গ্রামীণফোনঃ প্রতিযোগিতা কমিশনের রায় সোমবার
মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন প্রভাবশালী (SMP) অপারেটর হওয়ার কারণে তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করছে। অস্বাভাবিক কম দামে সিম বিক্রি করে বাজার দখলের চেষ্টা করছে।এমন প্রতিযোগিতা বিরোধী অভিযোগে প্রতিযোগিতা কমিশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও দায়ের করে অপারেটর দুটি। সেই নালিশের বিরুদ্ধে আপিল করেছে অভিযুক্ত অপারেটর গ্রামীণফোন।
সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর বোরাক টাওয়ারে ১৭ সেপ্টেম্বর, বুধবার শুনানি করছে প্রতিযোগিতা কমিশন। কমিশনে গ্রামীণফোনের পক্ষে ড. কামাল হোসেনের চেম্বার থেকে ব্যারিস্টার শরীফ আহমেদ গ্রামীণফোনের পক্ষে আপত্তি উপস্থাপন করেন সেখানে নালিশটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীন এবং প্রতিযোগিতা কমিশনের এখতিয়াভুক্ত নয় বলে যুক্তি দেওয়া হয়।
তবে সেই যুক্তিকে খন্ডন করেছেন রবির পক্ষের আইনজীবি ব্যারিস্টার সামির সত্তার। শুনানিতে অকাট্য দলিল হিসেবে তিনি দেখিয়েছেন টেলিকমিশনেশন অ্যাক্ট ২০০১ সালে হলেও প্রতিযোগিতা কমিশন আইন হয়েছে ২০১২ সালে। ফলে সেকশন ৪২ অনুযায়ী প্রতিযোগিতা কমিশনের ধারা টেলিকম আইনের ওপর প্রাধান্য পাবে। এক্ষেত্রে কোনো সুপারিসড ঘটেনি। একইসঙ্গে প্রতিযোগিতা কমিশন আইনে ৩ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশের সব ধরনের এন্টারপ্রাইজ যেগুলো বাণিজ্যিক ভাবে ক্রয় বিক্রয় করে সেগুলো প্রতিযোগিতা কমিশনের অন্তর্ভূক্ত। শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধারা ৪ এ অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে কোনো বিষয়নে যখন আইন লঙ্ঘিত হয়ে যায় সে বিষয়ে প্রতিযোগিতা কশিনে বিচার প্রত্যাশার আইনি অধিকার রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপার্সন এ এইচ এম আহসানের নেতৃত্বে শুনানি করেন চার চার সদস্যের কমিশন। কমিশনের অপর সদস্যরা হলেন-ড. আক্তারুজ্জামান তালুকদার, ওয়াহিদ হাসান শাহ এবং আফরোজা বিলকিস।
শুনানি শেষে এ বিষয়ে রায় দিতে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর, সোমবার দিন ধার্য করেছেন বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন। ওই রায়ের ওপর ভিত্তি করেই বাজারের শীর্ষ অংশ দখলে রাখা মোবাইল অপারেটরটির পরবর্তী বাজার কৌশল পর্যালোচনায় আসতে পারে।
এদিকে গ্রামীণফোনের আগ্রাসী আচরণ নিয়ে বিটিআরসি-তেও দফায় দফায় অন্য অপারেটররাও নালিশ করেছে। নালিশকারী অপর মোবাইল অপারেটর বাংলালিংককেও ১৬ সেপ্টেম্বর শুনানিতে ডাকা হয়েছিলো। তবে এক দিনের নোটিশের কারণে শুনানির সময় চেয়েছে বাংলালিংক।
গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বাজার প্রতিযোগিতায় সিম বিপণনে আগ্রাসী কৌশল ব্যবহার করে গ্রামীণফোন সিমের (SIM) কৃত্তিমভাবে মূল্য হ্রাস, প্রতরণামূলক মূল্য নির্ধারণ, সিমের যোগানকে সীমিতকরণ, বৈষম্যমূলক শর্তারোপ করে কৌশলগতভাবে খুচরা বিক্রেতাদের নিয়ন্ত্রণ করে প্রতিযোগিতা আইন ২০১২ এর ধারা ১৫ ও ১৬ উভয়ের অধীনেই প্রতিযোগিতা বিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে কর্তৃত্বময় অবস্থানের অপব্যবহার করেছে।
