গ্রামীণফোনের গড়িমসি, কালক্ষেপণ ও আইন এড়ানোর কৌশল?

গ্রামীণফোনের গড়িমসি, কালক্ষেপণ ও আইন এড়ানোর কৌশল?
২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ২১:২৯  
২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০০:৪৫  

গ্রামীণফোনের শ্রমিকদের ৫% প্রফিট শেয়ারের বিলম্ব জরিমানার বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে ত্রিপাক্ষীয় বৈঠকের অংশ হিসেবে সবশেষ গত ১৭ ডিসেম্বর  গ্রামীণফোনের ম্যানেজমেন্টে সঙ্গে বৈঠক করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি। মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফাহমিদা আক্তারের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে গ্রামীণফোনের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য পেশ করেন প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র পরিচালক মোঃ আওলাদ হোসেন। 

২৩ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার উপদেষ্টা ও সচিবের একান্ত সচিবসহ সব পক্ষের কাছে ওই সভার একটি কার্যবিবরণী পাঠানো হয়েছে।  বৈঠকের ওই কার্যবিবরণীতে দেখে ফের ক্ষুব্ধ হয়েছেন বিচারপ্রার্থীরা। তারা বলছেন, ‘গ্রামীণফোন লিমিটেড শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধে আবারও বিষয়টি  “বিচারাধীন বিষয় (Sub Judice)” অজুহাত তুলে কালক্ষেপণ ও দায় এড়ানোর কৌশল নিয়েছে।’

ডিজিবাংলাটেকডট নিউজের হাতে আসা সভার কার্যবিবরণীতে বৈঠকে গ্রামীণফোন দাবি করেছে,  ২০১০–১২ সালের WPPF (Workers’ Profit Participation Fund) চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, কর্মীরা তখন স্বেচ্ছায় সুদের দাবি পরিত্যাগ করে ‘Deed of Undertaking’ স্বাক্ষর করেছিলেন।

তবে তাদের উপস্থাপিত এই যুক্তি ‘আইনগত ও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ’ বলে মনে করছে গ্রামীণফোন ৫ শতাংশ বিলম্ব বকেয়া আদায় ঐক্য পরিষদ। 

সংগঠনটির সভাপতি আবু সাদাৎ জানিয়েছেন, ‘এই তথাকথিত সম্মতি মূল টাকা আটকে রেখে ও চরম অসম ক্ষমতার ভারসাম্যের মধ্যে আদায় করা হয়েছিল। স্বাধীন সম্মতি হিসেবে এটি গ্রহণযোগ্য নয়।’

কেন গ্রহণযোগ্য নয় প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘শ্রম আইন স্পষ্টভাবে বলে কোনো বছরের মুনাফার ৫% পরের বছর কর্মীদের মধ্যে বিতরণ বাধ্যতামূলক। সময়মতো না দিলে বিলম্বজনিত সুদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য। গ্রামীণফোন ২০১০, ২০১১ ও ২০১২ সালের কোনো অর্থই নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ করেনি। ফলে আরোপিত বিলম্ব জরিমানা কোনো অন্যায্য দাবি নয়, এটি আইনগত পাওনা।’

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানাগেছে, গ্রামীণফোন ২০১১ সালে সরকারের ২০১০ সালের এসআরও চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখে। মামলায় পরাজয় নিশ্চিত জেনে ২০১৪ সালে সুদের মওকুফ প্রস্তাব দেয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে সেই রিট নিজেই প্রত্যাহার করে নেয়। এর অর্থ একটাই সরকারের আদেশ বৈধ ছিল এবং সময়মতো টাকা না দেওয়াটা অন্যায় ছিল।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বর্তমানে শ্রম আদালতে প্রায় ১২০০ মামলা বিচারাধীন। এছাড়া আরও প্রায় ২৮০০ কর্মী মামলা না করেও পাওনার অপেক্ষায়। তাদের ক্ষেত্রে ‘Sub Judice’ যুক্তি ব্যবহার ‘অযৌক্তিক’।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রামীণফোন অতীতেও একাধিক বিচারাধীন মামলা এনবিআর, বিটিআরসি, চাকরিচ্যুত ও সাবেক কর্মীদের মামলা আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করেছে। এমনকি  সাম্প্রতিককালে গ্রামীণফোন বিটিআরসির সাথে চলমান মামলার জটিলতা থেকে মুক্ত হতে অডিট আপত্তির বকেয়া পাওনা নিয়ে সমঝোতা চেয়েছে। এর মাধ্যমে আদালতের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তি ন্যায়সংগত, আইনত বৈধ তা গ্রামীণফোনের অতীত কার্যক্রমেই স্পষ্ট হয়েছে। 

সঙ্গত কারণেই এখন প্রশ্ন ওঠেছে, কেনইবার তাহলে শুধুমাত্র শ্রমিকদের পাওনা নিয়ে আদালতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে?  

