এনটিএমসি বিলুপ্ত করে নতুন টেলিকম আইন পাস
অবশেষ নতুন টেলিকম যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২৪ ডিসেম্বর বুধবার বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশ ২০২৫' এ চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। দুপুরে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে এই অনুমোদন দেন প্রধান উপদেষ্টা ড: মুহাম্মদ ইউনূস। উপদেষ্টা পরিষদের ৫২তম বৈঠকে অনুমোদিত এ সংশোধনের মাধ্যমে ইন্টারনেট বন্ধের সুযোগ রহিত করা, নজরদারিতে আইনি সুরক্ষা জোরদার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ঘোষণা এসেছে।
এজন্য নতুন টেলিকম আইনে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশটি পাশের জন্য টেবিলে উপস্থাপন করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে মনোনীত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারি ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। এসময় ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব আব্দুন নাসের সভায় উপস্থিত ছিলেন।
নতুন এই আইন টেলিযোগাযোগ খাতকে আধুনিকীকরণ, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ৫জি ও ক্লাউড সেবার প্রসার, ইন্টারনেট শাটডাউনের উপর বিধিনিষেধ আরোপ এবং ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির জন্য আনা হয়েছে। একই সঙ্গে সংশোধিত অধ্যাদেশে ইমেজ ও ভয়েস প্রটেকশন, সিম ও ডিভাইস ডেটা সুরক্ষার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। পুরো কাঠামো জাতিসংঘ ও আইটিইউসহ আন্তর্জাতিক উত্তম অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে।
এতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি যুগোপযোগী নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এই অধ্যাদেশের খসড়া জনসাধারণের মতামতের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে এবং এটি বিদ্যমান আইন ও নীতির অনেক মৌলিক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করছে খাত সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে গত ৪ সেপ্টেম্বর টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক এবং লাইসেন্সিং পলিসি ২০২৫ অনুমোদন দেয়া হয়েছিলো। জানাগেছে, বিকেলে ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংস থেকেবৈঠক বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
পরে সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, নতুন এই আইনে ২০১০ সালের বিতর্কিত সংশোধনী কাঠামো থেকে সরে এসে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এর স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, আজ টেলিযোগাযোগ খাতে দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও উদ্বেগের অবসান ঘটিয়ে নাগরিক অধিকার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং জবাবদিহিতাকে প্রাধান্য দিয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ লাইসেন্স অনুমোদন হবে স্বাধীন স্টাডির ভিত্তিতে। আর অন্যান্য লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষমতা পুরোপুরি বিটিআরসির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির নেতৃত্বে একটি ‘জবাবদিহিতা কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে ।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সংশোধিত অধ্যাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- কোনো পরিস্থিতিতেই ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধ করা যাবে না**—এমন সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত করা হয়েছে (ধারা ৯৭)। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
পাশ হওয়া টেলিকম আইনের গুরুত্বপূর্ণ দিক
বিটিআরসির স্বাধীনতা ও জবাবদিহি জোরদার
২০১০ সালের বিতর্কিত সংশোধনী কাঠামো থেকে সরে এসে **বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)**–এর স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ লাইসেন্স অনুমোদন হবে স্বাধীন স্টাডির ভিত্তিতে, আর অন্যান্য লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষমতা পুরোপুরি বিটিআরসির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির নেতৃত্বে একটি **‘জবাবদিহিতা কমিটি’** গঠনের বিধান রাখা হয়েছে ।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও দ্রুত লাইসেন্সিং
সংশোধিত আইনে লাইসেন্স আবেদনের শুরু থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যন্ত সময়সীমা কমানো হয়েছে। অতিরিক্ত উচ্চ জরিমানা ও রি-শেয়ারিং জরিমানাও হ্রাস করা হয়েছে, যা টেলিযোগাযোগ খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে ।
গণশুনানি বাধ্যতামূলক, স্বার্থের সংঘাত রোধ
এখন থেকে প্রতি চার মাস অন্তর বিটিআরসিকে গণশুনানি আয়োজন করতে হবে। এবং তার ফলাফল ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ ঠেকাতে আইনি বিধান যুক্ত হয়েছে (ধারা ৮৭) ।
নজরদারিতে কঠোর আইনি সুরক্ষা
সিম ও ডিভাইস রেজিস্ট্রেশনের তথ্য ব্যবহার করে কোনো নাগরিককে বেআইনি নজরদারি বা হয়রানি করলে তা **শাস্তিযোগ্য অপরাধ** হিসেবে গণ্য হবে (ধারা ৭১)। একই সঙ্গে “Speech Offence” সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করে কেবল **সহিংসতার আহ্বান**কেই অপরাধের আওতায় রাখা হয়েছে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে (ধারা ৬৬ক) ।
ইন্টারসেপশনে নতুন কাঠামো, এনটিএমসি বিলুপ্ত
নতুন আইনে আইনানুগ ইন্টারসেপশন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে ‘সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট (CIS)’ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। এ কেন্দ্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে এবং কেবল বিচারিক বা জরুরি আইনানুগ ইন্টারসেপশনের ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তা দেবে। CIS নিজে কোনো ইন্টারসেপশন পরিচালনা করতে পারবে না এবং রোল-বেইজড অ্যাকসেস কন্ট্রোল ও আধা-বিচারিক কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়া কোনো কার্যক্রম চলবে না। এর ফলে আগের *ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (NTMC) বিলুপ্ত করা হয়েছে ।
সংসদীয় ও আধা-বিচারিক তদারকি
আইনানুগ ইন্টারসেপশনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আধা-বিচারিক কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে, যেখানে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সভাপতি থাকবেন। একই সঙ্গে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রতি বছর একটি জাতীয় প্রতিবেদন প্রকাশ করবে, যাতে ইন্টারসেপশনের ক্ষেত্র ও পরিসংখ্যান তুলে ধরা হবে ।
আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য
সংশোধিত অধ্যাদেশে ইমেজ ও ভয়েস প্রটেকশন, সিম ও ডিভাইস ডেটা সুরক্ষার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। পুরো কাঠামো জাতিসংঘ ও আইটিইউসহ আন্তর্জাতিক উত্তম অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে বলে প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয় ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংশোধনীর মাধ্যমে একদিকে যেমন নাগরিকের ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে টেলিযোগাযোগ খাতে স্বচ্ছতা, বিনিয়োগ ও আস্থার নতুন অধ্যায় শুরু হবে।
সংস্করণ**ও করে দিতে পারি।
ডিবিটেক/আইএইচ







