তারপরও ভালো কিছুর জন্য অপেক্ষায় দেশী টেলিকম উদ্যোক্তারা

তারপরও ভালো কিছুর জন্য  অপেক্ষায় দেশী টেলিকম উদ্যোক্তারা
৮ নভেম্বর, ২০২৫ ১৪:৫৯  
৮ নভেম্বর, ২০২৫ ২২:১৮  

টেলিযোগাযোগ অধ্যাদেশের আলোকে তৈরি চারটি গাইডলাইনে বিদেশী বিনিয়োগ ও টেলিকম অপারেটরদের স্বার্থ সুরক্ষা করা হয়েছে। কৌশলে একমাত্র তাদেরকেই ‘ক্রসকাটিং লাইসেন্সিং’ সুবিধা দেয়া হয়েছে বলে মনে করেন দেশের টেলিকম বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতিতে দেশি বিনিয়োগ সুরক্ষা না করে বিদেশি স্বার্থ সুরক্ষা করা হচ্ছে দাবি করে 'অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে কোনো প্রত্যাশা নেই' বলে মন্তব্য করেছন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল। তবে প্রয়োজনে আইনি পথে অধিকার আদায়ের ঘোষণা দিয়েছেন আইএসপিএবি সভাপতি আমিনুল হাকিম। আর নীতিমালা নিয়ে তড়িঘড়ি না করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রযুক্তি নীতিমালা বিশ্লেষক আবু নাজম মুহাম্মাদ তানভীর হোসেন।

৮ নভেম্বর, শনিবার, টেলিকম ও টেকনোলজি  রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘দেশীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে কতটা ভূমিকা রাখবে টেলিযোগাযোগ খাতের নতুন নীতি’ শীর্ষক সভায় এসব কথা বলেন তারা। উদ্যোক্তারা প্রত্যাশা করেন, সরকার নিজে থেকেই এই সংকটের সমাধান করবে। 

সভায় উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে মাসুদ কামাল বলেছেন, লাভজনক সব খাতই এই সরকার বিদেশীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। সব কিছু শুনছে। কিন্তু নিজের মতকেই প্রতিষ্ঠিত করছে।  নির্বাচিত সরকার দিকেই তাকিয়ে থাকা ছাড়া উপায় নেই। 

কৌতুক করে তিনি বলেন, 'ইউনূস সাব ক্ষমতায় আসার সময় বলেছিলেন, আপনারা প্রাণ খুলে সমালোচনা করুন। এরপরে তিনি আরেকটি কথা বলেছেন, সেটা আমরা শুনিনি। তা হলো- আপনারা যতই সমালোচনা করুন আমি শুনবো না।' 

এসময় নিজের ইন্টারনেট ব্যবহারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাসুদ কামাল বলেন, তিনি গত কয়েক বছরে একাধিক মোবাইল অপারেটরের সিমকার্ড ব্যবহার করেছেন।  ইন্টারনেট সেবায় কাঙ্ক্ষিত মান পাননি। এখন তিনটি সিমে ইন্টারনেট চালান। আপলোড গতি পান না। মাঝে মাঝেই আপলোড করতে গেলে শুধু ঘোরে। 

নতুন নীতিমালায় ইন্টারনেট কখনই বন্ধ করা হবে না- এমন বক্তব্য 'স্ট্যানবাজি' মন্তব্য করে প্রযুক্তি নীতিমালা বিশ্লেষক আবু নাজম মুহাম্মাদ তানভীর হোসেন বলেন, বিভিন্ন প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে ইন্টারনেট বন্ধের প্রয়োজন হতে পারে। আগেও এটা হয়েছে। কিন্তু কেউ দায় নেয়নি। তাই এজন্য একটি প্রোটকল থাকা উচিত।  ইন্টারনেট যদি বন্ধ করা হয়, তাহলে দায়িত্ব নিতে হবে এমন নির্দেশনা থাকা উচিত। এজন্য একটি আইনি কমিটি থাকা উচিত। 

টেলিটকে দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের সুযোগ চেয়ে তনি বলেন, বিদেশী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে দেশী উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতা করুক। অথচ জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ লাইসেন্সিং এর ক্ষত্রে বিটিআরসি'র মাধ্যমে ৫ জন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী বিশিষ্ট একটি কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। এসময় তিনি প্রশ্ন রাখেন, টেলিকমের মতো একটা সার্ভিসের কোন লাইসেন্সটা গুরুত্বপূর্ণ নয়?

