জিপিটি’র বৃত্তে পরিধি’র জয়

জিপিটি’র বৃত্তে পরিধি’র জয়
২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ ১২:৫১  

রস্বই আলম

বদলে যাচ্ছে পৃথিবী। নিউরালিংক পড়ছে মানুষের মন। মস্তিষ্কের নিউরন ব্যবস্থার অনুকরণে স্নায়ু কোষের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মানবদেহে সংযুক্ত হচ্ছে যন্ত্র। নানা কাজে সহচর হয়ে যন্ত্র ঘুচছে যন্ত্রণা। আর যন্ত্রকে আস্থাভাজন দাসে পরিণত করতে জন্ম দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। চ্যাটজিপিটি থেকে ডিপসিক- এই নিয়ে যখন তাবৎ দুনিয়ায় শোরগোল; তখন রাজধানীর বনানীতে অনুষ্ঠিত হলো এআই হ্যাকাথন। ছোট পরিসরে রোপিত হলো বড় ভবিষ্যতের বীজ। এজন্য উর্বর ভূমি প্রস্তুত করে ভিভাসফট এআই হ্যাকাথন ২০২৫। হ্যাকাথনে ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিতে কেউ কাজ করেছেন জেনারেটিভ এআই দিয়ে এসআইইএম নিরাপত্তা বুদ্ধিমত্তা নিয়ে, আবার কেউ বা রিমোট জবের জন্য ভার্চুয়াল ওয়ার্কস্পেস তৈরি করেছেন। এছাড়াও এআই পাওয়ারড সিকিউরিটি মনিটরিং টুল তৈরি করেও দেখিয়েছেন কেউ।

শুরুটা যেভাবে

দেশে এআই এবং গতানুগতিক ধারার পেশাদার ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে এআই হ্যাকাথনের ধারণা আসে গত বছরের নভেম্বরে। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে অনুষ্ঠিত বিশ্বের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের অন্যতম বড় সম্মেলন ওয়েব সামিটে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধুই মানুষের কল্যাণে কীভাবে ব্যবহার করা যায় তা নিয়ে মেলার প্রতিটি প্যাভিলিয়ন ছিলো সরব। সেখান থেকেই দেশে ফিরে এআই-কে তরুণদের কাছে জনপ্রিয় করার জন্য কিছু একটা করার কথা ভাবেন আয়োজক প্রতিষ্ঠান ভিভাসফট লিমিটেডের সহ-প্রতিষ্ঠাতা শাফকাত আসিফ। আয়োজন নিয়ে তিনি বললেন, ওয়েব সামিট অসাধারণ একটি ইভেন্ট। আইটি খাতের সঙ্গে যুক্ত অনেক মানুষ আসেন এখানে। ইভেন্টে ব্রাজিল ও জার্মানির প্যাভিলিয়নের সবাই ছিলো এআই নিয়ে। ভারত-পাকিস্তান, আফ্রিকার আইল্যান্ড ক্যাপ ভার্দেও ছিলো। নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের কোনো প্রেজেন্স ছিলো না। তখনই আমার সহ-প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে আলাপ করে দেশে এআই হ্যাকাথন করার পরিকল্পনা। গত নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন চলে এআই হ্যাকাথনের। নিবন্ধন শুরুর প্রথম কয়দিনে তেমন কোনে সাড়া মেলেনি। তবে শেষ দিন একসঙ্গে জমা পড়ে ২০০টি আবেদন। সব মিলে আবেদনের সংখ্যা পৌঁছে যায় ৩৭৮টিতে। এমনটাই জানান হ্যাকাথনের সমন্বয়ক হোসাইন আল মুহী। বললেন, প্রাথমিকভাবে ৩৫টি টিমকে দ্বিতীয় পর্যায়ের জন্য বাছাই করি। এই কাজে আমার সঙ্গে ছিলেন হ্যাকাথনের জাজ প্যানেল। সহযোগিতা করেন কৃপা হোসাইন, মনিরুল ইসলাম রাসেল ও আহসানুল হক তালহা। ফাইনালে ওঠে ৩২ জনের ১০টি টিম। সেখানে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন – হগার্থ ওয়ার্ল্ডওয়াইডের (বাংলাদেশ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমতিয়াজ ইলাহি, বিকাশ লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট (সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট) নাবিল আহমেদ লিপন ও ভাইস প্রেসিডেন্ট (রিসার্চ এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং) শুভ্র সরকার এবং ভিভাসফট লিমিটেডের মেশিন লার্নিং কনসাল্টেন্ট আমিনুল ইসলাম।

