ভোটে এনসিপি ছাড়া সবার জনপ্রিয়তা কমছে

নির্বাচনের আগেই সংস্কার চায় ৫১ শতাংশ মুঠোফোন ব্যবহারকারী

নির্বাচনের আগেই সংস্কার চায় ৫১ শতাংশ মুঠোফোন ব্যবহারকারী
১১ আগষ্ট, ২০২৫ ১৫:৪১  
১১ আগষ্ট, ২০২৫ ১৭:৩৭  

বর্তমানে দেশের ৪৫ শতাংশ মুঠোফোন ব্যবহারকারী মনে করছেন অর্থনৈতিক ভাবে দেশ সঠিক পথে এগুচ্ছে। আর ৪২ শতাংশের মত রাজনীতির সঠিক পথেই আছে বংলাদেশ। তবে ১৮ মাসের ব্যবধানে ১৩ শতাংশ অর্থনৈতিক উন্নতি হলেও রাজনৈতিক পথের উন্নতি হয়েছে মাত্র ১ শতাংশ। ২০২৪ সালের অক্টোবরে যেখানে ৫০ শতাংশ মানুষ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে উৎকণ্ঠিত ছিলেন জুলাই ২০২৫ সালে এসে সর্বাধিক ১৮ শতাংশ নাগরিকের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে দেশে নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতি। একইভাবে অন্তর্বর্তী সরাকের ওপর  থেকে সন্তুষ্টিও এই সময়ে ১২ শতাংশ কমেছে।  

এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আগেই সংস্কার চায় ৫১ শতাংশ মুঠোফোন ব্যবহারকারী নাগরিক। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সংস্কার প্রত্যাশা করেন সর্বাধিক ৩০ শতাংশ। পাশাপাশি মব সহিংসতায় উৎকণ্ঠিত ৮০ শতাংশ মানুষ। 

চলমান বাস্তবতায় ৭০ শতাংশ মানুষ যখন সুষ্ঠু নির্বাচনে আশাবদী; তখন গত ৯ মাসে আসন্ন ভোটে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র পক্ষে সমর্থন কমেছে ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশ জামায়েতে ইসলামির কমেছে দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যান্য ইসলামিক দলের কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। একইভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের কমেছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। জাতীয় পার্টির কমেছে দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যান দলগুলোর কমেছে ৪ দশমিক ১ শতাংশ। তবে নতুন দল এনসিপি’র বেড়েছে  দশমিক ৮ শতাংশ।  

তবে ‘কোন দলকে ভোট দেবেন’ জরিপের এমন প্রশ্নে এখনও সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ফোন সাক্ষাৎকার ভিত্তিক জরিপে অংশগ্রহণকারীদের  ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ।  যৌথভাবে এই জরিপ পারিচালনা করেছে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) ও ভয়েস ফর রিফর্ম।  রাজধানীর আগারগাঁও জাতীয় আর্কাইভ মিলনায়তনে ১১ আগস্ট, সোমবার প্রকাশ করা হয় এই ‘ডিআইজিডি পালস সার্ভে’।  

অনুষ্ঠানে জরিপের সার্বিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন বিআইজিডির ফেলো সৈয়দা সেলিনা আজিজ। 

ভয়েস ফর রিফর্মের কো-কনভেনার এ কে এম ফাহিম মাশরুরের সভাপতিত্বে ও বিআইজিডি এর অপারেশনস, স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পার্টনারশিপের পরিচালক মেহনাজ রব্বানীর সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিআইজিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মিরাজ এম হাসান ও আসিফ শাহান।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গণঅভ্যুত্থানের পর তৃতীয় বারের মতো এই জরিপ পরিচালনা করা হলো। ২০২৫ সালের থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত পরিচালিত এক ফোন জরিপের মাধ্যমে দেশের সব জেলা থেকে মোট ,৪৮৯ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়যার মধ্যে পুরুষ ৫৩% এবং নারী ৪৭% জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে গ্রামীণ জনসংখ্যা ৭৩% এবং শহুরে জনসংখ্যা ২৭%

সংস্কার নির্বাচন প্রসঙ্গে জনমত

জরিপে অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই নির্বাচনের পাশাপাশি সংস্কারের জোরালো দাবি জানায়, কোনো একটিকে অন্যটির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়নি। অংশগ্রহণকারীদের ৩২% বলেছে তারা চায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। ১২% মনে করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন হওয়া উচিত। অন্যদিকে, ২৫% বলেছে নির্বাচন ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের পর হওয়া উচিত। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু হবে কিনা প্রশ্নে ৭০% অংশগ্রহণকারী ইতিবাচক উত্তর দিয়েছে আর ১৫% মনে করে নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হবে না।

তাদের ভোট কার পক্ষে দেবেন প্রশ্নে ৪৯% জানিয়েছে তারা এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। ২০২৪ সালের অক্টোবরের জরিপে এটি ছিল ৩৮% নারী অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সিদ্ধান্তহীনতার হার পুরুষদের তুলনায় বেশি, যেখানে ৫৫% নারী জানিয়েছে তারা এখনো নিশ্চিত না কাকে ভোট দেবে; যা ২০২৪ সালের অক্টোবরে ছিল ৪৩%

জরিপে দেখা গেছে প্রচলিত অভিজাত জনমতের বিপরীতে সাধারণ মানুষ সংস্কার সম্পর্কে সচেতন এবং আগ্রহী। সংস্কার নিয়ে মতামত জানতে চাইলে ৫১% অংশগ্রহণকারী জানায়, প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের পর নির্বাচন হওয়া উচিত। ১৭% মনে করে নির্বাচনের আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার এজেন্ডা চাল করা উচিত। অন্যদিকে, ১৪% বলেছে সংস্কার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন করা উচিত নয়। আর ১৭% জানিয়েছে তারা সংস্কার বিষয়ে তাদের ধারণা নেই বা বিষয়ে তাদের কোনো মন্তব্য নেই।