আইজিডব্লিউ অপারেটর্স ফোরাম সিইও মুশফিক মাঞ্জুর প্রশ্ন রাখেন, জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য কিছু মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য হয়ে ওঠলেও শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতের মতন গুরুত্বপূর্ণ খাতের সংস্কার না করে টেলিযোগাযোগ খাতকে সংস্কার করা কেন জরুরী হয়ে উঠলো কেন?  এরশাদ সরকারের আমলে সঠিক নীতির কারনে দেশের ওষুধ শিল্পে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটেছিল উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন.  বিদেশী কোম্পানিগুলোর পরিবর্তে দেশীয় কোম্পানিগুলো বিশ্ব মানের ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করে এবং দেশের মানুষ অত্যন্ত কম মূল্যে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ কেনার সুযোগ পায়। এই ধরনের নীতিই টেলিযোগাযোগ খাতে নেওয়া উচিত।

ফাইবার অ্যাট হোম ডিএমডি সুমন আহমেদ সাবির বলেন, জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশের জন্য কিছু মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য হয়ে ওঠে। সেই ধারাবাহিকতায় সংস্কারের শুরু হয় টেলিযোগাযোগ খাতের। কিন্তু প্রস্তাবিত নীতিমালা নিয়ে অভিযোগ, বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুবিধা দিতেই এটা করা হচ্ছে। সরকারকেই এই প্রশ্নের সমাধান দিতে হবে।

বক্তব্যে সামনে বসে থাকা আইএসপিএবি সভাপতিকে উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “আমার সামনে আমিনুল হাকিম বসে আছে। ও একটা আইসপির কর্তা ব্যক্তি, এখন একটা সাবমেরিন কেবলের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। তাহলে দেশীয় উদ্যোক্তা হিসেবে ওনাকে কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হবে, উনি কি আইএসপি ব্যবসা করবেন, নাকি উনি অন্য লেয়ারে যাবেন।”

তিনি বলেন, “বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য আবার যদি আপনি দেখেন, মোবাইল অপারেটর চাইলে ফাইবার নিয়ে একদম বাসা পর্যন্ত কানেক্টিভিটি দিতে পারবে। তাহলে আসলে আইএসপিরা কী করবে। অত বড় একটা ফিনান্সিয়্যাল মাসল পাওয়ারের সঙ্গে ছোট ছোট লাইসেন্সি যারা দুই-তিন হাজার সংখ্যায় হবেন তারা কী লড়াই করে টিকে থাকতে পারবে? এটা যদি সত্যি ব্লু প্রিন্ট হয় তাহলে পরিষ্কার করে বললেই হয়। আমরা এখন থেকেই বন্ধ হয়ে যাই, বিদেশিরাই আসুক তাদের ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে।”

 “এই পলিসিতে একটা গ্রুপের জন্য সব জায়গায় প্লে করার সুযোগ আছে। এটা বন্ধ না হলে আমাদের দেশীয় উদ্যোক্তাদের টিকে থাকার তেমন কোনো সুযোগ দেখি না”- সাফ মন্তব্য তার। 

তবে বিশেষ সহকারির একটি পোস্টের  বরাত দিয়ে নতুন গাইডলাইনে প্রয়োজনীয় সংস্কারেরে মধ্য দিয়ে আখেরে ভালো কিছুর প্রত্যাশা করছেন দেশীয় উদ্যোক্তারা। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) সভাপতি আমিনুল হাকিম বলেছেন, “নীতিমালায় মোবাইল অপারেটরদের বলা হয়েছে, সেলুলার মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডার (সিএমএসপি) আর আমাদের বলা হয়েছে ফিক্সড টেলিকম সার্ভিস প্রোভাইডর (এফটিএসপি)। নামকরণের মধ্যেই বলা আছে, আমরা ফিক্সড সার্ভিসটা দেব, আর ওনারা দেবে মোবিলিটি। কিন্তু গাইডলাইনের অপর পক্ষে বলা হচ্ছে যে, ওনারাও বাসা-বাড়িতে ফাইবার কেবল নিয়ে যেতে পারবে, ওনারাও ফিক্সড লাইন দিতে পারবে। তাহলে আমাদের ওরা ব্যবসা করবে কীভাবে?”

