যুক্তরাষ্ট্রে ‘ইউএস-বাংলাদেশ আইটি কানেক্ট’ পোর্টাল উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

৩ মে, ২০২৩ ০৩:৪৬  

গত ১৩ এপ্রিল ঢাকার সঙ্গে হালনাগাদ প্রযুক্তি অংশীদারিত্বে ঢাকাস্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের পরিবেশ, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মকর্তা শিবানী রসানায়াকাম-কে বেসিস ও দূতাবাসের মাধ্যমে ইউএস আইটি কানেক্ট পোর্টাল স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছিলেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। এই আহ্বানের মাস পূর্তির আগেই মঙ্গলবার (২ মে) ইউএস চেম্বার অব কমার্স ওয়াশিংটন, ডিসির গ্রেট হলে দেশের আইটি খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ‘ইউএস-বাংলাদেশ আইটি কানেক্ট’ পোর্টাল উদ্বোধন করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এসময় তিনি বাংলাদেশের অটোমোবাইল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ, এবং ফার্মাসিউটিক্যালে মার্কিন ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ৫০ বছরের বন্ধুত্ব উপলক্ষে আইসিটি বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) এনহ্যান্সিং ডিজিট্যাল গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমি (ইডিজিই) প্রকল্প এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় বাংলাদেশ আইটি কানেক্ট পোর্টাল-ইউএসএ তৈরি করা হয়।

পোর্টালটি বাংলাদেশের একটি ভার্চুয়াল বিজনেস ডেস্ক হিসেবে কাজ করবে যা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশী আইটি/আইটিইএস/স্টার্টআপ কোম্পানিগুলিতে অংশীদারিত্ব ও বিনিয়োগ করতে চাওয়া বিদেশী কোম্পানিগুলির মধ্যে একটি সেতু তৈরি করবে। এটি বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি B2B আইটি কানেক্টিভিটি হাব হিসেবেও কাজ করবে। এছাড়াও আইসিটি কোম্পানি এবং তাদের বাংলাদেশী সহযোগীদের মধ্যে ব্যবসায়িক সংযোগ সহজতর করবে, দূতাবাসে অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে।

এদিকে একই ভ্যেনুতে “ইউএস-বাংলাদেশ ইকোনমিক পার্টনারশিপ: শেয়ার্ড ভিশন ফর স্মার্ট গ্রোথ” শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের এক্সিকিউটিভ বিজনেস গোলটেবিলের মূল বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, "আমি আপনাদেরকে আমাদের নবায়নযোগ্যযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ, অটোমোবাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস, হালকা ও ভারী যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক সার, আইসিটি, সামুদ্রিক সম্পদ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম ইত্যাদিসহ  অনেক গতিশীল ও সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগ করার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। 

এসময় বাংলাদেশে ব্যবসায়ের সুযোগ অন্বেষণ ও বিনিয়োগের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী নেতাদের প্রতিও আহ্বান জানিয়ে শুধুমাত্র মার্কিন বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি নিবেদিত 'বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল' রাখার প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। 

ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের আয়োজনে ওই বৈঠকে ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল আমাদের দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।  এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশীদার হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে আমাদের একক বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য, বিদেশী প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের বৃহত্তম উৎস, দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন অংশীদার এবং প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

বাংলাদেশ বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) এবং ২৯টি হাই-টেক পার্ক স্থাপন করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, এখানে বিনিয়োগে বিদেশী বিনিয়োগ সুরক্ষা, ট্যাক্স হলিডে, রয়্যালটি রেমিটেন্স, বাধাহীন প্রস্থান নীতি, লভ্যাংশ ও মূলধন সম্পূর্ণ প্রত্যাবর্তন সুবিধা রয়েছে। আমি আশা করি যুক্তরাষ্ট্র এই চ্যালেঞ্জিং উদ্যোগে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং পারস্পরিক সুবিধার জন্য একটি মসৃণ ও অনুমানযোগ্য সরবরাহ শৃঙ্খল তৈরির মাধ্যমে আমাদের দীর্ঘমেয়াদী উৎপাদনশীল অংশীদার হবে।  (সূত্র : বাসস)

