ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচারে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে নির্বাচনী প্রক্রিয়া
বাংলাদেশে আগামী বছরের জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনীতি সংক্রান্ত ভুয়া তথ্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে সতর্ক করে ‘অপতথ্য’ মোকাবিলায় ফ্যাক্ট চেকার ও সাংবাদিকদের নিয়ে অরাজনৈতিক একটি ফোরাম গঠনের সুপারিশ করেছে ডিজিটালি রাইট। প্রতিষ্ঠানটির শঙ্কা- ভুয়া তথ্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচার নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিতে পারে। তাই ফ্যাক্ট চেকিং প্রশিক্ষণ জোরদারের পাশাপাশি ফ্যাক্ট চেকারদের সঙ্গে নির্বাচন পর্যবেক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে ডিজিটাল অধিকার ও তথ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।
এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহায়তায় পরিচালিত জরিপ পরবর্তী ‘ট্যাকলিং ইলেকশন ডিসইনফরমেশন ইন বাংলাদেশ: বিল্ডিং কালেকটিভ রেসপন্সেস ফর ইলেক্টোরাল ইন্টেগ্রিটি’ শিরোনামের গবেষণাপত্রের ওপর মুক্তআলোচনায় এই আহ্বান জানানো হয়। ২ নভেম্বর, রবিবার রাজধানীর এক হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
অনুষ্ঠানে আই সোশ্যালের চেয়ারপারসন অনন্য রায়হান, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) মিডিয়া স্টাডিজ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সুমন রহমান, দৈনিক প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন, এফসিডিওর গভর্ন্যান্স অ্যাডভাইজার এমা উইন্ড, দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সিরাজ, এবং ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী।
আলোচকদের সবাই অপতথ্যের বিষয়ে এখই সোচ্চার হওয়া আহ্বান জানান। এদের মধ্যে ভুল তথ্য মোকাবিলা করার জন্য ফেসবুক এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মকে জবাবদিহিতার অধীনে আনার দাবি তুলেন ফ্যাক্টওয়াচ পরিচালক সুমন রহমান।
তিনি বলেন, “ভুল তথ্য মোকাবেলা করার জন্য ফেসবুক এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। সরকারকে প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে আলোচনা করতে হবে এবং তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সরকারের প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর প্রভাব খাটানোর মতো অবস্থা নেই, এবং আগের সরকারের এই সংক্রান্ত ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে তারা আলোচনার সব ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে।”
গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে শওকত হোসেন বলেন, "প্রচলিত গণমাধ্যমের তথ্য যাচাই করার গতানুগতিক পদ্ধতি আর কাজ করবে না। এই গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে তাদের ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের ওপর নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের দরকার আছে।”
তিনি আরোও বলেন, "এআই এর দ্রুত অগ্রগতির কারণে আমাদের সামনে একটা বড় চ্যালেঞ্জ আছে, এবং সম্ভবত ফ্যাক্ট-চেকারদের পক্ষে এই অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়বে।"
বাংলাদেশের নির্বাচনে নজিরবিহীন ভুয়া তথ্যঝুঁকি: ডিজিটালি রাইটের নতুন গবেষণা সতর্কবার্তা
আলোচনরা শুরুতেই গবেষণা প্রতিবেদনের বিস্তারিত তুলে ধরেন ডিজিটালি রাইটের গবেষণা প্রধান তিতির আব্দুল্লাহ। গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে অনলাইনে জনপরিসর ভীষণভাবে ভঙ্গুর ও বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের শেষ ভাগ থেকে ভুয়া রাজনৈতিক তথ্য ছড়ানোর মাত্রা বাড়তে থাকে। তা মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে তা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা, সামাজিক স্থিতি এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে।
নির্বাচন ঘিরে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির ডিজিটাল প্রচার বেড়ে যাওয়ার দিকটি তুলে ধরে গবেষণাপত্রে বলা হয়, তাতে সমর্থকদের চাঙা করতে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্যও ছড়ানো হচ্ছে। আর এই ভুয়া তথ্য ছড়ানোর জগতে বড় উপস্থিতি রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ অবস্থায় থাকা আওয়ামী লীগের।
ডিজিটালি রাইট বলেছে, রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি ধর্মীয় গোষ্ঠী, বিদেশি ও প্রবাসী একটি অংশও একধরনের ডিজিটাল প্রতিযোগিতায় নেমেছে। যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর কনটেন্ট, প্রোপাগান্ডা নেটওয়ার্ক এবং বাণিজ্যিক কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিকৃত ছবি, মনগড়া ভিডিও ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি কনটেন্ট নারী প্রার্থী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা নির্বাচনের আগে ভয়ভীতি, হয়রানি ও ভোটার দমন বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ভুয়া খবর এখন দেশকে অস্থিতিশীল করার বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, সরকারি এক কর্মকর্তার এমন মন্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণাপত্রে।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর প্রস্তুতি আশঙ্কাজনকভাবে দুর্বল বলে দাবি করা হয় ডিজিটালি রাইটের গবেষণাপত্রে। ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশে ফ্যাক্ট চেকার সংখ্যার অপ্রতুলতা তুলে ধরে বলা হয়, প্রাতিষ্ঠানিক ফ্যাক্ট চেকারের সংখ্যা ৪০ থেকে ৫০ জন। অধিকাংশ মূলধারার গণমাধ্যমে ফ্যাক্ট চেকার নেই। সাংবাদিক ও ফ্যাক্ট চেকারদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি কৌশল যেমন নেই, আবার তাঁদের মধ্যে সমন্বয়েরও অভাব রয়েছে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়, নির্বাচন কমিশনেরও এই ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য পর্যাপ্ত নীতি-কাঠামো, দক্ষতা ও সক্ষমতা নেই। নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও নাগরিক সমাজেরও ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ চালানোর কোনো উদ্যোগ নেই।
তিতির আব্দুল্লাহ মূল ফলাফল তুলে ধরে বলেন, “নির্বাচনকে সামনে রেখে খুব অল্প সময়ের মধ্যে বেশ কিছু বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে, যেগুলোতে বিভিন্ন সংজ্ঞা পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়নি বা এর অপব্যবহার রোধের জন্য কোনো সুরক্ষাব্যবস্থাও রাখা হয়নি। এ থেকে বোঝা যায় যে, স্টেকহোল্ডারদের সাথে যথেষ্ট আলোচনা করা হয়নি, যা আইনগুলোর যথেচ্ছ প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে। এ ধরনের বিধিমালা ব্যবহার করে বৈধ সমালোচনা ও ভিন্নমতকে দমন করা হচ্ছে, যেমনটা আমরা অতীতের আইনগুলোর ক্ষেত্রেও দেখেছি। মানবাধিকারের ওপর এর প্রভাব যাচাই করতে এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সুরক্ষার ব্যবস্থা করার জন্য, যেকোনো বিধিমালা গ্রহণের আগে অংশীজনদের সাথে প্রয়োজনীয় আলোচনা করা উচিত।”







