মাইক্রোওয়েভ সব কিছুতেই ব্যহৃত হয় চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর। শুধু স্মার্টফোনের মাধ্যমেই আমরা প্রতিদিন ১৫০টি আইসি পকেটেনিয়ে ঘুরি। বিশ্বে ২০২০ সালে উৎপাদিত হয়েছে ৯২৩ বিলিয়ন চিপস। অর্থাৎ প্রত্যেক ব্যক্তি ১১৬টির অধিক চিপ ব্যবহার করেন। ফলে সাধারণ মানুষও এখন সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এই বাজারের আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। চিপকে এখন মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে তুলনা করা হয়। চিপ সরাসরি ব্যবহার করা যায় না। এটা আমাদের প্যাকেজ করতে হয়। অ্যাসেম্বিলিং, টেস্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং তাথা এটিপি নিয়ে এই প্যাকেজিং ইকো সিস্টেম আবর্তিত। তাই এখানে নিয়মিত গবেষণা ও উন্নয়ন ঘটাতে হয়। ইতিমধ্যেই এই খাতে ৩ মিলিমিটারের ন্যানো চিপ ডিজাইনে টিএসএমসি, এসএমআইসি; চিপ ফেব্রিকেশনে স্যামসাং,ইন্টেল কাজ করছে। সবগুলো কাজই করে আইডিএম। এই খাতে ফ্রেব্রিকেশন সেবচেয়ে বড় ভ্যালু যোগ করে। এই শিল্পের রসদ ওয়েফার সরবরাহ করে জাপান। এটি সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি করা হয়। সেখানে ওরিডন এগুলো চিপ উৎপাদন করে। এরপর এটি পাঠানো হয় মালোয়েশিয়ায়। সেখানে প্যাকেজ করে। এরপর এই শিল্পটি এশিয়ার দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, মালোয়েশিয়া ও চীন যুক্ত হয়। এরই মধ্যে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ভালো করছে। এশিয়ার দেশগুলোর সরকারগুলো এখন এ বিষয়ে বেশ সাপোর্টিভ। বাংলাদেশকে এই বাজারে এগিয়ে যেতে স্প্রিন্ট নয় ম্যারাথন দৌড় দিতে হবে। সেজন্য ইলেকট্রনিক প্যাকেজিংয়ে গবেষণা, উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের মতো গ্র্যান্ট, ইক্যুইটি ইনভেস্টমেন্ট, ঋণ সুবিধা, যন্ত্রাংশ আমদানি সহযোগিতা ও কারখানার জন্য বিনামূল্যে জায়গা দেয়া যেতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, উৎপাদনে প্রযুক্তি ভিত্তিক উদ্ভাবন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো সম্ভব হবে না। এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে সেমিকন্ডাক্টর। সেমিকন্ডাক্টর মানেই চিপ নয়। এক্ষেত্রে প্রি ও পেস্ট ফেব্রিকেশন ও প্যাকেজিংয়ে বিশাল ভ্যালু চেইন রয়েছে। সরকারি নীতি ও অর্থ সহায়তা ছাড়া বেসরকারি খাতকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।
ডিসিসিআই সভাপতি আশরাফ আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিএসএম জাফর উল্লাহ। সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বন্ডস্টেইন টেকনোলজি’র এমডি মীর শাহরুখ ইসলাম, টিটন প্রাইভেট লিমিটেডের ভিপি রাজীব হাসান, ওয়ালটন ডিজিটেক ইন্ডাস্ট্রির এএমডি লিয়াকত আলী এবং যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিং এর ভিজিটিং প্রফেসর এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ।