বাদী পক্ষের অভিযোগ- প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক কম মূল্যে সিম বিক্রি করে জিপি প্রতিযোগীতা বিরোধী কার্যক্রমে জড়িত, যা টেলিযোগাযোগ খাতে তাদের কর্তৃত্বময় অবস্থানের সুস্পষ্ট অপব্যবহার। তদুপরি, খুচরা বিক্রেতাদের বাড়তি কমিশন প্রদান অন্য অপারেটরের বাজারে প্রবেশাধিকার সীমাবদ্ধ করে যা টেলিযোগাযোগ পরিষেবার বাজারে প্রতিযোগিতার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
এ ধরণের কার্যক্রম টেলিযোগাযোগ খাতে একচেটিয়া পরিবেশ তৈরির সম্ভাবনা রাখে, যার ফলে প্রতিযোগিতা হ্রাস, উচ্চ মূল্য ও দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তা কল্যাণ হ্রাস পায়। আমাদের বিনীত দাবী, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন যাতে এই অভিযোগ তদন্ত পূর্বক বাজারের প্রতিযোগিতা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। বাজার প্রতিযোগিতা ব্যাহত এবং আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য জিপি কার্যক্রম পরিচালনা করছে কী-না তা কমিশনের তদন্ত করা অপরিহার্য বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জানাতে চাইলে গ্রামীণফোন জানায়, "গ্রামীণফোন বাংলাদেশের প্রচলিত প্রতিযোগিতা আইন মেনে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। আজ প্রতিযোগিতা কমিশনের অফিসে শুনানিতে আমাদের ডাকা হয়েছিল, যেখানে আমরা আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছি। গ্রামীণফোন কোনোভাবেই প্রতিযোগিতাবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত নয়।মূল্য নির্ধারণ, বিপণন এবং বিতরণ সম্পর্কিত সকল অভিযোগ আমরা সুস্পষ্টভাবে অস্বীকার করি । আমাদের দেশের টেলিযোগাযোগ খাতটি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) কর্তৃক কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। ২০০১ সালের বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী পরিচালিত এই খাত ন্যায্য প্রতিযোগিতা, উন্মুক্ত বাজার এবং গ্রাহকের অধিকার নিশ্চিত করে। বিটিআরসি একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাজারে প্রবেশ, মূল্য নির্ধারণ এবং সকল প্রতিযোগিতামূলক কার্যক্রমের তদারকি করে থাকে। গ্রামীণফোন বর্তমানে একটি এসএমপি অপারেটর হিসেবে আইনানুগভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমরা অসম এমএনপি লক-ইন, ক্যাম্পেইন অনুমোদন, ইন্টারকানেকশন চার্জসহ আরও কিছু কঠোর নিয়ন্ত্রক নির্দেশনার সুনির্দিষ্ট ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছি। এমন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং নেতিবাচক প্রতিযোগিতামূলক উদ্দেশ্যের প্রতিফলন।"
তবে রবি আজিয়াটা পিএলসি’র চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন, আমরা সুস্পষ্ট প্রমাণ সাপেক্ষে প্রতিযোগিতা কমিশনে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছি। বাজার প্রতিযোগিতা ধারাবাহিকভাবে লঙ্ঘনের এ বিষয়টি কমিশনকে জানানোর পর গ্রামীণফোন এ বিষয়ে প্রতিযোগিতা কমিশনের পদক্ষেপ গ্রহণের এখতিয়ার নিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, এ বিষয়ে প্রতিযোগিতা কমিশনের এখতিয়ার আইনে সুস্পষ্ট। প্রতিযোগিতা আইন অনুসারে বাজার প্রতিযোগিতা ভঙ্গের বিষয়ে যথাযথ তদন্তপূর্বক কমিশন সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।







