দেশে শক্তিশালী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গতে তুলতে প্রয়োজন সরকারের পলিসি সাপোর্ট

দেশে শক্তিশালী স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গতে তুলতে প্রয়োজন সরকারের পলিসি সাপোর্ট
২৯ জানুয়ারি, ২০২৬ ১৭:৫৩  

বাংলাদেশে স্টার্টআপগুলোর ব্যর্থতার হার অনেক দেশে তুলনায় কম। তারপরও স্টার্টআপ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নীতি সহায়তায় সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ে দেশের তরুণরা।সরকারের সঠিক পলিসি সাপোর্ট দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে বড় বড় কোম্পিানিতে পরিণত করতে পারবে বলে মনে করেন উদ্যোক্তারা।  

রাজধানীর আগারগাওয়ের বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬ আয়োজনের দ্বিতীয় দিনে ২৯ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত সেমিনারে এসব কথা বলেন তারা। 

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী। সেমিনারে কী-নোট উপস্থাপন করেন স্টার্টআপ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও  নুরুল হাই। 

আলোচক হিসেবে ছিলেন বিডিজবস ডটকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফাহিম মাশরুর, শেয়ারট্রিপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাদিয়া হক, শিখো ডটকমের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও শাহীর চৌধুরী, লাইটক্যাসল পার্টনার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বিজন ইসলাম, পাঠাও বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফাহিম আহমেদ।

মূল প্রবন্ধে নুরুল হাই দেশের বর্তমান স্টার্টআপ অবকাঠামোর বিষয়গুলো তুলে ধরেন। সেই সঙ্গে বর্তমান সমস্যা ও বেশ কিছু সম্ভাবনার বিষয়গুলো তার উপস্থাপনায় উঠে আসে। তিনি দেশের স্টার্টআপের জন্য পাঁচটি প্যরাামিটার- ট্যালেন্ট কনভার্সন, ক্যাপিটাল ডেফথ, মার্কেট অ্যাক্সেস, বিশ্বস্ত অবকাঠামো এবং এক্সিট পাথওয়ের বিষয়টি তুলে আনেন। 
দেশের ডিজিটাল ডেভেলপমেন্টের বিষয়টি তুলে ধরে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ১৮ কোটি ৭০ লাখ, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১২ কোটি ৯৮ লাখ যার মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী সাড়ে ১১ কোটির বেশি এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহারকারী অন্তত ২৩ কোটি ৯৩ লাখ বলে জানান।

নুরুল হক দেশের স্টার্টআপের প্রধান চ্যালেঞ্জ ক্যাপিটাল অ্যান্ড ফাইন্যান্স, মার্কেট অ্যাক্সেস, ট্রাস্ট অ্যান্ড কমপ্লায়েন্স এবং এক্সিট অ্যান্ড রিপ্যার্টেইশন বলে দেখান। 

এরপর তিনি সরকারের পলিসি সাপোর্ট এবং আইসিটি ডিভিশনের স্টার্টআপ সিস্টেমের জন্য নেয়া বেশকিছু উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। যার মধ্যে স্টার্টআপ ইনভেস্টমেন্ট, গ্র্যান্টস, ফান্ড অব ফান্ড, মনিটরিং নেটওর্য়াকের মতো বিষয়গুলো তুলে আনেন। এরপর বক্তরা তার মূল প্রবন্ধ ধরে আলোচনায় অংশ নেন।  

এসময় বিডিজবস ডটকমের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বলেন, দেশের মোবাইল, ইন্টারনেট ও এমএফএস ব্যবহারকারীর সংখ্যা নিয়ে নানান ধরনের বিশ্বসযোগ্যতার অভাব রয়েছে। এটি পপুলিস্ট ডেটা। ফলে আমরা যখন সেই ডেটা ধরে কাজ করে তখন সেটা নিয়ে খুব ইতিবাচক ফল আসে না স্টার্টআপে। ফলে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। 

