উপকূলের মেয়েদের স্টেম শিক্ষায় সুযোগ ও সম্ভাবনা নিয়ে খুলনায় অ্যাডভোকেসি কর্মশালা অনুষ্ঠিত
উপকূলীয় অঞ্চলের কিশোরী মেয়েদের জন্য বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও গণিত এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে ১০ জানুয়ারি, শনিবার খুলনায় অনুষ্ঠিত হল “উপকূলের মেয়েদের স্টেম (STEM) শিক্ষায় সুযোগ তৈরিতে সমন্বিত উদ্যোগ” শীর্ষক একটি অ্যাডভোকেসি কর্মশালা।
কর্মশালায় খুলনার চারটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও উপকূলের মেয়েদের ক্ষমতায়নে কাজ করা এনজিও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কর্মকর্তারা সহ মোট ৭৫ জন উপস্থিত ছিলেন।
কর্মশালায় উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে উপকূলের তিনটি উপজেলার মেয়েদের বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি ভিত্তিক দক্ষতা অর্জনে স্টেম এন্ড আইসিটি স্কিলস ফর দ্যা গার্লস অফ কোস্টাল এরিয়া প্রকল্পের কার্যক্রম এবং অর্জিত ফলাফল তুলে ধরে প্রকল্পের সমন্বয়ক রেজাউল ইসলাম জানান এই প্রকল্পের মাধ্যমে তথ্য প্রযুক্তি নিয়ে মেয়েদের মাঝে যে পরিবর্তন এসেছে তার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার, স্থানীয় সরকার, এনজিও এবং বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
এরপর দলগত আলোচনা ও প্যানেল সেশনে শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও এনজিও নেতৃবৃন্দ উপকূলীয় মেয়েদের STEM শিক্ষায় অংশগ্রহণের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে মতামত দেন। নৈহাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সঞ্জীব সরকার বলেন, “মেয়েদের আগ্রহ থাকলেও প্রযুক্তি উপকরণ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও ধারাবাহিক সহায়তার অভাব একটি বড় বাধা।” একজন অভিভাবক তার মতামত প্রকাশ করে বলেন, “আমরা চাই আমাদের মেয়েরা প্রযুক্তি শিক্ষায় এগিয়ে যাক, কিন্তু সুযোগ ও দিকনির্দেশনার অভাব অনেক সময় আমাদেরকেও সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় ফেলে দেয়”। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নিশাত তাসনিম জুঁই বলে, “এই প্রকল্প থেকে যেটা হাতে কলমে শিখেছি সেটা আমি ছোটদের শেখাতে চাই। কিন্তু এটা নিয়ে আমার আরো গভীরে শেখা প্রয়োজন যেটা মাধ্যমিকের পরে আমি কিভাবে করব জানিনা”।
কর্মশালার শেষভাগে একটি মতবিনিময় পর্বে অংশগ্রহণকারীদের মতামতের প্রেক্ষিতে সার্বিক একটি আলোচনায় অংশ নেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জনাব এস. এ আনোয়ার-উল কুদ্দুস, উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জনাব মোঃ রকিবুল ইসলাম তরফদার, উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা ফারহানা ইয়াসমিন, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হেলাল আন-নাহিয়ান এবং মালালা ফান্ডের এডুকেশন চ্যাম্পিয়ন নেটওয়ার্ক ও বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের সভাপতি জনাব মুনির হাসান।
মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জনাব এস. এ আনোয়ার-উল কুদ্দুস বলেন, “আমাদের দেশে পরীক্ষায় পাশের দিক থেকে মেয়েরা এগিয়ে থাকলেও কর্মক্ষেত্রে ভালো করার দৌড়ে তারা পিছিয়ে পড়ে। মেয়েদের ক্ষমতায়নে শুধু টাকা নয়, বরং সময়, শ্রম এবং জ্ঞান বিনিয়োগ করতে হবে, তাদের জন্য সুযোগ তৈরী করতে হবে।”। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জনাব মোঃ রকিবুল ইসলাম তরফদার বলেন, “আমি একইসাথে অবাক এবং খুশি হয়েছি যখন শুনেছি আমাদের মেয়েরা জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছে। আরো বড় পরিসরে এমন কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রাখতে আমাদের সকলের সম্মিলিত উদ্যোগের কোন বিকল্প নেই।”
সমাপনী বক্তব্যে বিএফএফ এর নির্বাহী পরিচালক বলেন, “আমাদের সকলের আন্তরিকতাই পারে উপকূলের মেয়েদের প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে কর্মক্ষেত্রউপযোগী করে গড়ে তুলতে”। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হেলাল আন-নাহিয়ান জানান, পুঁথিগত রেজাল্টের চেয়ে দক্ষতাভিত্তিক উন্নয়নের এখন কোন বিকল্প নেই। এই প্রকল্পের সফলতা আমরা তখন পাবো যখন এমন প্রত্যন্ত এলাকা থেকে মেয়েরা কুয়েটের মত বড় প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ তৈরী করে নিতে পারবে”। জনাব মুনির হাসান বলেন, “STEM শিক্ষা মেয়েদের কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, বরং সমস্যা সমাধান, আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের সক্ষমতা তৈরি করে। উপকূলের মেয়ে বলেই যেনো কেউ পিছিয়ে না পড়ে”
সমাপনী বক্তব্যে আয়োজকরা জানান উপকূলীয় অঞ্চলের মেয়েদের STEM ও ICT শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে নীতি নির্ধারক ও অংশীদারদের মধ্যে একটি শক্তিশালী সংযোগ তৈরী এবং আজকের কর্মশালা থেকে প্রাপ্ত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার কোন বিকল্প নেই।
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (BdOSN)- এর উদ্যোগে ও বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (BFF)-এর সহযোগিতায় এবং মালালা ফান্ডের পৃষ্ঠপোষকতায় স্টেম এন্ড আইসিটি স্কিলস ফর দ্যা গার্লস অফ কোস্টাল এরিয়া প্রকল্পটি উপকূলের মাধ্যমিক স্কুলের মেয়েদের বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তিতে আগ্রহ তৈরী ও দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। যার অংশ হিসেবে উক্ত কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
ডিবিটেক/এসএ/ইকে