কোন ধরনের সংস্কার তারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে প্রশ্নে ৫৭% অংশগ্রহণকারী পুলিশ বিচারব্যবস্থার পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন (৩০%), বিচারব্যবস্থার উন্নয়ন (১৬%) এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ (১১%) অন্যদিকে, ৩৯% অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে, যেমন অর্থনৈতিক মন্দা ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা (১৬%), নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য হ্রাস (১৩%), এবং বেকারত্ব কমানো (১০%) অন্য ৩৮% মানুষ নির্বাচনী সংবিধান সংক্রান্ত সংস্কারের কথা বলেছে। এর মধ্যে ১৯% নির্বাচনী সংস্কার এবং ১৯% রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা অস্থিরতা কমানোর কথা উল্লেখ করে। এছাড়া ১৭% দুর্নীতি দমনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং ১৪% শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

 

রাজনীতি অর্থনীতি বিষয়ে জনগণের মনোভাব

 দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ২০২৪ সালের আগস্টে যে আশাবাদ ছিল তা ধীরে ধীরে কমছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ৪২% অংশগ্রহণকারী মনে করে দেশ সঠিক রাজনৈতিক পথে এগোচ্ছে, অথচ ২০২৪ সালের অক্টোবর আগস্টে এটি ছিল যথাক্রমে ৫৬% এবং ৭১% অন্যদিকে, দেশের অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে জনমনে সামান্য উন্নতি দেখা গেছে; ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এসে ৪৫% অংশগ্রহণকারী মনে করে আমরা সঠিক পথে আছি, যা ২০২৪ সালের অক্টোবরে ছিল ৪৩%

লক্ষণীয় যে, দেশের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়েজানি নাবামন্তব্য নেইউত্তরদাতার হার ২০২৪ সালের অক্টোবরে ছিল ১০%, সেখান থেকে বেড়ে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে হয়েছে ২৩% একইভাবে, অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা সম্পর্কে এই উত্তরদাতার একই মতামত ২০২৪ সালের জরিপে ছিল  %, সেখান থেকে বেড়ে ২০২৫ সালের জরিপে হয়েছে ১৮%

শাসনব্যবস্থা, অর্থনীতি নিরাপত্তা এখন জনগণের প্রধান উদ্বেগ

দেশের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে ২০২৪ সালের অক্টোবরের জরিপের তুলনায় এবার উত্তরগুলো ছিল আরও বৈচিত্র্যময়। সেই সময় ৫০% অংশগ্রহণকারী মূল্যবৃদ্ধিকেই প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ১৮% নির্বাচিত সরকারের অনুপস্থিতিকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং মাত্র ১৫% ব্যবসা বা অর্থনৈতিক মন্দাকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছে। অন্যদিকে, ১৪% আইনশৃঙ্খলার অবনতিকে, ১৩% রাজনৈতিক অস্থিরতা অসহিষ্ণুতাকে, এবং % মূল্যবৃদ্ধিকে প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কার্যক্রমের মূল্যায়ন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমে এসেছে২০২৪ সালের আগস্টে ৭৫% থেকে অক্টোবরে ৬৮% এবং ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আরও কমে ৬৩% হয়েছে। এই নিম্নগামী প্রবণতার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের 

কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় ছিল মব ভায়োলেন্স, যেটাকে ৮০% মানুষ সমস্যার কারণ হিসেবে দেখেছে। এছাড়া ৬৭% উত্তরদাতারা পোশাকের কারণে হয়রানিকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে, ৬১% রাতের বেলায় চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, এবং ৫৬% নারী নিরাপত্তার অবস্থা খারাপ বলে মন্তব্য করেছে।

তরুণ নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক দল নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

জুলাই বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল সম্পর্কে জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তরুণদের গঠিত রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে কিনা প্রশ্ন করা হলে ৪৫% উত্তরদাতা ইতিবাচক উত্তর দিয়েছে, ৪৬% বিরোধিতা করেছে এবং % অনিশ্চিত ছিল। একইভাবে, দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো টিকে থাকবে কিনা জিজ্ঞেস করলে ৩৮% জানায় তারা বিশ্বাস করে তা টিকে থাকবে, ৩৬% মনে করে টিকে থাকবে না, এবং ২৬% অনিশ্চিত বা মন্তব্য করতে অনিচ্ছুক ছিল।

যারা বিশ্বাস করে তরুণ নেতৃত্বাধীন দলগুলো টিকে থাকবে তাদের ধারণার পেছনের কারণগুলো হলো: নতুন এবং উদ্ভাবনী চিন্তাশক্তি (২৭%), জুলাই বিপ্লব থেকে উদ্ভূত নেতৃত্ব (২৫%), ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা (২৪%), সাহস (২৩%) এবং সততা (২০%) অন্যদিকে, যারা মনে করে দলগুলো টিকে থাকতে পারবে না, তারা কারণ হিসেবে অভিজ্ঞতার অভাব (৫৩%), যোগ্য নেতৃত্বের অভাব (১৮%), ভোটারদের আস্থাহীনতা বা জনসমর্থনের ঘাটতি (১৫%), রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি, এবং সাংগঠনিক দুর্বলতাকে উল্লেখ করেছে।