৭০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে হাজার কোটি টাকা আয় বঞ্চিত বিটিআরসি
দেশে ৭০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডের মোট ৪৫ মেগাহার্জ তরঙ্গ রয়েছে। এক যুগ ধরে অব্যবহৃত এই তরঙ্গের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও তা বরাদ্দ দিতে পারছে না বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আইনি জটিলতার দীর্ঘ সূত্রিতার জেরে প্রায় ১২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
তথ্যানুসন্ধানে জানাগেছে, বিনামূল্যে পছন্দের তালিকায় থেকে ২০০৭ সালের ২১ মার্চ এই ব্যান্ডে ১২ মেগাহার্জ তরঙ্গ বরাদ্দ পেয়েছিলো অলওয়েজ অন নেটওয়ার্ক নামের একটি আইএসপি। তবে এই নেটওয়ার্কটি ‘তরঙ্গ অফ’ রেখেও বর্তমাসে তাদের কাছে থাকা ৫ মগাহার্জ তরঙ্গ ছেড়ে দিতে খোদ নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে দাবি করেছে ৮০০ কোটি টাকা। ২০২০ সালের অক্টোবরে তাদের এই স্পেকট্রাম বাতিলের জন্য বিটিআরসির কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়ে এই অর্থ দাবি করে চিঠি দেয় অলওয়েজ অন নেটওয়ার্ক। উপরন্তু আইনি প্যাঁচে ফেলে তরঙ্গ ছেড়ে দেয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ তরঙ্গ দখলে রেখেছে। বিষয়টি এখন সর্বোচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
দফায় দফায় মামলার তারিখ পিছিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে অভিযুক্ত আইএসপি প্রতিষ্ঠানটি। সূত্রমতে, প্রথমে মামলাটি শুনানির ৩৫ নম্বর তালিকায় থাকলেও ২৯ নম্বরেরে পর আর এগোয়নি । এরপর অজ্ঞাত কারণে মামলার শুনানি তালিকা থেকে ১০ ধাপ পেছনে চলে যায়। পেছাতে পেছাতে ক্রমেই ৬৫ নম্বর থেকে ১০০ ছাড়িয়ে ২০০তে গিয়ে ঠেকে। এক পর্যায়ে তা তালিকা থেকেই বাদ পড়ে। চলতি বছরের এপ্রিলের দিকেও তালিকা এক হতে ৪০-এর মধ্যে ওঠানামা করে মামলার তালিকা ক্রম। কিন্ত শুনানি হয়নি আজও।
এমন পরিস্থিতিতে গত ১৬ মার্চ বিটিআরসি’র তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোঃ আবু বকর ছিদ্দিক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব, সুপ্রিম কোর্টে অ্যাটর্নি জেনারেল, আইন ও বিচার বিভাগের সচিব ও টেলিকম সচিবকে সবিস্তারে লিখিত জানিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত সপ্তাহে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এবং অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার অনীক আর হকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী।
তবে চলতি সপ্তাহে এই সমস্যার সমাধান হবে কি না তা নিয়ে সংশয় কাটেনি এখনও। এমন বিরলতর ঘটনা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন টেলকম খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রাপ্ত তথ্য মতে, অলওয়েজন অন নেটওয়ার্ককে যখন বিটিআরসি তরঙ্গ বরাদ্দ দিয়েছিলো তখন এই তরঙ্গ সেলুলার মোবাইল সার্ভিসের জন্য ব্যবহৃত হত না। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) কাছেও এই তরঙ্গ বরাদ্দের কোনো প্লান ছিলো না। তাদেরকে ফেডারেল কমিউনিকেশন কমিশন প্রণীত প্লানে তরঙ্গ বরাদ্দ দেয়া হলেও এটি আইটিইউ স্বীকৃত ছিলো না। ফলে আইটিইউ এর রেডিও রেগুলেশন বিধান অনুযায়ী, ১২ (৬+৬) মেগাহার্জের পরিবর্তে ৫ মেগাহার্জ তরঙ্গ বরাদ্দ দেয়া হয়। এরপর রাষ্ট্রীয় স্বার্থে বিটিআরসি ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের ওই স্পেকট্রাম বরাদ্দ বাতিলও করে দেয়। আইএসপি প্রতিষ্ঠানটি স্পেকট্রাম বরাদ্দ বাতিলের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন করে। ২০২৩ সালের ১৯ জানুয়ারি বিটিআরসি ওই মামলায় হেরে যায়। এরপর আপিল করে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।
বিটিআরসি বলছে, ‘বিশ্বের অনেক দেশেই স্পেকট্রাম পুনর্বিন্যাস একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বাংলাদেশেও এর দৃষ্টান্ত রয়েছে- যেমন ২০২০ সালে অনেক আইএসপি থেকে স্পেকট্রাম ফিরিয়ে নিয়ে ৫জি সেবার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।
নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটির শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই আইএসপির কোনো রেডিও নেটওয়ার্ক নেই। কোনো গ্রাহক নেই। ৭০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে আইএসপি সেবার জন্য বিশ্ববাজারে এখন আর কোনো যন্ত্রপাতি পাওয়া যায় না। ২০০৭ সালের নভেম্বরে বিশ্ব রেডিও কমিউনিকেশন কনফারেন্স (ডব্লিউআরসি-২০০৭) এ এই স্পেকট্রাম আইএমটির জন্য নির্ধারণ করা হয় এবং পরে এশিয়া-প্যাসিফিক টেলিকমিউনিটি (এপিটি) ব্যান্ডটির পরিকল্পনা তৈরি করে। বিটিআরসি বলছে, আইএসপিটি আইটিইউ নীতির ভুল ব্যাখ্যা করছে। আইটিইউর নীতিতে বিদ্যমান ব্যবহারকারীর অধিকার অক্ষুণ্ন রাখা বাধ্যতামূলক; কিন্তু এটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় স্পেকট্রাম ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, জাতীয় পর্যায়ের স্পেকট্রাম পুনর্বিন্যাসে নয়।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান অলওয়েজ অন নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের প্রধান ড. রিয়াজ শাহেদ এর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি এই প্রতিবেদকের পরিচয়সহ আইডি কার্ড চেয়ে পাঠান। হোয়াটসঅ্যাপে পরিচয় পত্র পাঠিয়ে ৭০০ মেগাহার্জ ব্যান্ডে বিনামূল্যে প্রাপ্ত ৫ মগাহার্জ তরঙ্গ ছেড়ে দিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে ৮০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ চাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, বিষয়টি বিচারাধীন, বর্তমানে তা কোর্টের এক্তিয়ার ভুক্ত। বিচারাধীন বিষয় নিয়ে আপনার ও আমার, কারুই কোনো মন্তব্য করা সমীচীন নয়।







