কর্মস্থলে সমঅধিকারের দাবিতে এক নির্ভীক কন্ঠস্বর মুশাররাত মাহেরা
ব্রাসেলসের আকাশ তখন আন্তর্জাতিক আলোচনার উত্তাপে মুখর। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে ২০২৫ সালে আর্টিকেল নাইনটিন, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা এবং ইউরোপীয় জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ সভায় যখন সারা বিশ্বের নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হলো, তখন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন মুশাররাত মাহেরা। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অ্যাডভোকেসি সংস্থা ‘ভয়েস’ (VOICE)-এর […] The post কর্মস্থলে সমঅধিকারের দাবিতে এক নির্ভীক কন্ঠস্বর মুশাররাত মাহেরা fi

ব্রাসেলসের আকাশ তখন আন্তর্জাতিক আলোচনার উত্তাপে মুখর। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে ২০২৫ সালে আর্টিকেল নাইনটিন, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা এবং ইউরোপীয় জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ সভায় যখন সারা বিশ্বের নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হলো, তখন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন মুশাররাত মাহেরা। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অ্যাডভোকেসি সংস্থা ‘ভয়েস’ (VOICE)-এর উপ-পরিচালক হিসেবে তিনি কেবল তার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করেননি, বরং দেশের অসংখ্য নারী সাংবাদিকের প্রতিদিনের সংগ্রামের কথা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করেছেন।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে পদ্ধতিগত বৈষম্য এবং নারী সাংবাদিকদের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব নিয়ে মুশাররাত মাহেরা যে রূঢ় সত্যগুলো উচ্চারণ করেছেন, তা কেবল একটি দেশের নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকতা জগতের এক করুণ চিত্র।
সংবাদপত্রের মালিকপক্ষ ও মুনাফার সংস্কৃতি
আলোচনার শুরুতেই মুশাররাত মাহেরা মিডিয়া মালিকদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলোর ভেতরের পরিবেশ নিয়ে বলেন ‘আমাদের দেশে মিডিয়া মালিকদের মূল লক্ষ্য থাকে মুনাফা অর্জন। তাদের এই লাভের হিসাবের ভিড়ে নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষার বিষয়টি অগ্রাধিকার তালিকার একেবারে শেষে থাকে। আমরা দেখি, নিউজরুমে নারীরা প্রতিনিয়ত পদ্ধতিগত বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রে হয়রানি থেকে শুরু করে শিশু যত্ন কেন্দ্রের (Childcare) অভাব, এমন বহু সমস্যা নারী সাংবাদিকরা নিয়মিত উত্থাপন করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, সংবাদপত্রের মালিক পক্ষ এবং নীতি-নির্ধারক উভয় গোষ্ঠীই এই সমস্যাগুলোকে ক্রমাগত উপেক্ষা করে যান এবং বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন না।’
হয়রানির বিরুদ্ধে কথা বলার ঝুঁকি
নিউজরুমে নারীদের চাকরির অনিশ্চয়তা এবং মুখ খোলার পরিণাম নিয়ে মুশাররাত অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘চাকরির নিরাপত্তা আসলে কোথায়? যখন একজন নারী কর্মক্ষেত্রে হয়রানির বিরুদ্ধে কথা বলেন, তখন তাকে অনায়াসেই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। আমাদের দেশে এমন অনেক উদাহরণ আছে যেখানে সাহসের সাথে প্রতিবাদ করার কারণেই নারীদের পেশাগত জীবন ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। যদি নিউজরুমে কথা বলার স্বাধীনতা বা প্রতিবাদের সুযোগই না থাকে, তবে আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কীভাবে বড় বড় কথা বলব?’
সাভারের জুলাই বিপ্লব ও পরিবর্তনের সম্ভাবনা
গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন মুশাররাত মাহেরা। পরিবর্তনের এই হাওয়াকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘গত বছরের জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তার মানোন্নয়নের একটি জানালা খুলে গেছে। সুশীল সমাজ বর্তমানে ‘মিডিয়া রিফর্ম কমিশন’ বা গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করছে। আমরা এমন নতুন ব্যবস্থার দাবি জানাচ্ছি যা নারী সাংবাদিকদের সুরক্ষা এবং সহায়তার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ফাঁকগুলো পূরণ করবে। আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে ঠিকই, কিন্তু আমরা হাল ছাড়ছি না। আমরা কাজ করে যাচ্ছি যাতে নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা ইস্যুটি সবসময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে।’
যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে মুক্তি
মুশাররাত মাহেরা বিশ্বাস করেন, সাংবাদিকদের নিজেদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সংস্কার টেকসই হবে না। তিনি তার বক্তব্যের শেষে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন,’আমরা বর্তমানে যে সংস্কারের কথা বলছি, তা কেবল উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো নিয়ম নয়। এটি হতে হবে সাংবাদিকদের নিজেদের চিন্তা ও অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরি একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। আমরা এমন একটি সাংবাদিকতা পরিবেশ গড়তে চাই যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই সম্মানের সাথে কাজ করতে পারবেন। আমরা মনে করি, নারী সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল মুক্ত গণমাধ্যমের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। আমরা আমাদের এই লড়াই চালিয়ে যাবো যতক্ষণ না প্রতিটি নিউজ রুম নিরাপদ হচ্ছে।’
ব্রাসেলসের সেই সভায় মুশাররাত মাহেরার প্রতিটি শব্দ যেন ছিল বাংলাদেশের অবহেলিত নারী সাংবাদিকদের প্রতিনিধি। তার এই সাহসী উচ্চারণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল সংবাদ পরিবেশনই সাংবাদিকতা নয়, বরং সংবাদ তৈরি করার পরিবেশটি কতটুকু মানবিক ও নিরাপদ, সেটিই আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
The post কর্মস্থলে সমঅধিকারের দাবিতে এক নির্ভীক কন্ঠস্বর মুশাররাত মাহেরা first appeared on সারাবাংলা: লেটেস্ট বাংলা খবর | ব্রেকিং নিউজ | Sarabangla.net.







