ঢাকায় জেনেসিস এআই কনফারেন্সের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলো মিলিয়ন এক্স বাংলাদেশ

ঢাকায় জেনেসিস এআই কনফারেন্সের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলো মিলিয়ন এক্স বাংলাদেশ
১৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১৭:০৫  

বাংলাদেশ কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দৌড়ে পিছিয়ে পড়বে, নাকি একে ব্যবহার করে নিজেদের উৎপাদনশীলতা ১০ গুণ বাড়িয়ে নেবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এবং দেশের ১০ লক্ষ নাগরিককে ‘এআই-নেটিভ’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করলো মিলিয়ন এক্স বাংলাদেশ।

এই উপলক্ষে ১৬ জানুয়ারি, শুক্রবার রাজধানীর ড্যাফোডিল প্লাজায় ন্যাশনাল এআই বিল্ড এ থন ও ১৭ জানুয়ারি, শনিবার রাজধানীর ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক (ইউএপি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো ‘জেনেসিস এআই কনফারেন্স ২০২৬’। ‘মিলিয়নএক্স বাংলাদেশ’আয়োজিত এই সম্মেলনে দেশের শীর্ষ নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ এবং গ্লোবাল টেক লিডাররা এক প্ল্যাটফর্মে বসে বাংলাদেশের এআই ভবিষ্যতের রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা করেন।

সমাপনীতের দিনের আলোচনার সারমর্ম তুলে ধরে ‘বাংলাদেশ এআই অ্যাকশন চার্টার’-এর খসড়া প্রনয়নের প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করেন মিলিয়ন এক্স বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কাউন্সিল মেম্বার ড. জুনায়েদ কাজী সারা।

প্রতিজ্ঞায় আগামী ৩০ দিনের মধ্যে এআই নীতিমালা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং শিক্ষা খাতের রূপরেখা সংবলিত ‘এআই অ্যাকশন চার্টার-এর খসড়া প্রণয়নের প্রতিজ্ঞা করা হয়। এছাড়াও ৬০ দিনের মধ্যে প্রণীত এই চার্টারের আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করা এবং ৯০ দিনের মধ্যে এআই প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ দেখানোর জন্য সুনির্দিষ্ট প্রজেক্ট বা প্রকল্পসমূহ সম্পন্ন করা হবে বলে জানানো হয়। একইসঙ্গে আগামী ১ বছরের মধ্যে সফল প্রকল্পগুলোকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া এবং বড় পরিসরে এর সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে বলে জানান কাজী সারা। তিনি বলেন, এআই নিয়ে পরবর্তী ধাপে পৌঁছাতে হলে আমাদের নীতিনির্ধারক, ইন্ডাস্ট্রি এবং একাডেমিয়ার মধ্যে অভূতপূর্ব সমন্বয় দরকার।”

দিনব্যাপী এই সম্মেলনে মিলিয়ন এক্স বাংলাদেশের ফাউন্ডিং কাউন্সিল মেম্বার আনিস রহমান, মোহাম্মদ মাহাদী-উজ-জামান, মুনির হাসান এবং এম মঞ্জুর মাহমুদের বিশেষ উপস্থিতিতে একটি সম্মিলিত অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে পর্দা নামে ‘জেনেসিস এআই কনফারেন্স ২০২৬’-এর।

উদ্বোধনী অধিবেশন: লক্ষ্য যখন '১০এক্স' মাইন্ডসেট

সকালে কনফারেন্সের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল হাসিব চৌধুরী। তিনি বলেন, “আমাদের জাতীয় উন্নয়নের বড় বাধাগুলো কাটাতে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনই প্রধান শক্তি। আমাদের প্রডাক্টিভিটি বাড়াতে টেকনলজির ব্যহার বাড়াতে হবে বিশেষ করে আমাদের কৃষি ক্ষেত্রে এআই-এর ব্যবহার বাড়াতে হবে”ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান তাঁর বক্তব্যে এআই-কে মানুষের প্রতিস্থাপন নয়, বরং একটি ‘সাপোর্টিং টুল’হিসেবে বর্ণনা করে শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়নের ওপর জোর দেন।

সেশনটি সঞ্চালনা করেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা মিলিয়ন এক্স বাংলাদেশের ফাউন্ডিং কাউন্সিল মেম্বার প্রযুক্তিবিদ আনিস রহমান। তিনি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রবাসীদের অভিজ্ঞতা ও দেশীয় তরুণদের মেধার সমন্বয়ে একটি টেকসই ইকোসিস্টেম গড়ার গুরুত্ব তুলে ধরেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ড. ইউনূস শাহ তরুণদের জ্ঞানভিত্তিক ‘১০এক্স মাইন্ডসেট’ তৈরির পরামর্শ দেন।

