এআই কি জুনিয়র ডেভেলপারদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে?

এআই কি জুনিয়র ডেভেলপারদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে?
রাকিবুল হাসান
১৩ মার্চ, ২০২৬ ১৪:৩৭  
১৪ মার্চ, ২০২৬ ১৫:১৬  

গত বছরের শেষের দিকে এক বন্ধু ফোন করেছিল। কম্পিউটার সায়েন্স শেষ করে একটা স্টার্টআপে জয়েন করেছে তার ছেলে। যেহেতু আমি সারাদিন নতুন প্রজন্মদের নিয়ে লিখি, তাই ধরে নিয়ে এলো আমার অফিসে। গলায় হতাশা। বলল, ভুল সময়ে প্রোগ্রামার হয়েছি মনে হয়। GitHub Copilot আর ChatGPT সব কোড লিখে দিচ্ছে। আমি শুধু কপি-পেস্ট করছি। সিনিয়াররা বলছে, আমরা জুনিয়ররা আর কোডিং শিখতে পারবো না, শুধু AI এর উপর নির্ভরশীল হয়ে যাব।

শান্ত করলাম তাকে। অনেক কিছু বললাম। কিন্তু প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল। পুরো সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে এই নিয়ে বিতর্ক চলছে। Anthropic - যারা Claude AI বানিয়েছে - তারা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে একটা রিসার্চ করেছে। সেই রিসার্চের গল্পটা বলছি।

AI coding assistants, মানে এআই হেল্পার কি জুনিয়র ডেভেলপারদের শেখার ক্ষমতা নষ্ট করছে, নাকি সাহায্য করছে? আমি অনেক কিছুই পড়ি, এটাও চোখে পড়ল। দেখলাম আমার মতো উত্তর খুঁজতে Anthropic একটা এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছে। পঞ্চাশ জন জুনিয়র ডেভেলপার। জুনিয়র মানে শূন্য থেকে দুই বছরের অভিজ্ঞতা। ইউনিভার্সিটি সবে শেষ, অথবা বুটক্যাম্প থেকে বের হওয়া। বিভিন্ন দেশ, বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড। কেউ Python জানে, কেউ JavaScript, কেউ Java।

দুটো গ্রুপে ভাগ করা হলো তাদের। গ্রুপ A পাবে Claude AI। গ্রুপ B পাবে না - শুধু Google, Stack Overflow, ডকুমেন্টেশন। এরপর দুটো পর্বে কাজ করানো হলো।

প্রথম পর্ব ছিল ষাট মিনিটের কোডিং টাস্ক। রিয়েল লাইফ চ্যালেঞ্জ। একটা ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন বানাতে হবে, API তৈরি করতে হবে, ডেটা প্রসেস করতে হবে। যে ধরনের কাজ তাদের আসল চাকরিতেও করতে হয়।

দ্বিতীয় পর্বটা ছিল আসল জিনিস। কোডিং শেষ হওয়ার সাথে সাথে একটা কুইজ। ত্রিশ মিনিট। প্রশ্নগুলো সোজা - তুমি এইমাত্র যে কোড লিখলে, সেটা কীভাবে কাজ করে? কোন লাইনটা কী করছে? এই জিনিসটা বদলালে কী হবে? বুঝে লিখেছ, নাকি শুধু কপি করেছ? ব্যাপারটা এমন যে, আপনি একটা রেসিপি দেখে রান্না করলেন। রান্না শেষে কেউ জিজ্ঞেস করল - কেন আদা দিলেন? চিনি বাদ দিলে কী হতো? এই মশলাটার কাজ কী? উত্তর দিতে পারলে মানে রান্না শিখেছেন। না পারলে শুধু রেসিপি মেনেছেন।

ফলাফল কি হতে পারে?

