সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’
তিন দাবিতে ফের উত্তপ্ত প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। ২৮ আগস্ট, বৃহস্পতিবার থেকে সব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে কমপ্লিট শাটডাউন ঘোষণা করেছেন প্রকৌশল অধিকার আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। এর আগে আন্দোলনরত প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জের ঘটনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ উল্লেখ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভিসি অধ্যাপক ড. আবু বোরহান মোহাম্মদ বদরুজ্জামান।
তিনি বলেছেন, শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয় ব্যবস্থা নিতে আমি ও প্রোভাইস চ্যান্সেলর শিক্ষা উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করি। এই দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরি। দায়িত্ব নিয়ে উপদেষ্টাদের সঙ্গে বসে কমিটি গঠন করতে এবং বিষয়টির সমাধান করতে তাদের অনুরোধ করি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে বুয়েট ভিসি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার সময় অনেকেই ভুয়া ভুয়া বলে স্লোগান দিচ্ছিলেন। এ সময় শিক্ষার্থীরা জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
এরপর প্রকৌশলী অধিকার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাকিবুল হক লিপু শাহবাগের সমাবেশ থেকে ২৭ আগস্ট, বুধবার রাত সাড়ে ১০টায় নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি চলবে। আগামীকাল সব ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় কমপ্লিট শাটডাউন ঘোষণা করা হলো। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা হবে না।
লিপু অভিযোগ করে বলেন, “আমাদের তিন দফা দাবির কোনোটি পূরণ হয়নি। যারা নীতিনির্ধারণে বসে আছেন, তারা আসলে আমাদের আন্দোলনের বিষয়ে কিছুই জানেন না।”
আন্দোলনকারীরা জানাচ্ছেন, নবম গ্রেডে সহকারী প্রকৌশলী পদে শুধু বিএসসি ডিগ্রিধারীদের নিয়োগ দিতে হবে এবং তা পরীক্ষার মাধ্যমে হতে হবে।দশম গ্রেডে উচ্চ ডিগ্রিধারীরাও যেন আবেদন করতে পারেন, সেই সুযোগ রাখতে হবে। কেবল বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্নকারীরাই যেন নিজেদের প্রকৌশলী লিখতে পারেন—এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেছেন, পুলিশের হামলায় তাদের ৬০ থেকে ৬৫ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। অন্যদিকে পুলিশ দাবি করেছে, সংঘর্ষে তাদের আট সদস্য আহত হয়ে রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
এমন পরিস্থিতিতে ২৭ আগস্ট, বুধবার রাতে শাহবাগে গিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।
এদিন সন্ধ্যায় প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন রেলপথ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বৈঠক শেষে রেলপথ উপদেষ্টা জানান, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। শিক্ষার্থীদের দাবি মূলত চাকরি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সংক্রান্ত। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, “দাবি-দাওয়া ও আলোচনার পথ খোলা আছে। তবে কথায় কথায় শাহবাগ অবরোধ বা যমুনায় যাওয়া সমাধান নয়। ছাত্রদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত থাকবে।”
এদিকে ২৬ আগস্ট, মঙ্গলবার থেকে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছেন বুয়েটসহ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ২৭ আগস্ট দুপুর দেড়টার দিকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে যমুনার দিকে অগ্রসর হলে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় ধস্তাধস্তি, কাঁদানে গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। পাল্টা শিক্ষার্থীরাও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। ঘটনাস্থলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়েন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের ডিসি মাসুদ আলম জানান, “শিক্ষার্থীদের আলোচনার জন্য শাহবাগেই অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তারা হঠাৎ যমুনার দিকে রওনা দেন এবং ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করেন। তখন পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে হয়েছে।”
ঢাকার ঘটনায় বুয়েটের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) এবং পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভ করেছেন।
উদ্ভূতি পরিস্থিতিতে প্রকৌশল পেশায় বিএসসি ডিগ্রিধারী ও ডিপ্লোমাধারীদের পেশাগত দাবির যৌক্তিকতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বুধবার প্রজ্ঞাপন জারি করে জানায়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানকে এ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে।
উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, “শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো বিবেচনা করে ন্যায্য সমাধান প্রস্তাব করা হবে।” তবে আন্দোলনকারীরা এই কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা (বুধবার) দুপুরে রাজধানীর শাহবাগ থেকে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে মিছিল নিয়ে যেতে চাইলে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।



