ড. মুশতাক ইবনে আয়ূব
ঢাকা শহরকে তারের জটমুক্ত করার নামে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সংযোগ কাটার অভিযান চলছে বিভিন্ন জায়গায়। নিশ্চিত নই এর জন্য কোন আগাম নোটিশ বা কোন সতর্কতা জারি করা হয়েছিলো কি-না। এটা আশা করিও না বাংলাদেশে। যেখানে রাস্তার শেষ মাথায় গিয়ে দেখতে হয় 'রাস্তা বন্ধ', সেখানে ইন্টারনেটের তার কাটার জন্য আগেভাগে নোটিশ পাবার আশাটা দুরাশা মাত্র। এরকম ঘটনা এটাই প্রথম নয়। বাংলাদেশে হঠাৎ হঠাৎ একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার না থাকে কোন পূর্বপ্রস্তুতি, না জনসংশ্লিষ্টতা। ফলে কিছু মানুষের ভোগান্তিই সার হয়, সমস্যার কোন সমাধান হয় না। বিকল্প সমাধান না দিয়ে বিদ্যমান কোন সুবিধা কেড়ে নেওয়াটা কেবল অপ্রত্যাশিতই নয়, অন্যায়ও বটে।
শহরের তারের জটলা দেখতে ভালো লাগে না- এটা নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু বর্তমান সময়টা মোটেই ইন্টারনেটের ওপর খড়গহস্ত হওয়ার জন্য সঠিক নয়। দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। লাখ লাখ শিক্ষার্থী ব্রডব্যান্ড সংযোগের ওপর নির্ভরশীল। অদূর ভবিষ্যতে আরো সংযোগ প্রয়োজন হবে, যেহেতু অনলাইন কেন্দ্রিক কার্যক্রম আরো বাড়বে। দেশের সরকারী-বেসরকারী অনেক প্রতিষ্ঠানও এখন অনলাইন যোগাযোগের ওপর ভিত্তি করে ভার্চুয়াল অফিস করছে। এমন অবস্থায় হঠাৎ করে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং নতুন সংযোগ না দেওয়াটা ভয়াবহ বিপর্যয় বলেই মনে করি। বর্তমান সময়ে এই কার্যক্রম আমাদের শিক্ষা ও ব্যবসায়িক অগ্রগতির পথে এক অবান্তর অন্তরায়।
আমাদের ইন্টারনেটের অবস্থা যে কখনোই খুব ভালো ছিলো এটা বলা যাবে না; তার কারণ- প্রথমত. এর ধীরগতি এবং দ্বিতীয়ত এর উচ্চদাম। অনেকেরই জানা থাকার কথা- দক্ষিণ এশিয়ার ভেতরে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ইন্টারনেটের মূল্য বেশি। তারপরও এই সীমাবদ্ধ সুবিধাকে ব্যববহার করে মানুষ কোন মতে কাজ চালিয়ে নিচ্ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করে ইন্টারনেট সংযোগ হারিয়ে অবস্থা আরো শোচনীয় দিকে চলে গেলো। অনেক পরিবার এবং প্রতিষ্ঠান সংযোগ হারিয়েছে, নতুন সংযোগ চাইলেও পাওয়া যাচ্ছে না এবং বেশিরভাগ সংযোগ প্রচণ্ড ধীরগতির হয়ে পড়েছে।
এটি কল্পনা করতেও অবিশ্বাস্য লাগে যে, একটি দেশে হঠাৎ করে কোন ঘোষণা ছাড়াই অর্ধলক্ষ মানুষের ইন্টারনেট বা টিভি সংযোগ কেটে দেওয়া হবে। গ্রাহকদের তো জানার কথা নয় কোন সরবরাহকারী বৈধ, কে অবৈধ; কারা খুঁটির ওপর আর কারা মাটির নিচে তার নিয়ে এসেছে। এসব সরবরাহকারীদের চেনে প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আগে এই সরবরাহকারীদের সাথে সম্পর্ক ঠিক করতে হবে এবং সেটা সংযোগ দেওয়ার আগে। যারা সংযোগ পেয়েছেন, তাদেরকে বিপদে ফেলে, কোন রকম বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি না করে এ ধরনের অভিযান গর্হিত কাজ।
গত দশ বছরে দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গ্রাহক বেড়েছে বিপুল সংখ্যায়। এক তথ্যমতে, ২০০৯ সালে দেশে মাত্র ৫০,০০০ ব্রডব্যান্ড সংযোগ ছিলো। সেই সংখ্যা ২০১৬ সালে এসে দাড়ায় ত্রিশ লাখের ওপরে। আর বিটিআরসি'র তথ্যমতে, ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ৫০ লক্ষ ছাড়িয়েছে। এতে প্রমাণ হয় দেশে ইন্টারনেটের চাহিদা এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা উভয়েই বেড়েছে। ২০১৯ সালের এপ্রিল নাগাদ দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৯ কোটি। এর বেশিরভাগই ব্যাক্তি পর্যায়ে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে। তবে বিশেষত. বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সরকারী-বেসরকারী সংস্থা এবং পরিবার পর্যায়ে মানুষ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। এই বিপুল চাহিদা মেটাতে গিয়েই বড় বড় শহরের ইন্টারনেট সংযোগ-তারের এক অবিশ্বাস্য জট তৈরি হয়েছে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট যারা সরবরাহ করেন তাদের ভেতরেও সমন্বনয়হীনতা রয়েছে। তাদের বৈধতার প্রশ্ন আছে। এগুলো 'সিস্টেমিক প্রবলেম' বা পদ্ধতিগত সমস্যা। এসব সসম্যার সমাধান না করে, তার কেটে জনদুর্ভোগ তৈরি করাটা অত্যন্ত আনাড়ি এবং অযাচিত কাজ। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-কে এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। ইন্টারনেট, কেবল টিভি সংযোগ কাটার কাজ যদি ঢাকার রাস্তা কাটকাটির মতো একই রকম অপরিকল্পিতভাবে হয়, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের অবিমৃষ্যকারিতা মাটি থেকে আকাশ পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে।
শুধু তার কেটেই ঢাকা শহরকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করা যাবে না। ইন্টারনেটের তার কাটার আগে আরো অনেক কাজ বাকি আছে। সেসব দিকে নজর না দিয়ে এই বিপন্ন সময়ে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে কর্তৃপক্ষ গর্হিত কাজ করেছে। বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে সেটা আগে ঠিক করে তবেই এরকম উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তার আগে কোন মতেই নয়।
দেশের শিক্ষার্থী ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে এই অভিযান এখন বন্ধ হোক। একই সাথে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় পর্যায়ক্রমে তার-জট ও অবৈধ সংযোগ সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হোক।
লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল
[email protected]