"বাংলাদেশ এখন সর্বজনীনভাবে "আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের রোল মডেল" হিসাবে স্বীকৃত উল্লেখ করে বাংলাদেশের সরকার প্রধান স্পষ্ট জানিয়েছেন, সুশাসনের ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন ও স্থিতিশীলতা, গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, নারীর ক্ষমতায়ন এবং আইসিটি খাতে অগ্রগতির কারণে "ডিজিটাল বাংলাদেশ" অর্জন সম্ভব হয়েছে।  এ কারণেই ইদানীং বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্র্যান্ড ফাইন্যান্স ইউকে জানিয়েছে, বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ভ্যালু গত বছর ৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে যা বিশ্বে সর্বোচ্চ এবং গ্লোবাল সফট পাওয়ার ইনডেক্স ২০২৩ অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। "স্মার্ট বাংলাদেশ" গড়ে তোলা। এই রূপকল্প ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উচ্চ আয়ের উন্নত দেশে পরিণত করবে।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকো-সিস্টেমে দ্রুত বিকাশ এবং এখানে সরাসরি বিনিয়োগ সম্ভাবনার বিষয়টি তুলে ধরেন। উপস্থাপনায় তিনি জানান, মাত্র ৫ বছরের মধ্যে দেশে ২৫০০টি স্টার্টআপ সক্রিয় রয়েছে। প্রতিবছর যুক্ত হচ্ছে ২০০টির বেশি স্টার্টআপ। এরইমধ্যে ৪০০ এর বেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করেছে ৮৮৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি। সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ পেয়েছে বিকাশ, শপআপ এর মতো উদ্ভাবনী ফিনটেকগুলো। আকর্ষণীয় বিনিয়োগ পেয়েছে পাঠাও, চালডাল, পিকাবু, সোয়াপ, পেপারফ্লাই, যান্ত্রিক, আই ফার্মার ও মনেরবন্ধুর মতো ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।

এছাড়াও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক এবং চেয়ারম্যান এক্সেলরেট এনার্জি স্টিভেন কোবোস, বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের গ্লোবাল চেয়ার ইমেরিটাস (বিসিজি) হ্যান্স-পল বার্কনার, মাস্টারকার্ডের গ্লোবাল পাবলিক পলিসি অ্যান্ড ইন্দো-প্যাসিফিক পলিসি অপারেশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রবি অরোরা, বিকাশের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল কাদির, শেভরন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর এরিক ওয়াকার এবং গ্লোবাল হেড অব এক্সপ্রোরেশন অ্যান্ড নিউজ এক্সনমোবিলের ভেঞ্চার ডঃ জন আর্ডিল প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

গোলটেবিল বৈঠকে ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট এবং ইউএস চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট-সাউথ এশিয়া অ্যাম্বাসেডর অতুল কেশপ স্বাগত বক্তব্য রাখেন।

এ ছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এবং প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক,  বোয়িং ইন্ডিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার প্রেসিডেন্ট শাইল গুপ্ত, ইউএস সয়াবিন এক্সপোর্ট কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান কেভিন রোপেকে, প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। 

আরো উপস্থিত ছিলেন টইঊজ-এর পাবলিক পলিসি অ্যান্ড গভর্নমেন্ট অ্যাফেয়ার্স-এশিয়া প্যাসিফিক মাইক অরগিল, ইউএস চেম্বার অফ কমার্সের দক্ষিণ এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট রায়ান মিলার, ইউএস চেম্বার অফ কমার্সের নির্বাহী পরিচালক সন্দীপ মাইনি এবং ইউএস-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিলের পরিচালক সিদ্ধান্ত মেহরা।

প্রধানমন্ত্রী এর আগে ইউএস চেম্বার অব কমার্সের ব্রিফিং সেন্টারে ইউএসবিবিসি’র সিনিয়র এক্সিকিউটিভদের সঙ্গে দুটি পৃথক বৈঠকে এবং ইউএস চেম্বার অ্যান্ড কমার্সের প্রেসিডেন্ট ও সিইওদের সঙ্গে আরেকটি বৈঠকে যোগ দেন।