৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীসহ জাপানে এক লাখ কর্মী পাঠাতে চায় বাংলাদেশ
শিক্ষার্থীদের অভিবাসনেও সহজ ব্যাংক ঋণ দাবি
শ্রমিক পাঠাতে অতিরিক্ত আর্থ আদায় করে জাপানি সিন্ডিকেট এজেন্সি। এই সিন্ডিকেট ভেঙ্গে প্রতিবছর ১ লাখ শ্রমিক জাপানে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে জাপান সেল। এর মধ্যে ৩০ শতাংশই হবেন শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্ট মাইগ্রেশন সহজতর করার পাশাপাশি তাদেরকে জাপানি ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ব্যাংক ঋণ সুবিধা চালুর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
১৮ আগস্ট, সোমবার রাজধানীর জাতীয় আর্কাইভসের সম্মেলন কক্ষে 'জাপানে উচ্চশিক্ষা ও কর্মী প্রেরণের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক সেমিনারে এই পরামর্শ দেন বক্তারা।
অ্যাসোসিয়েশন অব জাপানিজ ল্যাঙ্গুয়েজ ইনস্টিটিউটস ইন বাংলাদেশের (আজলিব) উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে দক্ষতার উপর জোর দিয়ে প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, দেশের লোকজন দক্ষ না হয়ে দেশের বাইরে গিয়ে কম বেতনে কাজ করেন। এতে তারা নিজেদের খরচ চালাতে হিমশিম খান। ফলে তারা বাড়তি আয়ের জন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে কথা বললে তারা তেমন একটা সাড়া দেন না।
তিনি আরো বলেন, দেশের লোকজনকে দক্ষ না বানিয়ে অতিরিক্ত অর্থ নিয়ে জাপানে পাঠাচ্ছে আদম ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট। এসব শ্রমিক বাইয়ে গিয়ে কম বেতনে কাজ করেন। এতে তারা নিজেদের খরচ চালাতে হিমশিম খান। ফলে তারা বাড়তি আয়ের জন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়েন।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচোর একটি দেশের মন্ত্রীর বরাত দিয়ে এই উপদেষ্টা জানান দেশটিতে মোট বিদেশী বন্দিদের ২৫ শতাংশই বাংলাদেশী। জাপানের শ্রমবাজার নিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ দূত বলেন, অনেক সময় আমরা একটু তাড়াহুড়া করে ফেলি, কয় হাজার পাঠাতে পারব কালকের মধ্যে। যে কারণে হয়তো মধ্যপ্রাচ্যের এখন কয়েকটা দেশে আমাদের অসুবিধা হচ্ছে।
এছাড়া বাংলাদেশ থেকে জাপানে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) সঙ্গে সভাার প্রসঙ্গ টেনে দেশটিতে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় নেপালের কর্মীরা বেশি যাওয়ার সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন লুৎফে সিদ্দিকী। তিনি বলেন, 'আমাদের একটা ইন্টেনশনের অভাব বা একটা রেপুটেশনের প্রবলেম, তখন দেখা যায় যে নেপালের সাথে আমাদের গ্যাপটা খুবই বেশি। গ্যাপটা আসলে রেপুটেশনের। যেই কারণে হয়তো ওদের (নেপাল) ভিসা রেট হয়, আমাদের ক্ষেত্রে হয়তো ভিসাটা কম দেয়া হয়। তো রেপুটেশনটা ইম্পর্টেন্ট।'
বাংলাদেশ থেকে জাপানে কর্মী পাঠানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যাত্রা সহজ করতে ব্যাংক ঋণ এবং অন্যান্য করনীয় বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, 'আমাদের পক্ষ থেকে সরকারের পক্ষ থেকে কিভাবে সাহায্য করা যায় সেটা আমরা চেষ্টা করছি।'