১০ টাইগার এআই

মহাকর্ষের সমীকরণ সমাধান নিয়ে ২০১৪ সালে তৈরি ইন্টারস্টেলার। যেখানে কুপার এবং তার দল মানবতার জন্য পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সমস্যার সমাধানে চেষ্টা করেন। তেমনি নিত্য সমস্যার সমাধানে এআই সল্যুশন তৈরিতে ৩৬ ঘণ্টার চ্যালেঞ্জ নেয় একদল তরুণ। ২৫ জানুয়ারি সকাল ১০টা থেকে চলে ২৬ জানুয়ারি রাত ১০টা পর্যন্ত। এই সময়ে অঙ্কুরিত হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ১০ টাইগার এআই- ‘ভার্চুয়াল ইন্টিলিজেন্ট ভয়েস অ্যাসিস্টেন্ট ভিভা; বার্তা এআই; মেটা হাইভ; কোড মেন্টর; মার্কেট ফ্লিক এআই; ফ্রেমওয়াইজ; সাইবার গার্ড জিপিটি; ইবিপিএফ এআই এজেন্ট; এআই স্পিকিং ইভ্যালুয়েটর ও এআই অ্যাসিস্ট প্রো। আর স্বপ্নের এই সল্যুশন বানাতে গিয়ে নির্ঘুম সময় গেলেও গভীর রাতে এআই-টাইগাররা কিন্তু গিটার বাজিয়ে গলা ছেড়ে গান গেয়েছেন। খেলেছেন ২৯, টেবিল টেনিস। আবার কাজের মধ্যে বুঁদ হয়ে ভুলে গেছেন খাবার সময়। দিন শেষে উপহার দিয়েছেন জীবনকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করার কয়েকটি সল্যুশন। বৈচিত্রময় এসব সল্যুশনের মধ্যে eBPF এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এজেন্টিক সিস্টেম সবাইকে ছাড়িয়ে যায় টিম ‘পরিধি’। চ্যাম্পিয়ন হয়ে জিতে নেয় দুই লাখ টাকা। এক লাখ টাকা পায় রানার্সআপ টিম ‘ডিফাইন কোডারস’। দ্রুততম সময়ে নির্ভুলভাবে বাজার বিশ্লেষণ করে সমস্যা সমাধানের জন্য ‘মার্কেট ফ্লিক এআই’ বানিয়েছে দলটি। এছাড়াও এডটেক সল্যুশন ’পারসোনালাইজড টিচিং এসিসট্যান্ড ফর কোডিং’  দিয়ে ‘অনারেবল মেনশন’ স্বীকৃতি পায় টিম ‘কোডমেন্টর’। বিজয়ীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন হগার্থ ওয়ার্ল্ডওয়াইডের (বাংলাদেশ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমতিয়াজ ইলাহি।

চ্যাম্পিয়ন পরিধি

ওয়েবসাইট ও অ্যাপ্লিকেশন হোস্টিংয়ের সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডিবাগিং  করতে সক্ষম অনন্য eBPF এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন এজেন্টিক সিস্টেম তৈরি করে হ্যাকাথনে চ্যাম্পিয়ন দল পরিধিতে আছেন তিনজন পেশাদার ইঞ্জিনিয়ার  এবং একজন শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে কেউই কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলের ছাত্র নয়। এদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমআইএস থেকে স্নতকোত্তর করে একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে চারকরি করেন দলনেতা তাহনিক আহমেদ রাইয়্যান। সে-ই মূলত এআই সিস্টেমটি ডিজাইন করেন এবং ইবিপিএফ টেলেমেট্রি পাইপলাইন ইন্টিগ্রেশন করেন। তারই সহকর্মী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছেলে রায়হান ইসলাম চুয়েট ম্যাকাট্রনিক্স অ্যান্ড ইন্ডারস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে স্নাতক শেষ করেছেন। হ্যাকাথনে তিনি ব্যাকএন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডেভপসের কাজ করেছেন। আর রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রিপলই স্নাতক আব্দুল্লাহ আল আসিফ, এআই সিস্টেমের রিজনিং ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করেছেন। এছাড়া চুয়েট তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান ফ্রন্টএন্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পুরো কাজ টির বাহ্যিক রূপ দেন।

এই চার তরুণ মিলেই এমন একটি এআই সল্যুশন উদ্ভাবন করেন; যেটি দ্রুত সিস্টেমের ত্রুটি শনাক্ত এবং সংশোধনের তাৎক্ষণিক সুপারিশ করে। এজেন্টটি eBPF (Extended Berkeley Packet Filter) প্রযুক্তি ব্যবহার করে নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা ঝুঁকির পূর্বাভাস দিতে পারে। ডেভেলপারদের সময় বাঁচিয়ে সফটওয়্যার উন্নয়নের পুরো প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ ও নির্ভুল করে তোলে। এটি সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ও সাইবার নিরাপত্তার ভবিষ্যতকে আরও সহজ, দ্রুত এবং সুরক্ষিত করে তুলবে বলে মনে করেন দলনেতা তাহনিক আহমেদ রাইয়্যান। দলের অপর সদস্য রায়হান বললেন, রান্নার সময় যেমন লবন-ঝাল টেস্ট করতে হয়; তেমনি ক্লাউডে যেকোনো অ্যাপ্লিকেশন আপলোড করার সময় ডিবাগিং করতে হয়। আমাদের সল্যুশনটি ইবিপিএফ প্রযুক্তির মাধ্যমে নেটওয়ার্কিং স্টাফগুলোর ডাটা লগ করে কোনো ম্যালিশিয়াস আছে কিনা তা বুঝতে পারে। প্যাকেটের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আগাম পদক্ষেপ গ্রহণে সাহায্য করে। সল্যুশনটি ৪ ঘণ্টার কাজ ১ ঘন্টায় নামিয়ে আনে।

দেশের তরুণ এআই সল্যুশন উদ্ভাবকদের পিরিধির মতো এমন এলএলএম বা জিপিটি সল্যুশন অচিরেই সীমনা ছাড়িয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন আয়োজকরা। খাতসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ ধরনের আয়োজন আরো বেশি বেশি এবং বড় পরিসরে হওয়া দরকার। কেননা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। তাই, এখন থেকেই এআই বিশেষজ্ঞ তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে সরকারকে।