শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল ডিভাইসের ঋণদানে প্রয়োজন সমন্বিত পলিসি

শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল ডিভাইসের ঋণদানে প্রয়োজন সমন্বিত পলিসি
৩০ জানুয়ারি, ২০২৬ ১১:৩৫  

শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল ডিভাইস সহজলভ্য করতে হলে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে একটি পলিসি তৈরি করতে হবে। ডিজিটাল ডিভাইসের জন্য ঋণদানে এই পলিসি তৈরি করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে হাজার কোটি টাকার অবদান রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টরা।

৩০ জানুয়ারি, শুক্রবার সকালে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬-এ ‘অ্যাক্সেস টু ফাইন্যান্স টুওয়ার্ডস অপরচুনিটিজ: ফাইন্যান্সিং ডিজিটাল ডিভাইস ফর স্টুডেন্টস টু বিল্ড অ্যান ইন্টেলিজেন্ট সোসাইটি’ শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলেন বক্তারা।

‘থেমে থাকা স্বপ্ন বদলাতে হবে’ শিরোনামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির (বিসিএস) সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম।

প্রবন্ধে তিনি বলেন, দেশে ডিভাইসের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তা করতে হলে ডিভাইস সহজলভ্য করতে হবে। দেশে স্মার্ট ডিভাইসের ব্যবহার অন্তত ৮০ শতাংশে নিতে হবে; এচাড়া বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার পথে বড় বাধা সৃষ্টি হবে।

তিনি দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ শর্তে ডিজিটাল ডিভাইস কেনার উদ্দেশ্যে ঋণ প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকার এবং ব্যাংকগুলোকে শিক্ষার্থীদের জন্য স্বল্প সুদে, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে বিনা সুদে ঋণ ফাইন্যান্সিংয়ের আহ্বান জানান। কৃষিঋণের মতো শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ডিজিটাল ডিভাইস ঋণের জন্য একটি পৃথক পলিসি তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বিল্ডকন কনসালটেন্সি লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব উদ্দীন আহমদ।

আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, আইসিটি বিভাগের (অর্গানাইজেশনাল সাপোর্ট উইং) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দীন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট সুপর্ণা রয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আলিফ রুদাবা, ফিজিশিয়ান ও মিডিয়া পার্সোনালিটি ও বিশ্লেষক আব্দুন নূর তুষার এবং অ্যাক্সেটেক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আদিল হোসেন নোবেল।

মাহতাব উদ্দীন বলেন, শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল ডিভাইসের ঋণদানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। আমরা অনেক ক্ষেত্রেই ঋণ দেই জেনেও যে সেগুলো ফেরত পাওয়া যাবে না, তবু সেখানে প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এলেই বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এ জন্যই আমাদের একটি সুস্পষ্ট পলিসি প্রয়োজন।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু নেতিবাচক দিক তুলে ধরে বলেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। বছরে প্রায় ১০ লাখ শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েট হলেও মাত্র ১০ শতাংশ শিল্পখাতে যুক্ত হয়। অর্থাৎ ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে সংযোগ নেই। ফলে চাকরির বাজারে তারা পিছিয়ে পড়ে এবং বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি হয়। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইস নেই। ডিভাইস পেলে তারা বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা আয় করতে পারবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আলিফ রুদাবা বলেন, সরকার কোর্স ফাইন্যান্সিং নিয়ে কাজ করলেও শিক্ষার্থীদের জন্য ডিভাইস ফাইন্যান্সিংয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই। কারণ আমাদের নেওয়া প্রকল্পগুলোর মেয়াদ স্বল্পমেয়াদি এবং ঋণ আদায়ের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট স্পেশালিস্ট সুপর্ণা রয় বলেন, ডিভাইস ফাইন্যান্সিংয়ে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল আইডেন্টিটি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ডেটা শেয়ারিং এবং এমএফএস সংযোগ থাকতে হবে। এতে ট্র্যাকিং সহজ হবে এবং ঋণ পরিশোধও সহজ হবে। পাশাপাশি সাবসিডি মডেলেও কাজ করা যেতে পারে, যা বিশ্বব্যাংক করে থাকে।

আইসিটি বিভাগের (অরগানাইজেশনাল সাপোর্ট উইং) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দীন বলেন, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন করা গেলে তারা বিদেশে না গিয়েই বৈদেশিক আয় করতে পারবে। ইন্টারনেট এখন প্রায় প্রতিটি উপজেলা ও গ্রামে রয়েছে; প্রশ্ন হলো এর অ্যাক্সেসিবিলিটি কতটা নিশ্চিত। তরুণদের মূলধারায় আনতে হলে ডিভাইস পলিসি ও ফাইন্যান্সিং নিয়ে কাজ করতে হবে, যা মাধ্যমিক স্তর থেকেই শুরু করা যেতে পারে।

অ্যাক্সেটেক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আদিল হোসেন নোবেল বলেন, ডিভাইস ফাইন্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রে কর্পোরেট সেক্টরকেও নিরাপদ মনে করা হলেও সেখান থেকেও অনেক সময় আদায় সম্ভব হয় না। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। ব্যাংক হয়তো এই স্তরে সরাসরি ফাইন্যান্স করতে আগ্রহী হবে না। তাই নতুন একটি মডেল তৈরি করে এগোতে হবে।

ফিজিশিয়ান ও মিডিয়া পার্সোনালিটি ও বিশ্লেষক আব্দুন নূর তুষার বলেন, সবাই শিক্ষার্থীদের জন্য ডিজিটাল ডিভাইস ঋণ দিতে আগ্রহী, তবে তা অবশ্যই সঠিক পলিসির মাধ্যমে হতে হবে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে চিপ, মেমোরি ও র‍্যামের দাম বাড়ছে, যার প্রভাব দেশীয় হার্ডওয়্যার বাজারেও পড়ছে। পাশাপাশি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোও হার্ডওয়্যার নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। তাই প্রথমেই ডিভাইসসংক্রান্ত একটি জাতীয় পলিসি প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, যেসব শিক্ষার্থীকে ডিভাইস ঋণ দেওয়া হবে, তাদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ দিতে হবে এবং ডিভাইসের ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে মনিটরিং ব্যবস্থা রাখতে হবে। সরকার যে পলিসিই গ্রহণ করুক না কেন, তা হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি এবং দেশীয় ডিভাইস উৎপাদন বাড়িয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে যেতে হবে।

ডিবিটেক/ইএইচেম/ইকে