টপ জে বাংলাদেশ ও বিডিজবস এর সহযোগিতায় সেমিনারে এসময় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাপান সেলের প্রধান শহীদুল ইসলাম চৌধুরী, পলিসি অ্যাডভাইজার জিয়া আহসান, বিডার হেড অব বিজনেস ডেভেলপমেন্ট নাহিয়ান রহমান রুচি, বিডি জবসের সিইও ফাহিম মাশরুর ও জুমে যুক্ত ছিলেন জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত দাউদ আলী।
বক্তব্যে দক্ষ শ্রমিকদের ব্যপারে জোর দিয়ে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত দাউদ আলী বলেন, জাপানের জন্য আমাদের দক্ষ শ্রমিক তৈরী করতে হবে। যারা পরীক্ষা দিচ্ছে তারা যেন শতভাগ পাশ করেন। তা হলে জাপানের কোম্পানিগুলো থেকে চাওয়া শ্রমিক কোটা খালি থাকবে না। যারা পরীক্ষা দিচ্ছে যাতে তারা যেন পাশ করেন। তাইলে আমাদের সিট খালি থাকবে না। একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পেলে আরও আগ্রহী হবে। জাপানের সঙ্গে কথা বলে আমরা শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি পরিশোধে সহজ পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। সরকার আগামী বছর ১০ হাজার শিক্ষার্থী নেয়ার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবো। জাপান ও শ্রমিক-শিক্ষার্থী নিতে আগ্রহী। তবে আমাদের শ্রমিকরা যেন প্রশিক্ষিত করে তৈরী করা হয়।
তিনি আরও বলেন, জাপানের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ পেলে তারা আরও আগ্রহী হবে। জাপানের সঙ্গে কথা বলে আমরা শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি পরিশোধে সহজ পদ্ধতি অবলম্বন করেছি। সরকার আগামী বছর ১০ হাজার শিক্ষার্থী নেয়ার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবো। জাপানও শ্রমিক-শিক্ষার্থী নিতে আগ্রহী।
বিশেষ অতিথি গালির শাহরিয়ার বলেন, ২০১৮ সাল আজলিবের যাত্রা শুরু হলেও সরকার আমাদের সহযোগী ছিল না। কিন্তু সম্প্রতি আমরা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা কামনা করি। আমরা চাই, সরকার আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা করুক।
অনুষ্ঠানে ফাহিম মাশরুর বলেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে স্টুডেন্ট ভিসায় গুরুত্ব দিতে হবে। ব্যাংকগুলো দেশে উদ্যোক্তাদের লোন দিতে পারলে বিদেশগামীদের দিতে পারবে না কেন? তারাওতো এক প্রকার উদ্যোক্তা। দেশের অর্থনীতির চাকা স্বচলে তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স বড় ভুমিকা রাখে। আমরা প্রত্যাশা করি ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের ৫-৭ লাখ টাকা ঋণ দিবে।
জাপান সেলের পলিসি অ্যাডভাইজার জিয়া আহসান বলেন, জাপানে শ্রমিক প্রেরণে আগে কাজ হয়নি। বর্তমান সরকার জাপানে জনবল পাঠানোর জন্য মার্কেটিং এর কাজ করছে। ফলাফল হিসেবে নতুন করে ৪০ কোম্পানি শ্রমিক নিতে আমাদের সাথে কাজ করছেন। আগামী বছর থেকে আমরা ১ লক্ষ শ্রমিক শিক্ষার্থী প্রেরণ করবো। এতে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি হবে।
বিকেল ৪টার দিকে আতীয় আর্কাইভ অডিটোরিয়ামে জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এর আগে জুলাই আন্দোলনে হতাহতদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়। সেমিনারটি সভাপতিত্ব করেন আজলিব সভাপতি মো. ওয়াকিল আহেমদ। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম। ওয়াকিল আহমেদ বলেন, দুই দশক ধরে আমরা আপানে কাজ করি। দেশটিতে বাংলাদেশিদের পাঠানো নিয়ে কোনো অভিভাবক পাচ্ছিলাম না। সেই অভাব পূরণ করে আদম ব্যবসায়ীদের দৌরত্ম্য রূখতেই আমাদের এই উদ্যোগ।



