বিটিআরসি’র ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রত্যাশায় শুদ্ধি অভিযান

বিটিআরসি’র ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রত্যাশায় শুদ্ধি অভিযান
৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ১০:৩৬  

২০০১ সালের বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন অনুযায়ী ২০০২ সালের ৩১ জানুয়ারি স্বাধীন কমিশন হিসেবে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সেই হিসেবে শনিবার নিজস্ব ঠিকানায় অনেকটাই ঘরোয়া পরিবেশে ২৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করছে সংস্থাটি।  

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শান্ত আবহে পর্দার আড়ালে বিটিআরসি-তে বইছে দমকা হাওয়া। একদিকে যেমন ডিজিটাল বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপনে সংস্থাটির অনস্বীকার্য ভূমিকা রয়েছে, অন্যদিকে ‘স্বাধীনতা’ ফিরে না পাওয়া ও দুষ্টের লালন ও শিষ্টের দমন নিয়ে সংস্থার ভেকরে রয়েছে চাপা ক্ষোভ। যৌবনের এই ভরা বসন্তে বিটআরসি এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে একদিকে রয়েছে দুই দশকের প্রযুক্তিগত সাফল্যের মুকুট; আর অন্যদিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার তীব্র দাবি।

সংস্কারের গোলকধাঁধায় 
বিটিআরসি এখন আর কেবল লাইসেন্স দেওয়ার কোনো ডাকঘর নয়; এটি এখন জাতীয় নিরাপত্তার অতন্দ্র প্রহরী এবং ডিজিটাল অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। বিটিআরসির হাত ধরেই বাংলাদেশে ৫জি-র ট্রায়াল এবং সাবমেরিন ক্যাবলের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে শুধু প্রযুক্তি আনলেই হবে না, বরং এর সুফল যেন সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী মূল্যে পায়, তা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কেননা, সাম্প্রতিক শ্বেতপত্র এবং অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা প্রমাণ করে যে, এই বিশাল যন্ত্রটির ভেতরে দীর্ঘদিনের মরিচা পরিষ্কার করার সময় এসেছে। এরই অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে।  বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে বাজার বিশ্লেষকদের অভিমত, ‘একটি রেগুলেটরি বডির কাজ কেবল লাইসেন্স দেওয়া নয়, বরং একটি সুস্থ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি করা যেখানে গ্রাহকই হবে রাজা।’

‘ওয়ান নেশন, ওয়ান লাইসেন্স’ 
বিটিআরসি তার প্রথাগত লাইসেন্সিং ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। আগে আইএসপি (ISP), আইজিডব্লিউ (IGW), এবং আইআইজি (IIG) এর জন্য পৃথক ও জটিল স্তর ছিল, যা অনেক সময় দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করত। ফলে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ভেঙে বিটিআরসি এখন সেবার ধরণ অনুযায়ী লাইসেন্সগুলোকে একীভূত করার কাজ করছে। বিগত দিনে রাজনৈতিক বিবেচনায় দেওয়া কয়েকশ অকার্যকর আইএসপি লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সংখ্যার চেয়ে সেবার মানে গুরুত্ব দেয়ার কথা শোনা যাচ্ছ। 

এনইআইআর ইস্যুতে আক্রান্ত বিটিআরসি ভবন
প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকার হ্যান্ডসেট অবৈধ পথে দেশে আসে। এমন পরিস্থিতিতে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) বা অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধের প্রক্রিয়াটি বিটিআরসির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এনইআইআর চালুর মাধ্যমে সংস্থাটি সরকার বড় অংকের রাজস্ব নিশ্চিত করতে চাইলেও সাধারণ গ্রাহকদের ব্যবহারের ফোন ‘নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে অনিবন্ধত ফোন বন্ধ করে দেওয়ায়ার’ দৃঢ় অবস্থানে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিটিআরসি ‘সফট লঞ্চ’ এবং স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধনের মাধ্যমে ডাটাবেজ তৈরির দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। তারপরও উৎপাদক বনাম গ্রে ইম্পোর্টার বিরোধে দ্বিখন্ডিত মোবাইলফোন ব্যবাসায় খাতে সহিংসতা বলি হয়েছে বিটিআরসি ভবন। 