এদিকে গ্রামীণফোনের ম্যানেজমেন্টের সাথে মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বৈঠকের শ্রম কর্মকর্তাগন গ্রামীণফোনকে ভিআরএস (স্বেচ্ছা অবসর) নেওয়া কর্মীদের কি কি সুবিধা দেয়া হয়েছে তার সাপোর্টিং  ডকুমেন্ট দিতে বলা হয়েছে। তবে এজন্য কোনো সময় বেধা দেয়া হয়নি। 

এমন বাস্তবতায় বৈঠক শেষে এ ধরনের নথি চেয়ে সময় ক্ষেপণ করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন ভূক্তভোগীরা। তার বলছেন,  বৈঠকের মূল বিষয়ের সাথে অপ্রাসঙ্গিক। তাদের যুক্তি- ২০১০–১২ সালের ৫% মুনাফা বিলম্বে পরিশোধের কারণে সৃষ্ট আইনগত জরিমানা সব যোগ্য বেনেফিসিয়ারির কর্মীর ( সাবেক, বর্তমান)  জন্য প্রযোজ্য।

‘এছাড়াও হাইকোর্ট বা অন্য কোনো আদালত এই জরিমানা/সুদের দায় মওকুফ করেনি, রিট নিষ্পত্তির সময় বিলম্ব জরিমানা পরিশোধের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। অর্থাৎ আইনগত দায় আজও বহাল। গ্রামীণফোন আইনের প্রতি শ্রদ্ধার কথা বললেও বাস্তবে গড়িমসি, কালক্ষেপণ এবং আদালতের অজুহাত দেখিয়ে আলোচনার পথ বন্ধ করে শ্রমিকদের তার অধিকার বঞ্চিত করছে,- যোগ করেন এক দশকেরও বেশি সময় ধরেন কর্মীদের দাবি আদায়ে আদালত ও মাঠে সোচ্চার গ্রামীণফোনের সাবেক কর্মী আদিবা জেরিন। 

তিনি আরও বলেন, হাইকোর্ট বা অন্য কোনো আদালত এই জরিমানা/সুদের দায় মওকুফ করেনি, রিট নিষ্পত্তির সময় বিলম্ব জরিমানা পরিশোধের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। অর্থাৎ আইনগত দায় আজও বহাল। গ্রামীণফোন আইনের প্রতি শ্রদ্ধার কথা বললেও বাস্তবে গড়িমসি, কালক্ষেপণ এবং আদালতের অজুহাত দেখিয়ে আলোচনার পথ বন্ধ করে শ্রমিকদের তার অধিকার বঞ্চিত করছে।

আদিবা জানান, প্রায় ৬ মাস আগে শ্রম উপদেষ্টার নির্দেশনায়, গত ২৩ সেপ্টেম্বর শ্রম সচিবের সাথে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তার নেতৃত্বে ত্রিপাক্ষিক আলোচনায় দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হয়। ৩ নভেম্বর শ্রমিক পক্ষের সাথে মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে শ্রমিক পক্ষ থেকে সকল প্রয়োজনীয় নথি সহ দাবির ন্যায্যতা তুলে ধরা হয়। আদালতের দীর্ঘসুত্রিতা এড়াতে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে এই পদক্ষেপ নেয়া হলেও এখানেও গ্রামীণফোন সময়ক্ষেপণের কৌশল জারি রেখেছে।

এদিকে শুধু শ্রমিক নয় প্রতিযোগিতা কমিশনেও আদালত-বনাম শালিস টানাটানিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারকারী গ্রামীণফোন। অপারেটরটির বাজারে আধিপত্যের অপব্যবহার, বৈষম্যমূলক মূল্য নির্ধারণ বা প্রতিযোগিতা-বিরোধী আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা কমিশনে বিচার দিয়েছে অপর অপারেটর রবি ও বাংলালিংক। সেই নালিশের বিপক্ষে আরজি করলে তা খারিজ করে দিয়ে বিচারের মুখোমুখি করার কথা ছিলো প্রভাবশালী এই কোম্পানিটির। তবে অজ্ঞাত কারণে টেলিযোগাযোগ খাতে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগের তদন্ত থেমে গেছে। 

কেননা, প্রতিযোগিতা কমিশনের ওই তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে হাইকোর্টে গিয়েছে গ্রামীণফোন। হাইকোর্ট অপারেটরটির বিরুদ্ধে চলা তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত করেন। এরআগে গ্রামীণফোনের প্রতিযোগিতাবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ে রবির করা অভিযোগের প্রেক্ষিতে মামলা নিয়ে তা তদন্ত করছিল বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন।

গ্রামীণফোন হাইকোর্টে করা মামলায় বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তের এখতিয়ার চ্যালেঞ্জ করে। বিচারপতি ফয়েজ আহমেদ ও বিচারপতি মোঃ মনজুর আলম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সম্প্রতি এই আদেশ দেন। আদালতের আদেশের ফলে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা কমিশনের সব তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত থাকবে।

তবে বকেয়া ফি, রাজস্ব শেয়ার ও সুদের ভিত্তিতে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি’র বকেয়া ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা আদায়ে যখন আদালতে যায় তখন তা দীর্ঘমেয়াদি অডিট বিরোধ হিসেবে সালিশির মাধ্যমে নিষ্পত্তির জন্য গত নভেম্ব মাসেই আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে অপারেটরটি। বিষয়টিকে গ্রামীণফোনের দ্বিচারিতা হিসেবে মনে করেন পর্যবেক্ষক মহল। 

ডিবিটেক/আইএইচ/ওআর