জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত মহাপরিকল্পনা ২০২৬–২০৫০

পরিচ্ছন্ন ও দক্ষ প্রযুক্তি কমাবে ইউনিট প্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্বন নিঃসরণ

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের  গবেষণায় স্বাধীন ইনস্টিটিউশন গঠনের নির্দেশ

পরিচ্ছন্ন ও দক্ষ প্রযুক্তি কমাবে ইউনিট প্রতি  বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্বন নিঃসরণ
৭ জানুয়ারি, ২০২৬ ২০:০৫  

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ‘জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত মহাপরিকল্পনা ২০২৬–২০৫০’ উপস্থাপন করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। মহাপরিকল্পনায় দেখানো হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ চাহিদা ১৭ গিগাওয়াট থেকে বেড়ে ৫৯ গিগাওয়াটে পৌঁছাবে। যদিও এতে পরিবেশগত ও সামাজিক চাপ বাড়বে, তবে পরিচ্ছন্ন ও দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ ০.৬২ থেকে কমে ০.৩৫ টন/মেগাওয়াট-ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। 

৭ জানুয়ারি (বুধবার) রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় জানানো হয়, মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কুইক রেন্টাল আইন বাতিল, মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫, রিনিউএবল এনার্জি পলিসি ২০২৫, রুফটপ সোলার প্রোগ্রাম ২০২৫ এবং নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ গ্রহণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে জলবায়ু উদ্যোগের মাধ্যমে ২০৫০ সালের মধ্যে মোট ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাসের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা শুনে বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। 

তিনি বলেছেন, এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়, বরং স্বতন্ত্রভাবে কাজ করবে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে নীতিনির্ধারণে সরকারকে সহায়তা করবে।

সভায় উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

উপস্থাপিত মহাপরিকল্পনায় দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার মাধ্যমে সকল মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়া হয়। সভায় আগের তিনটি মহাপরিকল্পনার নীতিগত ঘাটতি চিহ্নিত করে তা পর্যালোচনা করা হয়। নতুন মহাপরিকল্পনাটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে— প্রথম ধাপ ২০২৬–২০৩০, দ্বিতীয় ধাপ ২০৩০–২০৪০ এবং তৃতীয় ধাপ ২০৪০–২০৫০ সাল।

২০২৬ থেকে ২০৩০ মেয়াদে ফার্স্ট ট্র্যাক প্রায়োরিটি প্রকল্প হিসেবে অফশোর অনুসন্ধান রাউন্ড, গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, এলএনজি সরবরাহ নিরাপত্তা, রিফাইনারি সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুদ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রকল্পে অফশোর গ্যাস উন্নয়ন, বৃহৎ পরিসরে রিফাইনিং ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প সম্প্রসারণ, হাইড্রোজেন ও অ্যামোনিয়া অবকাঠামো, ভূ-তাপীয় শক্তি এবং জোয়ার-ভাটা ও সমুদ্র তরঙ্গভিত্তিক শক্তি উন্নয়নের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

পরিকল্পনা পর্যালোচনার সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ এই খাত। এটি শক্তিশালী হলে দেশের অর্থনীতি দাঁড়াবে এবং প্রতিটি মানুষের জীবন এতে সরাসরি প্রভাবিত হয়।’ 

তিনি অতীতের খাপছাড়া পরিকল্পনার সমালোচনা করে বলেন, নতুন করে শুরু থেকে চিন্তা করতে হবে এবং সুশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে সব কার্যক্রম পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য গবেষণাকেন্দ্র অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২৬–২০৫০ মেয়াদে জ্বালানি খাতে ৭০–৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বিদ্যুৎ খাতে ১০৭.২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে, যার মাধ্যমে খাতটিকে আরও নিরাপদ, দক্ষ, কম আমদানিনির্ভর ও আর্থিকভাবে টেকসই করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ডিবিটেক/এফবিও/আইএইচ