আইএসপিএবি সভাপতি আরো বলেছেন, খসড়া নীতিমালায় মনে হচ্ছে ‘দেশের চেয়ে মোবাইল অপারেটর বড়’। এ নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে, মোবাইল অপারেটরদের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে। এতে তাদের জন্য নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে, অথচ দেশীয় আইএসপি প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা আর্থিক চাপে ফেলে দেওয়া হচ্ছে।  

বক্তব্যে টেলিকম খাতের রোলআউট অবলিগেশনের মতো কোন বছরে কতটুকু শেয়ার হস্তান্তর হবে সে বিষয়ে জানাতে উপদেষ্টাদের কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার আহ্বান জানান আমিনুল হাকিম। তিনি বলেন, সংস্কারের ক্ষেত্রে দেশের স্বার্থে প্রায়োরিটি সেট করা দরকার। বাংলাদেশের গাইড বাংলাদেশের মতো করে করতে হবে। সাংবাদিক ভাইদের সকল উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করা উচিত, টেলিকম খাতে রোল আউট অবলিগেশন যেভাবে দেন, সেভাবে কোন বছরে কতটুকু শেয়ার হস্তান্তর করা হবে সেটাও উল্লেখ করে দেয়া উচিত। আপনারা এই রোড ম্যাপটা করে দেন আমরাও সংস্কারকে ওয়েলকাম করি। আমরা দেখতে চাই আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের সকল ক্ষেত্রে গ্লোবাল ইনভেস্টররা কাজ করে যাচ্ছে। সাহস থাকলে সেটা করে দেখান।

‘তা না হলে টেলিক খাত কিংবা বাংলাদেশকে কেন তাদের কাছে জিম্মি করে রাখবেন?-প্রশ্ন রাখেন আমিনুল হাকিম।

এমন পরিরিস্থিতিতে বিটিারসিতে অংশীজনদের নিয়ে অনুষ্ঠিত মিটিং শেষে চেয়ারম্যানের প্রতিশ্রুতি এবং এরপর বিশেষ সহকারীর আশ্বাসে আস্থা রাখতে চান এই ইন্টারনেট ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, মিটিং শেষে চেয়ারম্যান কথা দিয়েছেন, আমাদের বক্তব্য নিয়ে ভাববেন। গাইড লাইন মিনিস্ট্রিতে পাঠানোর আগে আমাদের দেখাবেন। তবে আমরা শুনতে পাচ্ছি ১৩ তারিখের মধ্যেই চারটি গাইডলাইন অনুমোদন হয়ে যাবে। অনুমোদিত গাইড লাইনে যদি আমাদের সেইফগার্ড না থাকে তাহলে আমার মনে হয় আইনগত ব্যবস্থা ছাড়া কোনে উপায় নাই।

সভায় গাইডলাইনের বিভিন্ন বৈপরীত্য তুলে ধরে বক্তারা বলেন, স্টারলিংকের মতো  বিদেশী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ফি ধরা হয়েছে ১২লাখ টাকা, সেখানে দেশীয় আইএসপি প্রতিষ্ঠানের জন্য ২৫ লাখ টাকা করাটার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রেখেছেন। সেলুলারের সঙ্গে ফাইবার যুক্ত করে পুরো লাইসেন্সিং প্রক্রিয়াকে মোবাইল অপারেটরদের জন্য ইউনিফায়েড লাইসেন্স পরিণত করা হয়েছে। 

ডিবিটেক/আইএইচ/ওআর

বিটিআরসিকে রাবার স্ট্যাম্প প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হচ্ছে?