তান্ত্রিক সেজে ফেসবুকে ‘আধ্যাত্মিক’ প্রতারণার ফাঁদ
সন্তানের অবাধ্যতা, দাম্পত্য কলহ কিংবা পারিবারিক টানাপড়েনের মতো মানসিক চাপে থাকা মানুষদের লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে চলছে ‘আধ্যাত্মিক প্রতারণা’। অফলাইনের প্রতারণা এখন গেড়ে বসছে অনলাইনেও। ফেসবুকে লাইভ, রিল ও বিজ্ঞাপন প্রচার করে গ্রাম থেকে শহর, সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে এই প্রতারণার ফাঁদ।
ফেসবুকে তেমনি একটি ফাঁদ ‘কুরআনিক শিফা’ নামে পেজ খুলে ‘অবাধ্য সন্তানকে বাধ্য করার উপায়’ শিরোনামে ভিডিও ছাড়িয়েছে একটি চক্র। এই ভিডিও দেখে প্রতারিত এক নারীর করা মামলায় ছয়জনকে গ্রেফতারও করেছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, তারা বিভিন্ন নামে ২৫টির বেশি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করত বলে জানায়। যেগুলোতে ‘জিন চিকিৎসা’, ‘কালো জাদু মুক্তি’, ‘স্বামী/স্ত্রী বশীভূত’, ‘সন্তান বাধ্য করার আমল’ ইত্যাদি ধরনের ভিডিও পোস্ট করা হতো। প্রতি মাসে তাদের অন্তত ৮-১০ জনকে শিকারে নিয়োজিত ছিলো। শিকার ব্যক্তিদের যেকোনো ধরনের আধ্যাত্মিক চিকিৎসা, বশীকরণ, জাদুমুক্তি, জিন তাড়ানোর নামে টাকা দাবি করে করতো প্রতারণা।
সূত্রমতে, নিউমার্কেট এলাকার এক নারীকে ‘অবাধ্য সন্তানকে বাধ্য করা যাবে’- এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে এবং পরবর্তীতে ভয় দেখিয়ে ৩৫ লাখ টাকারও বেশি হাতিয়ে নেওয়া তান্ত্রিক চক্রের ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরা হলেন- রাকিব মাতব্বর, আলাউদ্দিন ব্যাপারী, মহিউদ্দিন ব্যাপারী, মানিক, ফরহাদ হোসেন ও মেহেদী হাসান। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে ১৩টি মোবাইল ফোন উদ্ধার হয়, যেগুলো ফেক তান্ত্রিক পরিচয়, ভয়েস চেঞ্জিং রেকর্ডিং এবং ভিকটিম ধরার জন্য ফেসবুক পেজ পরিচালনায় ব্যবহার করা হতো।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিউমার্কেট থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ফিরোজ আহম্মেদ জানান, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযানে নেমে প্রথম দিন বুধবার সন্ধ্যায় হাজারীবাগের জিগাতলা-রায়েরবাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় পাঁচজনকে। পরের দিন ভোরে যশোরের চৌগাছার যাত্রাপুর থেকে গ্রেফতার করা হয় চক্রের আরেক সদস্যকে
এ বিষয়ে মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নিউমার্কেট বিভাগের সহকারী কমিশনার (এসি) জাহাঙ্গীর কবির জানান , গত ১৯ আগস্ট এলিফ্যান্ট রোডের ভাড়া বাসায় অবস্থানকালে ‘কুরআনিক শিফা’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ‘অবাধ্য সন্তানকে বাধ্য করার উপায়’ শিরোনামে ভিডিও দেখতে পান ভুক্তভোগী ওই নারী। ভিডিওটিতে ধর্মীয় ছোঁয়া ও জিনের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল অভিভাবকদের পক্ষে সেটিকে এড়িয়ে যাওয়াও কঠিন। ভুক্তভোগী নারীও তার ব্যতিক্রম নন। বিজ্ঞাপনে দেওয়া নম্বরে ফোন করেন তিনি। সেখান থেকেই শুরু ‘তান্ত্রিক খেলা’।
ফোন রিসিভ করে এক যুবক নিজেকে ‘আধ্যাত্মিক গুরু’ পরিচয় দিয়ে জানায়, আপনার সন্তানের আচরণে জিনের প্রভাব আছে। আমরা দোয়া-কালাম ও বিশেষ আধ্যাত্মিক পদ্ধতিতে তাকে বাধ্য করতে পারব। এ যেন এক অদৃশ্য ফাঁদ- যেখানে ভয়, দুর্বলতা ও সন্তানকে নিয়ে উদ্বেগ ব্যবহার করে প্রতারকরা ভুক্তভোগীকে একের পর এক আর্থিক ফাঁদে ফেলতে থাকে।
প্রথমে বলা হয় কিছু ‘আধ্যাত্মিক উপকরণ’ লাগবে। ভুক্তভোগীর কাছ থেকে বিকাশে নেয় পাঁচ হাজার ৫০০ টাকা। পরদিন হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হয় ‘কালো জাদুর’ সাজানো ছবি, ধূপ, আগুন, কালো পোশাক, রহস্যময় প্রতীক। কাজ চলছে- এমন ভান তৈরি করতেই পুরো আয়োজন।
বিভিন্ন সময় ফোনে ‘জিনের কণ্ঠ’ও শোনানো হয়। ভয় দেখিয়ে বলা হয়, ‘আপনার সন্তান বড় বিপদে আছে। এরপর শুরু বড় অঙ্কের টাকা দাবি। ৪৯ হাজার টাকা, ১ লাখ টাকা, আবার নতুন ‘সমস্যা দেখা দিয়েছে’ বলে আরও টাকা লাগবে বলে জানায়। এভাবে ২১ আগস্ট থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৫ লাখ ৪৪ হাজার ১০৫ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। প্রতারকরা এতটাই পেশাদার ছিল যে, ভুক্তভোগীকে কখনোই সরাসরি দেখা করতে দেয়নি। সব যোগাযোগ হয় হোয়াটসঅ্যাপ, ভয়েস চেঞ্জার ও বিভিন্ন নম্বর থেকে। অবশেষে ভিডিও, ভয়েস মেসেজ, নম্বর, সবই যখন অসংগত মনে হয়, তখন ওই নারীর মনে সন্দেহের উদ্রেক ঘটে এবং সরাসরি নিউমার্কেট থানায় যান। অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেন।
ডিবিটেক/ পিবিও/এমইউএম







