২৯ জুলাই ক্লাসে ফিরছে কুয়েট

২৯ জুলাই ক্লাসে ফিরছে কুয়েট
২৭ জুলাই, ২০২৫ ২০:২০  
২৭ জুলাই, ২০২৫ ২২:২১  

ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সংঘর্ষের জেরে  বন্ধ থাকার পর আগামী ২৯ জুলাই (মঙ্গলবার) থেকে ক্লাসে ফিরছে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)। ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ পরিস্থিতির ইতি ঘটিয়ে, দীর্ঘ পাঁচ মাস ১০ দিন বন্ধের পর শুরু হতে যাচ্ছে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পাঠদান কার্যক্রম। 

২৭ জুলাই, রাবিবার দিনভর বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্ত জানান নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদ হেলালী।
বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের এই অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের বলেছেন, “সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ইনশাআল্লাহ মঙ্গলবার থেকেই ক্লাস শুরু হবে। শিক্ষার্থীদের অনুরোধ করব, সোমবারের মধ্যেই আবাসিক হলে ও যার যার আবাসনে ফিরে আসার জন্য।”
একইভাবে কুয়েটের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবদুর রহমান জানান, উপাচার্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডিন, শিক্ষক, হল কমিটি, শিক্ষক সমিতি ও ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দফায় বৈঠক করেন।
 
কুয়েট শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. ফারুক হোসেন বলেন, “ভিসির সঙ্গে সবার ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অংশগ্রহণে ক্লাস চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।”

কবে শুরু হচ্ছে জানতে চাইলে ফারুক হোসেন বলেন, ‘হয়তো কাল (সোমবার) নোটিশ দিয়ে দিতে পারে প্রশাসন। শিক্ষার্থীদের আসার তো সুযোগ দিতে হয়। মঙ্গলবার থেকে ক্লাস শুরু হতে পারে বলে মনে করছি।’

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উপাচার্যের বৈঠকে উপস্থিত কুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ওবায়দুল্লাহ জানিয়েছেন, আগামী মঙ্গলবার থেকে ক্লাস শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছেন স্যার। রবিবার রাতে নোটিশ দেওয়া হবে। পরীক্ষার বিষয়ে বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে কথা বলে তারিখ নির্ধারণ করে নিতে বলেছেন উপাচার্য। তদন্তসহ অন্যান্য প্রক্রিয়াও ক্লাস শুরুর সঙ্গে সমান্তরালভাবে চলবে। শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার বিষয়টি তোলা হলে শিক্ষকেরা আশ্বস্ত করেছেন।

এর আগে  শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানামুখী আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে দুই দফায় উপাচার্য পরিবর্তনের পরও প্রশাসনিক কার্যক্রম চললেও বন্ধ ছিলো পাঠদান কার্যক্রম। ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় সেশনজটের শঙ্কায় রয়েছেন প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুয়েটের যাত্রা শুরু ১৯৬৭ সালে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অনুষদের অধীনে খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি-বিআইটি-খুলনায় রূপান্তর করা হয়।

পরবর্তী সময় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয় ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর। প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ছয় দশকে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমে এত দীর্ঘ সময় অচলাবস্থা আর দেখা যায়নি।
প্রসঙ্গত,  গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররাজনীতি বন্ধকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়; এতে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। ওইদিন রাতে উপাচার্যের বিরুদ্ধে হামলাকারীদের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগসহ পাঁচ দফা দাবি তোলেন শিক্ষার্থীরা।

দাবি না মানায় ১৯ ফেব্রুয়ারি বেলা দেড়টার দিকে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক ভবনগুলোয় তালা ঝুলিয়ে দেন।

এর আগে ১৮ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৪টা থেকে কুয়েট উপাচার্যকে মেডিকেল সেন্টারে অবরুদ্ধ করা হয়। পরদিন বিকাল সোয়া ৫টার দিকে তিনি মুক্ত হন। অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় তিনি ১৯ ফেব্রুয়ারির জরুরি সিন্ডিকেট সভায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে সভাপতিত্ব করেন।

২১ ফেব্রুয়ারি কুয়েটের শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনে তালা ঝুলিয়ে দেয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার দিকে উপাচার্য বাসভবনে প্রবেশ করেন।

এরপর শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে বাসভবন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা এবং শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময় সংঘর্ষের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ঈদুল ফিতরের ছুটির পর ১৪ এপ্রিল সিন্ডিকেট সভায় ৩৭ শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। ৩৭ জনকে বহিষ্কারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ভিসির পদত্যাগ দাবি করে ওইদিন থেকে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায়ে ২১ এপ্রিল থেকে অনশন শুরু করেন ৩২ শিক্ষার্থী।

কুয়েটের সংকট সমাধানে ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) একটি প্রতিনিধি দল এবং শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক সি আর আবরার কুয়েটে যান।

দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা অনশন ভাঙেন। ওইদিন রাতেই কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ মাছুদ এবং উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে অপসারণের প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানায় সরকার।

১ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হযরত আলীকে কুয়েটের অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য পদে নিয়োগ দেয়।

৪ মে থেকে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরুর কথা থাকলেও ক্লাসে যাননি শিক্ষকরা। ১৮ মে থেকে প্রশাসনিক কার্যক্রমও বর্জন করেন তারা। শিক্ষকদের পক্ষ থেকে জানানো হয় শিক্ষকদের লাঞ্ছনায় জড়িতদের শাস্তি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত তারা ক্লাসে ফিরবেন না।

২২ মে অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য অধ্যাপক হযরত আলী পদত্যাগ করেন।

২৩ এপ্রিল কুয়েটে গিয়েছিলেন ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। তিনি বলেন, কুয়েটের সংকট আরো আগেই সমাধান হতে পারত। কুয়েটে দীর্ঘ পাঁচ মাসের অচলাবস্থায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষার্থীরা। সংকট দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার মূল কারণ শিক্ষক সমিতির অবস্থান।

সবশেষ ২৪ জুলাই কুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত) ড. মো. মাকসুদ হেলালী। পরদিন শুক্রবার (২৫ জুলাই) তিনি যোগদান করে কাজ শুরু করেন।