পদোন্নতি রহস্য: বিটিআরসিতে দুই দফায় পেছাল কমিশন বৈঠক

পদোন্নতি রহস্য: বিটিআরসিতে দুই দফায় পেছাল কমিশন বৈঠক
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৯:৩৩  
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ১১:১১  

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ইতিহাসে এক বিরল ঘটনার সাক্ষী হলো সংস্থাটির নীতিনির্ধারণী বৈঠক। কোনো তরঙ্গ বরাদ্দ বা কৌশলগত কারণ নয়, বরং ‘পদন্নতি রহস্য’। বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করাকে কেন্দ্র করে দুই দফায় পিছিয়ে গেছে বিটিআরসির ৩০৩তম কমিশন বৈঠক। ২৯ জানুয়ারি কমিশন বৈঠকের নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অডিট আপত্তি এবং শ্বেতপত্রে নাম আসা ‘অবৈধ’ নিয়োগপ্রাপ্তদের পদোন্নতি দিতেই এই বিলম্ব ও তড়িঘড়ি তৎপরতা চলছে। 

কমিশন বৈঠক পেছানোর নেপথ্য
সূত্রমতে, গত ২৫ জানুয়ারি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবনে বিভাগীয় পদোন্নতি সভা (ডিপিসি) অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিতর্কিত ও অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তদের পদোন্নতি না দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হলেও যোগ্যদের পদোন্নতির বিষয়টি রহস্যজনকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। এরপর ২৬ জানুয়ারি জুনিয়র কর্মকর্তাদের পদায়ন নিয়ে বৈঠক হলেও আগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত না করে বৈঠকটি স্থগিত করা হয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার আসার আগেই অভিযুক্তদের পদোন্নতি নিশ্চিত করতে আগামী ২৯ জানুয়ারি নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। বৈষম্যের শিকার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ডিপিসি বৈঠকে উপস্থিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপে জানা যায়, বিটিআরসি’র নিয়োগ-পদায়ন নিয়ে অতীতের কমিশনের মতোই বিতর্কের মুখে পড়েছে বর্তমান চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারীর নেতৃত্বাধীন কমিশন। 

ওই বৈঠকে বিটিআরসি’র চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, কমিশনার এবং এই কমিটি সদস্য সচিব ও প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক মোঃ মেহেদী-উল-সহিদ ছাড়াও কমিশনের বাইরে থেকে জনপ্রশাসনের যুগ্মসচিব এম রায়হান আক্তার, অর্থমন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোহাম্মদ আবুল হাশেম এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের যুগ্মসচিব মোঃ মিজানুর রহমান বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে বিটিআরসিতে কর্মরত নবম থেকে চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তাদের শুন্য পদে পদায়ন নিয়ে আলাপ হয়। 

বৈঠকে উপস্থিত অর্থমন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আবুল হাশেম, কমিটির সদস্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের পরিকল্পনা অনুবিভাগের যুগ্মসচিব মোঃ সফিউল আলম এবং বৈঠকে উপস্থিত যুগ্মসচিব মোঃ মিজানুর রহমানের সঙ্গে আলাপ করেন এই প্রতিবেদক। আলাপকালে নিশ্চিত হওয়া যায়, বৈঠকে অডিট আপত্তিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি না দেয়ার বিষয়ে বৈঠকে সদস্যরা ঐক্যমত হন। একইসঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই তাদের পদায়নে সুপারিশ করা হয়। এ নিয়ে একটি রেজ্যুলেশন স্বাক্ষরের কথাও জানাগেছে। এ বিষয়ে বিটিআরসি’র সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাকে ফোন করে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।    

শ্বেতপত্র ও অডিট আপত্তির তোয়াক্কা নেই
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত সরকারের আমলে কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই বিধি বহির্ভূতভাবে ২৯ জনকে জুনিয়র পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সরকারের অডিট ও শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে এই নিয়োগকে ‘অবৈধ’ এবং ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ব্যবস্থা নিতে একাধিকবার চিঠি দিলেও বর্তমান কমিশন দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো দীর্ঘ ৭ বছর ধরে অডিট আপত্তিতে থাকা এসব কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতেই এখন কমিশন সভার তারিখ বারবার পরিবর্তন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ সাধারণ কর্মীদের। 

পদোন্নতির জটিলতা ও প্রবিধানমালা
বিটিআরসির ২০০৯ সালের প্রবিধানমালা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত না হওয়া সত্ত্বেও ২০২২ সাল পর্যন্ত তা দিয়েই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালের নতুন প্রবিধানে 'সহকারী পরিচালক' থেকে 'সিনিয়র সহকারী পরিচালক' পদটিকে পদোন্নতিযোগ্য করা হয়। তবে প্রবিধানের অস্পষ্টতা ও সংশোধনী চূড়ান্ত না হওয়ার সুযোগে একটি মহল প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। বর্তমানে বিটিআরসির ৩৫৫ জন স্থায়ী জনবলের মধ্যে ১৫৩ জনের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, যাদের অনেকেই এখন পদোন্নতির দৌড়ে শামিল।

বর্তমান শূন্যপদ ও অসন্তোষ
বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পরিচালক পদে ৪ জন, উপ-পরিচালক পদে ৬ জনসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ খালি রয়েছে। যোগ্য ও বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অযোগ্যদের পথ সুগম করতে তাদের ন্যায্য পদায়ন বিলম্বিত করা হচ্ছে। ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে ৬-৭টি পদ শুন্য থাকলেও এই গ্রেডের কর্মচারীরা দীর্ঘদিন পদোন্নতি বঞ্চিত রয়েছেন।  ২৬ জানুয়ারি এ নিয়ে বৈঠক হলেও তা ২৮ তারিখের বৈঠক পর্যন্ত ঝুলে গেছে। 

ডিপিসি বৈঠকে উপস্থিত অর্থ মন্ত্রণালয় ও ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিনিধিরা জানান, বৈঠকে অডিট আপত্তিপ্রাপ্তদের পদোন্নতি না দেওয়ার বিষয়ে তারা একমত পোষণ করেছিলেন। তবে কমিশনের শীর্ষ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার ‘অতি উৎসাহী’ ভূমিকার কারণে যোগ্যদের তালিকা প্রকাশ না করে বৈঠক বারবার পেছানো হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সংস্থার সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। ২৯ জানুয়ারির বৈঠকে কমিশন শেষ পর্যন্ত আইনি বিধিমালা অনুসরণ করে নাকি বিতর্কিতদের পক্ষে অবস্থান নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে খাত সংশ্লিষ্টরা।
ডিবিটেক/আইএইচ/ইকে