অধিবেশন ১: জ্ঞানভিত্তিক ভবিষ্যত তৈরির সন্ধানে

‘বাংলাদেশের এআই বর্তমান অবস্থা’ শীর্ষক প্রথম সেশনে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারি (অব.) বলেন, “অন্তর্ভুক্তিই রাজস্ব বাড়ায়। উচ্চমাত্রার কানেক্টিভিটি ডিজিটাল অবকাঠামোর প্রাণ।” প্রভা হেলথের প্রতিষ্ঠাতা সিলভানা কাদের সিনহা বলেন, “এআই-এর লক্ষ্য শুধু অটোমেশন হওয়া উচিত নয়, এর লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনে সর্বোচ্চ প্রভাব ফেলা।” বুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিয়া শাহনাজ গবেষণার ওপর গুরুত্ব দেন এবং ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির চ্যান্সেলর আবু বকর হানিপ বলেন, শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি দিয়ে আজকের চাকরির বাজার জয় সম্ভব নয়, এ জন্য দরকার দক্ষতা-ভিত্তিক ছোট ছোট সংক্ষিপ্ত প্রোগ্রাম।

অধিবেশন ২: সমাজ ও অর্থনীতিতে এআই-এর প্রভাব

দ্বিতীয় অধিবেশনে মিলিয়ন এক্স বাংলাদেশের ফাউন্ডিং কাউন্সিল মেম্বার ও সাইবেজ সফটওয়্যারের ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মাহাদী-উজ-জামান বলেন, “এআই ক্ষমতা দিতে পারে, কিন্তু নিজেকে পরিবর্তনের দায়িত্ব ব্যক্তির নিজের। কোনো দেশই শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে উন্নতি করতে পারেনি।”স্কয়ার টয়লেট্রিজের সিইও মালিক মোহাম্মদ সাঈদ ইন্ডাস্ট্রি পার্সপেক্টিভ থেকে বলেন, “এআই ব্র্যান্ড ম্যানেজারের ঘণ্টার কাজ সেকেন্ডে করলেও মানুষের বিচারবুদ্ধি প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। মনে রাখবেন, এআই ব্যবহার করা মানুষই এখন থেকে এআই ব্যাবহার না করা মানুষকে প্রতিস্থাপন করবে।”ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক খন্দকার এ মামুন বলেন, “এআই একটি বিশাল ইকুয়ালাইজার; এটি গ্রামের শিক্ষার্থীকেও শহরের সমান সুযোগ এনে দিতে পারে।” এই সেশনে আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা এআই ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ ওলি আহাদ এবং লিঙ্ক-থ্রি টেকনোলজিসের সিটিও রাকিবুল হাসান।

অধিবেশন ৩: এআই ট্যালেন্ট ও ইকোসিস্টেম তৈরি

বিকালে দক্ষ জনশক্তি তৈরি নিয়ে আয়োজিত ডেটাসফটের প্রেসিডেন্ট এম মঞ্জুর মাহমুদ আলোচনা করেন। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. সাদিয়া হামিদ কাজী একটি ‘প্রবলেম-ফার্স্ট’ অ্যাপ্রোচের কথা বলে বলেন, “আমি চাই ইন্ডাস্ট্রি সরাসরি সমস্যার তালিকা নিয়ে আমাদের কাছে আসুক, যাতে শিক্ষার্থীরা সেই সমস্যা সমাধানে অভ্যস্ত হতে পারে।”ইন্ডিপেনডেন্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, “এআই শুধু সিএসই শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, সবার জন্য। নিজস্ব মৌলিক আইডিয়া না থাকলে চ্যাট-জিপিটিও আপনাকে নতুন কিছু দিতে পারবে না।”

অধিবেশন ৪: লিডারশিপ পার্সপেক্টিভ ও এআই অ্যাকশন চার্টার

সম্মেলনের শেষ ভাগে প্যানেল সেশনে ভিডিও বক্তব্য দেন ব্র্যাক-এর নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, এসিআই গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আরিফ দৌলা এবং ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক জাফর সোবহান। তারা বাংলাদেশের এআই ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। ড. আরিফ দৌলা বলেন, “বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এআই (AI) এক অনন্য আশীর্বাদ। এর মাধ্যমে আমরা এমন সব অসাধ্য সাধন করতে পারি, যা আগে কল্পনাও করা যেত না। স্বাস্থ্য ও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ছোট ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল এবং ‘এজ কম্পিউটিং’ব্যবহার করে আমরা সাধারণ মানুষের জীবনমানের সিদ্ধান্তগুলোকে আরও নির্ভুল করতে পারি।”

আয়োজনে সহায়তা করছে, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটির ডিপার্টমেন্ট ওফ ইনোভেশন অ্যান্ড অন্ট্রপ্রেনরশিপ, বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) ও বিলিয়ন্স ফর বাংলাদেশ। এছাড়া কারিগরী সহায়তা প্রদান করছে আমাজন ওয়েব সার্ভিসেস,  ক্যারিয়ার ক্যানভাস, ও ভার্সেল ভিজিরো। 

ডিবিটেক/এমএম/ আইএইচ