কাজের দিক দিয়ে গ্রুপ A এগিয়ে থাকল। AI সহ ওই গ্রুপ দ্রুত কোড লিখল। কম বাগ ছিল। কোড দেখতে প্রফেশনাল। ষাট মিনিটে বেশি ফিচার বানাতে পারল। গ্রুপ B ধীরে কোড লিখল। বেশি বাগ। কিছু জিনিস অসম্পূর্ণ থেকে গেল।

এখানে মনে হতে পারে, AI ব্যবহার করাই ভালো। কিন্তু কুইজের ফলাফল উল্টো গল্প বলল।

নলেজ পরীক্ষায় গ্রুপ B এগিয়ে রইল। যারা ধীরে কোড লিখেছিল, বেশি স্ট্রাগল করেছিল, তারা কুইজে ভালো করল। কোড কীভাবে কাজ করে সেটা তারা বুঝল। নিজের ভুল ধরতে পারল। লজিক এক্সপ্লেইন করতে পারল। অল্টারনেটিভ সলিউশন চিন্তা করতে পারল।

গ্রুপ A দ্রুত কোড লিখলেও সব বুঝল না। কেন কাজ করছে সেটা বলতে পারল না। AI যা দিয়েছে সেটা ব্লাইন্ডলি ব্যবহার করেছে। ব্যাপারটা অনেকটাই ক্যালকুলেটরের মতো। ক্যালকুলেটর দিয়ে ম্যাথ করলে উত্তর দ্রুত পাবেন। সঠিক হবে। কিন্তু ম্যাথ শিখবেন না। নিজে হাতে করলে সময় লাগবে। ভুল হতে পারে। কিন্তু ম্যাথ শিখবেন।

রিসার্চাররা আরেকটা মজার জিনিস খেয়াল করলেন। AI ব্যবহারকারীদের মধ্যে তিন ধরনের মানুষ ছিল।

প্রথম ধরন - "কপি-পেস্ট মাস্টার"। এরা AI কে বলত, পুরো ফিচারটা লিখে দাও। AI যা দিত, কপি-পেস্ট। কাজ শেষ। কিন্তু পরে জিজ্ঞেস করলে, এই কোড কী করছে, বা কিভাবে কাজ করছে - বলতে পারত না।

দ্বিতীয় ধরন - "কনফিউজড এক্সপ্লোরার"। বুঝতে চেষ্টা করেছিল। AI কেও জিজ্ঞেস করত, Google ও করত। কিন্তু এত ইনফরমেশন আসত যে কনফিউজড হয়ে যেত। AI একরকম বলছে, Stack Overflow অন্যরকম বলছে। দ্বিধায় পড়ে যেত।

তৃতীয় ধরন - "স্ট্র্যাটেজিক লার্নার"। এরা জিতল। এরা AI কে আমার মতো মেন্টর বানাল, কোড-রাইটার না। প্রশ্ন করত - এই কনসেপ্টটা বুঝিয়ে দাও। আমার কোডে সমস্যা কী? আরো ভালো উপায় কী? তারপর নিজেরা কোড লিখত। AI শুধু গাইড করত।

ধরুন, একজন বলল, লগইন ফর্ম বানাতে চাই, কোন কনসেপ্ট লাগবে? AI বলল, authentication, hashing, sessions জানতে হবে। ডেভেলপার বলল, authentication বুঝিয়ে দাও। বুঝে নিজে কোড লিখল। তারপর বলল, আমার কোড চেক করো, ভুল কোথায়?

এই তৃতীয় ধরনের নতুন প্রজন্মের ছেলেরা ভালো কোড লিখল - AI এর সাহায্যে - এবং ভালো শিখলও। কুইজে ভালো স্কোর পেল।

তাহলে - প্রথম লেসন - AI খারাপ না। ব্যবহারের উপর নির্ভর করে। "কোড-লেখার মেশিন" হিসেবে ব্যবহার করলে শিখবেন না। "শিক্ষক/মেন্টর" হিসেবে ব্যবহার করলে শিখবেন।

দ্বিতীয় লেসন - স্ট্রাগল জরুরি। যে গ্রুপ AI ছাড়া কাজ করল, তারা বেশি স্ট্রাগল করেছে। সময় নিয়েছে। ভুল করেছে। কিন্তু বেশি শিখেছে। জিমে কেউ আপনার জন্য ওজন তুললে আপনার মাসল বাড়বে না। নিজে কষ্ট করলে বাড়ে। কোডিং এও একই। AI সব লিখে দিলে "মানসিক মাসল" বাড়বে না।

