বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়: মেধা না স্বজনপ্রীতি?

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়: মেধা না  স্বজনপ্রীতি?
৪ আগষ্ট, ২০২৫ ০১:৫৫  
৪ আগষ্ট, ২০২৫ ১০:৩৯  

শিক্ষক নিয়োগে মেধার চেয়ে স্বজনপ্রীতি যেন গিলে খেতে বসেছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে। অভ্যুত্থান পরবর্তী নাম বদলের পরও পুরোনো ছকেই চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের  বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের কাজ।

অভিযোগ উঠেছে স্বজনদের চাকরিতে যোগ্য করতে চাকরির শর্ত ভঙ্গ করেও ক্ষান্ত হননি সংশ্লিষ্টরা। অযোগ্যকে যোগ্য বিবেচনায় সিন্ডিকেট নাটক মঞ্চস্থ করেও ফেঁসে গেছে নিয়োগ বোর্ড। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২ জুন, রবিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও ড্যাবের নেতা ডা. নজরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিটির মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়েছেন বিতর্কিত প্রার্থী ডা. মিলিভা। তবে তিনি বগুড়া মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও ড্যাবের কেন্দ্রীয় নেতা ডা. মোহাম্মদ টিপু সুলতানের স্ত্রী হওয়ায় অযোগ্য হয়েও নিয়োগ পেতে যাচ্ছেন বলে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। 

তবে রেজিস্ট্রার ডা. নজরুল ইসলাম এই শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে এই প্রতিবেদককে বলেছেন, তার (মিলিভা) বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ খতিয়ে দেখতেই আজ তাকে ডাকা হয়েছিলো। তিনি তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

জেরায় কী পেলেন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটাতো আপনাকে বলবো না। বিষয়টি আমরা লিখিত ভাবে জানিয়ে দেবো। 

অপর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, যোগ্য লোকের অভাবে নিয়োগ শর্ত শিথিল করা হয়েছিলো। আগামীতে আবারো পুরোনো নিয়মে নিয়োগ হবে। এই প্রক্রিয়ায় যদি কোনো অনিয়ম হয়ে থাকে প্রয়োজনে এটি বাতিল করে নতুন করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হবে। তবে এটুকু বলতে পারি, স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হবে।   

যোগ্যতায় ঘাটতি থাকার পরও অভিযুক্ত প্রার্থী কিভাবে এ পর্যন্ত এলেন তা অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ, সাবেক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়)-এর ৯৪তম সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষক নিয়োগের নিয়মাবলি শিথিল করে একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিএমইউ বাংলাদেশের চিকিৎসকদের স্নাতকোত্তর ডিগ্রী প্রদানকারী অন‍্যতম প্রধান মেডিকেল বিশ্ববিদ‍্যালয় হিসেবে প্রচলিত নিয়মে এর সকল বিভাগে অধ‍্যাপক ও সহযোগী অধ‍্যাপক নিয়োগে স্নাতকোত্তর কোর্স পরিচলনাকারী বিএমইউ এবং এর অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমূহে শিক্ষকতার পূর্ব-অভিজ্ঞতার থাকার শর্ত থাকলেও  ৯৪তম সিন্ডিকেট সভায় শুধুমাত্র বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি এবং ফার্মাকোলজি বিভাগের জন্য সে শর্ত তুলে দেওয়া হয়।

অথচ এমন অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অনেক শিক্ষক বিদ‍্যমান থাকা স্বত্ত্বেও কি কারণে শুধুমাত্র উক্ত দুই বিভাগে নিয়োগে শর্ত শিথিল করা হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ উঠেছে, কয়েকজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দিতে এই নিয়ম শিথিল করা হয়।

সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ২জন সহযোগী অধ্যাপক ও ২ জনঅধ্যাপক পদে নিয়োগের জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিএমইউ। কিন্তু পরে দেখা যায়, এই বিজ্ঞপ্তির শর্তও পূরণ না করে একাধিক প্রার্থীকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়। 

চলতি বছরের ৩১ মে ৯৬তম সিন্ডিকেট সভায় বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি বিভাগে চারজন শিক্ষককে নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়—অধ্যাপক ডা. নাসরিন চৌধুরী (এপোলো ইম্পেরিয়াল হসপিটাল, চট্টগ্রাম), অধ্যাপক ডা. রেজওয়ানুল হক (ডেল্টা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা), ডা. জেবা উন নাহার (গাজী মেডিকেল কলেজ, খুলনা) এবং ডা. মিলিভা মোজাফফর (মেডিকেল কলেজ ফর উইমেন অ্যান্ড হসপিটাল, ঢাকা)। উক্ত চারজনের প্রত্যেকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন, যা বিএমইউ অধিভুক্ত নয় এবং দেশের স্নাতকোত্তর চিকিৎসা শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট নয়।

এখানেই শেষ নয়। অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ডা. নাসরিন চৌধুরীর Google Scholar ও ResearchGate প্রোফাইল ঘেটে দেখা যায়, তার কোনো সাইটেশন নেই এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী ন‍্যুনতম সংখ‍্যক মানসম্মত তালিকাভুক্ত গবেষণা প্রকাশনা নেই। তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগের সদ‍্য সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোজাম্মেল হকের ঘনিষ্ঠজন বলে নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে অধ্যাপক ডা. রেজওয়ানুল হকও কোনো পোস্টগ্র্যাজুয়েট মেডিকেল প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেননি এবং তার ResearchGate প্রোফাইলে সাইটেশন ৯৩ ও h-index ৫।

সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত ডা. জেবা উন নাহার খুলনার বেসরকারী গাজী মেডিকেল কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। জানা যায়, তার স্বামী জামায়াতপন্থী চিকিৎসক সংগঠন এনডিএফ-এর নেতা এবং তিনিও বর্তমান উপাচার্যের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তার Google Scholar প্রোফাইলে দেখা যায়, মোট সাইটেশন মাত্র ৩৪, এবং h-index ৩—যা একই পদে অন‍্যান‍্য প্রার্থীদের তুলনায় অনেক কম বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় মূলতঃ তাকে নিয়োগের স্বার্থে বিএমইউ সিন্ডিকেট সংশ্লিষ্ট বিভাগে নিয়োগের শর্ত শিথিল করে।

অন্যদিকে ডা. মিলিভা মোজাফফর তার আবেদনপত্রে ২০১৭ সাল থেকেই সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ করার দাবি করেন, যদিও মেডিকেল কলেজ ফর উইমেনের নথি অনুসারে তিনি ২০১৭ সালে প্রভাষক ছিলেন এবং ২০২২ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারিতে এ পদে পদোন্নতি পান। Google Scholar অনুযায়ী তার সাইটেশন ১৬৮, এবং h-index ৫।

ফলে আবেদনে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা সম্পর্কে গুরুতর মিথ্যা তথ্য দিয়েও তিনি কীভাবে সহযোগী অধ্যাপক পদে মনোনীত হলেন তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, তার স্বামী বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠন ড্যাব-এর নেতা, বিএমইউ-এর বর্তমান রেজিস্ট্রার ডা. নজরুল ইসলামের আত্মীয় এবং বিভাগের সাবেক অধ‍্যাপক মোজাম্মেল হকের ঘনিষ্ঠজন।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, আলোচিত ডা. মিলিভা ২০২০ সাল থেকে সহকারী অধ্যাপক “চলতি দায়িত্বে” থাকা সময়কে কৌশলে “নিয়মিত পদ” হিসেবে আবেদনে উল্লেখ করেছেন—যা বিশ্ববিদ্যালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধিমালার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। বিষয়টি জানাজানি হলে কর্তৃপক্ষ তার নিয়োগ স্থগিত রাখে ও তার নথিপত্র যাচাই করার জন্য একাডেমিক কাউন্সিলে পাঠিয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত অন‍্যান‍্য সকলে ইতোমধ‍্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগে বিগত জুন মাসে যোগদান করে কাজ শুরু করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, অনেক যোগ‍্য প্রার্থী আবেদন করা স্বত্ত্বেও তাদের সাক্ষাৎকারে ডাকা হয়নি এবং কেন তাদের বাদ দেয়া হয়েছে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীগন ও শিক্ষকমহলের কেউই স্পষ্ট নন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এও জানা যায়, ডা. মোহাম্মদ আলী বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক পদে নিয়োগ বোর্ডে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তিনি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করেন এবং সেখানে পোস্টডক্টোরাল গবেষক হিসেবে কর্মরত। তিনি এর পূর্বে বিএমইউ-এর বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং সহকারী অধ্যাপক পদে তার ৫ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার Google Scholar প্রোফাইলে সাইটেশন ৩১১২, h-index ১৭ এবং i10-index ২০। তার গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে Nature, Science, Cell ও Lancet-এর মতো আন্তর্জাতিক জার্নালে। সাক্ষাৎকারে ডাক পাওয়া অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক প্রার্থীদের মধ্যে তিনি একমাত্র পিএইচডি সম্পন্ন করা প্রার্থী ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী পিএইচডি ডিগ্রি অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রয়োজনীয় সকল যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ৯৬তম সিন্ডিকেট সভায় তাকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম যোগ‍্যতাসম্পন্ন প্রার্থীদের নিয়োগের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়।

এরপরই নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়মের বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রশ্ন তোলা হয়- বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার শিথিলতা ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে বৈষম্যমূলকভাবে রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করা হয়েছে। যোগ্যতায় এগিয়ে থেকেও নিয়োগে পিছিয়ে পড়ছেন মেধাবীরা। 

নিয়োগ বোর্ড সদস্যরা হলেন- বিএমইউ ভিসি ডা. মু, শাহিনুল আলম, প্রোভিসি ড. মুহাম্মাদ আবুল কালাম, রেজিস্ট্রার অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, বায়োকেমিস্ট্রি ~বিভাগের সাবেক  চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক এবং বর্তমান চেয়ারম্যান ডা. নায়লা আতিক খান।

সূত্র জানায়, চলতি বছরে ২৭ মে চাকরি প্রার্থীদের মধ্য থেকে মৌখিক সাক্ষাৎকার শেষে তিনজনের নাম সহযোগী অধ‍্যাপক পদে প্রস্তাব করা হয়। এই তালিকায় ছিলেন খুলনার গাজী মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জেবা উন নাহার, বিএমইউর সাবেক সহকারী অধ্যাপক ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিফিল ডিগ্রীধারী ডা. মোহাম্মদ আলী ও ডা. মিলিভা। কিন্তু দেখা যায় ৩১ মে সিন্ডিকেট সভায় যে দুজনের নাম পাস হয়, সেখানে জেবা ও মিলিভার নাম উল্লেখ করা হয়। বাদ পড়েন ডা. আলী। ইতিমধ্যেই গত মাসের শেষ ভাগে যোগ দিয়েছেন তিন জন শিক্ষক। যোগ্যাতা জালিয়াতিতে বিতর্কের মুখে ঝুলে আছেন মিলিভা। সঙ্গত কারণেই দেশের অন‍্যতম প্রধান মেডিকেল বিশ্ববিদ‍্যালয়ে এমন পক্ষপাতমূলক নিয়োগে দেশের চিকিৎসা উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

চিকিৎসক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট মহল জোর দাবি জানিয়েছেন, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া অবিলম্বে তদন্ত করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মিথ্যা তথ্য প্রদানকারী এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে—এমনটাই এখন সময়ের দাবি।