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক একটা স্টার্টআপ কোম্পানিকে হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। আমার মনে হয় না, দেশে এখনও কোনো স্টার্টআপ হাজার কোটি টাকা ফান্ড নেয়ার মতো সক্ষমতা আছে। এখানে ফান্ড পাওয়া কঠিন না, সেটা সঠিকভাবে ইউটিলাইজ হচ্ছে কিনা সেটা দেখতে হবে। আর জনগণের কাছে সুবিধা পৌঁছে দিতে প্রথম দরকার সরকারের পলিসি। আমরা অনেকদিন ধরেই এসব নিয়ে বলছি। আশা করছি নির্বাচিত সরকার এলে বিষয়টি দেখবেন। 

অলোচনায় অংশ নিয়ে শিখো ডটকমের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও শাহীর চৌধুরী বলেন, বিশ্বের কাছে যদি আমরা বাংলাদেশকে চেনাতে চাই তাহলে আমাদের দরকার স্টার্টআপ। কোনো একটা ইনোভেশন এবং তা দিয়ে সাধারণ মানুষের কাজে লাগানোর মাধ্যমেই আমাদের যাত্রা। কিন্তু আমরা সেই যাত্রায় গিয়ে মানুষের কাছে অ্যাক্সেস করতে পারছি না। পলিসিরি দিক থেকে ডিভাইসের ট্যাক্সেশন এবং ইন্টারনেটের দাম এই দুটি বিষয় সাধারণ মানুষকে উপকারভোগী করতে পারছে না। 

লাইটক্যাসল পার্টনার্সের সিইও বিজন ইসলাম বলেন, আমাদের সমস্যাগুলোর মধ্যে একটা বিশেষ সমস্যা হলো স্টার্টআপের জন্য কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নেই। এটা আমাদের করতে হবে। তাহলে পলিসি সাপোর্টগুলো আমরা পেতে পারি সহজে। 

চালডাল ডটকমের সিইও ওয়াসিম আলীম বলেন, অন্য যেকোনো মন্ত্রণালয়ের চেয়ে আমাদের আইসিটিতে বাজেট কম। এটা বাড়ানো দরকার। আইসিটির প্রতিষ্ঠানগুলো জিডিপিতে অনেক অবদান রাখলেও বাজেট না থাকায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে পারে না। 

পাঠাও-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ফাহিম আহমেদ বলেন, আমাদের সামনে আগানোর জন্য সবচেয়ে বড় যে কাজটি করতে হবে তা হলো স্টার্টআপ পলিসি সহজ করা। আমাদের বাজেট আছে, সেটার সঠিক ব্যবহার করতে হবে। আমাদের হয়তো শত কোটি টাকার বাজেট আছে, কিন্তু সেটার সঠিক ব্যবহার নিয়েও সংশয় রয়েছে। এটা দেখতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরকারের পলিসি আরও সহজ করতে হবে। স্টার্টআপ বাংলাদেশের ফান্ড টু ফান্ড আমাদের আশাবাদী করে। 

শেয়ারট্রিপের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাদিয়া হক বলেন, ফান্ড অব ফান্ডের থট প্রসেস খুব ইতিবাচক, কিন্তু জটিল। আমাদের সবগুলো মন্ত্রণালয়ের মধ্যে খুব দূরত্ব রয়েছে। একই থট প্রসেসে না থাকলে সমস্যা হচ্ছে এক্সিকিউশনে। যে সময়ে যে ফান্ড দরকার তা ম্যানেজ করা যাবে না। আমাদের বাস্তবতা খুব কঠিন, তাই আমরা চাই ফান্ড অব ফান্ড যেন আমলাতান্ত্রিকতায় না আটকায়। 

তিনি আরও বলেন, একটা সেন্ট্রাল জায়গায় সব স্টার্টআপকে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে নানা ধরনের সমস্যা রয়েছে। কোন স্টার্টআপ কোন মন্ত্রণালয়য়ের অধীনে সেটা সবচেযে জটিল বিষয়। এথেকে বের হতে চাইলে আমাদের আইসিটি ডিভিশনকে এগিয়ে আসা দরকার। তাহলে স্টার্টআপ হিসেবে কেউ রেজিস্টার করলে সেটা একটি সংস্থার অধীনেই থাকবে এবং তারাই তাদের পলিসি থেকে সব ধরনের সাপোর্ট দেবে।

সবশেষে এজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান বক্তরা।

ডিবিটেক/এফএস/ইকে