তরঙ্গ সম্পদের সুষম বণ্টন
তরঙ্গ বা স্পেকট্রাম হলো বিটিআরসির সবচেয়ে দামী সম্পদ। অতীতে তরঙ্গ বরাদ্দে গড়িমসি এবং উচ্চমূল্যের কারণে অপারেটররা পর্যাপ্ত তরঙ্গ কিনতে পারেনি, যার ফল ভোগ করছে সাধারণ গ্রাহক (কল ড্রপ ও ধীরগতির ইন্টারনেট)। এমন পরিস্থিতিতে অপারেটরদের একই তরঙ্গ দিয়ে ২জি, ৪জি বা ৫জি সেবা দেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। অবশ্য সম্প্রতি ৭০০ ব্যান্ডের তরঙ্গ নিলাম করেও অপারেটরদের সবাইকে তুষ্ট করতে পারেনি। ফলে  ২০২৬ সালের মধ্যে ৫জি’র পূর্ণাঙ্গ প্রসারের লক্ষ্যে নতুন তরঙ্গ নিলামের পরিকল্পনা চলছে। 

দুর্নীতির শ্বেতপত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধি
 নানা অর্জন ছাপিয়ে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর আগে সম্প্রতি প্রকাশিত শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে কীভাবে বিটিআরসির ভেতরে একটি শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে উঠেছে। ‘শ্বেতপত্র’টিতে বাংলাদেশের টেলিকম খাতের একটি অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছে। সেখানে দেখা গেছে, বিগত বছরগুলোতে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে কীভাবে প্রভাব খাটিয়ে নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবে অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে আইএসপি বা এনটিটিএন লাইসেন্স প্রদান;  অবকাঠামো উন্নয়নের নামে বিশাল অংকের অর্থের অস্বচ্ছ ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানিকে বাজার দখলের সুযোগ করে দিয়ে প্রতিযোগিতার পথ রুদ্ধ করার বিষয় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এখনও সেই চক্র সক্রিয় বলে বিভিন্ন খবরে প্রকাশিত হচ্ছে। সংস্থার অভ্যন্তরীণ নথিতেও উঠে এসেছে মেধাবীদের সরিয়ে প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠদের গুরুত্বপূর্ণ ডেস্কে বসানোর অভিযোগ। দালিলিক প্রমাণও দেয়া হয়েছ শ্বেতপত্রে। সংস্থাটির খোদ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সরাসরি অভিযোগ উঠেছে। টেলিকম মনিটরিং সিস্টেমের মতো বড় বড় প্রকল্পে কেন ব্যয় কয়েকগুণ বাড়ানো হলো, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ নিরীক্ষার মাধ্যমে শুদ্ধি অভিযানে জোর গুরুত্ব দিয়েছেন শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়ে প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর একটি প্রক্রিয়া শুরু হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বশেষ কমিশন বৈঠকে সেসব বিষয় উপেক্ষার অভিযোগ ও নানা প্রশ্নের মুখেই অনেকটা একাকীই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করছে বিটিআরসি।

বিটিআরসির এই ‘শান্ত’ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আসলে একটি প্রস্তুতির সময়। অতীতের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে, শ্বেতপত্রের সুপারিশ মেনে এবং দুর্নীতিমুক্ত হয়ে সংস্থাটি যদি এগোতে পারে, তবেই ‘অন্তর্ভূক্তিমূলক’ প্রকৃত 'ডিজিটাল সাম্য' প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আগারগাঁওয়ের বিটিআরসি ভবনে আজ যে নীরবতা, তা যেন কোনো বড় ইতিবাচক পরিবর্তনের আগের নিস্তব্ধতা হয়- এমনটাই প্রত্যাশা সাধারণ মানুষের।