তৃতীয় লেসন - সময়ের ভারসাম্য। অল্প সময়ে AI দিয়ে দ্রুত কাজ হয়। ভালো কোড হয়। কম ভুল। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে - ক্যারিয়ারে - বেশি নির্ভরশীল হলে কম শিখবেন। শিক্ষক হিসেবে ব্যবহার করলে বেশি শিখবেন।

সবচেয়ে বড় কথা - AI জুনিয়র ডেভেলপারদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবে না। যদি সঠিক উপায়ে ব্যবহার করা হয়।

তাহলে করনীয় কী?

প্রথম পরামর্শ - AI কে শিক্ষক বানান, স্লেভ না। "পুরো ফিচার লিখে দাও" না বলে বলুন, "কোন কনসেপ্ট লাগবে? আমার কোডে সমস্যা কী? আরো ভালো উপায় কী?"

দ্বিতীয় পরামর্শ - নিজে চেষ্টা করুন প্রথমে। AI এর কাছে যাওয়ার আগে পাঁচ-দশ মিনিট চেষ্টা করুন। এই স্ট্রাগলটাই শেখায়।

তৃতীয় পরামর্শ - AI যা দেয়, বুঝুন। প্রতিটা লাইন পড়ুন। কী করছে বুঝুন। নিজের ভাষায় এক্সপ্লেইন করার চেষ্টা করুন। না পারলে মানে শিখেননি।

চতুর্থ পরামর্শ - ভুল করুন, শিখুন। AI সব সময় পারফেক্ট কোড দেয়। কিন্তু ভুল কোড লিখে ডিবাগিং করে শেখাটা জরুরি। মাঝেমধ্যে AI ছাড়া কোড লিখুন।

পঞ্চম পরামর্শ - "কেন" জিজ্ঞেস করুন। AI যে কোড দিল, জিজ্ঞেস করুন - কেন এভাবে? অন্য উপায় কী? সুবিধা-অসুবিধা কী?

ফাইনাল কথায় আসি। AI coding assistants দারুণ টুল। জুনিয়র ডেভেলপারদের শত্রু না, বন্ধু। কিন্তু যেকোনো টুলের মতো, ব্যবহারের উপর নির্ভর করে। হাতুড়ি দিয়ে ঘর বানানো যায়, ভাঙাও যায়। AI দিয়ে শেখা যায় - সঠিক উপায়ে ব্যবহার করলে। আবার নির্ভরশীল হয়ে যাওয়া যায় - শুধু কপি-পেস্ট করলে।

আমার সেই বন্ধুর ছেলেকে এই রিসার্চের কথা বললাম। এখন সে AI কে সিনিয়র মেন্টর বানিয়েছে। আগের চেয়ে দ্রুত শিখছে। ভালো শিখছে।

পুনশ্চ: ISP অটোমেশনের বইয়ের দ্বিতীয় খন্ড - "এক মিলিয়ন গ্রাহকের ISP" - আসবে বইমেলার পরে। আমরা ১ মিলিয়ন গ্রাহককে সার্ভ করার জন্য তৈরি হচ্ছি। এই ইন্ডাস্ট্রিটা একটা স্কেলিং গেম। সে কারণেই দরকার প্রচুর অটোমেশন পাইপলাইন। নেটওয়ার্ক ডেভঅপস, সিআইসিডি পাইপলাইন নিয়ে যারা কাজ করতে পারেন তারা আমাকে ইনবক্স করতে পারেন। আমাদের একজন সফটওয়্যার আর্কিটেক্ট প্রয়োজন যিনি ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং নেটওয়ার্ককে "ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যাজ কোড" (IAS) হিসেবে দেখতে পারবেন। ডিটেইলস জানতে কমেন্টের বইটা দেখুন।


লেখকঃ মেশিন লার্নিং ও টেলিকম বিশেষজ্ঞ ও লেখক 


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।