বিশ্ব প্রযুক্তি ২০২৫: যেখানে দাঁড়িয়ে
২০২৫ সালটি বিশ্বের জন্য ছিল ‘পোস্ট-এআই’ যুগের শুরু। এই সময়ে জীবনের প্রতিটি স্তরে মিশে গেছে এআই। নানা কাজেই এআই আর টুল নয়; সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কোড লেখেছে। রোগ নির্ণয়ে ব্যবহৃত হয়েছে। জেনারেটিভ এআই শিল্প বদলে দিয়েছে। ২০২৫ সালটি ছিল বড় বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (LLM) চূড়ান্ত উৎকর্ষের বছর।
গুগল, ওপেনএআই, মাইক্রোসফট-সবাই এআইকে পণ্যের কেন্দ্রে এনেছে। ওপেনএআই, গুগল এবং মেটা এমন সব মডেল উন্মুক্ত করেছে যা কেবল চ্যাট করতে পারে না, বরং মানুষের মতো জটিল যুক্তি খণ্ডন করতে সক্ষম। বিশ্বজুড়ে সাদা কলারের চাকরিগুলোতে (White-collar jobs) এআই-এর সংমিশ্রণ ঘটেছে। কোডিং থেকে শুরু করে আইনি পরামর্শ-সবকিছুতেই এআই এখন প্রধান সহায়ক। বিশ্বে এআই নিয়ন্ত্রণ আইন এসেছে। ইইউ এআই অ্যাক্ট কার্যকর করেছে। যুক্তরাষ্ট্র নীতিগত কাঠামো এনেছে।সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ যুদ্ধ। চিপ এখন ভূরাজনীতির অস্ত্র। যুক্তরাষ্ট্র–চীন টানাপোড়েন তীব্র। ২০২৫ সালে ভারত, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া চিপ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
টেলিকম ও স্যাটেলাইট
২০২৫ সালেই আইটিইউ (ITU) এবং বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থা ৬জি-র স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড চূড়ান্ত করার কাজ শুরু করেছে। গবেষণাগারে ৬জি-র গতি প্রতি সেকেন্ডে ১ টেরাবিট (১,০০০ জিবিপিএস) ছাড়িয়ে গেছে। এটি কেবল ইন্টারনেট নয়, বরং 'হলোগ্রাফিক কমিউনিকেশন' (মানুষের ত্রিমাত্রিক প্রতিচ্ছবি সামনে রেখে কথা বলা)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। টেলিকম অপারেটররা এ বছর নেটওয়ার্ক পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। এআই এখন নেটওয়ার্কের ট্রাফিক জ্যাম বা যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটার আগেই তা অনুমান করতে পারে এবং মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তা ঠিক করে ফেলে (Self-healing networks)। এতে অপারেটরদের খরচ কমেছে এবং গ্রাহক সেবার মান বেড়েছে।
লো আর্থ অরবিট স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে। স্টারলিংক, ওয়ানওয়েব, অ্যামাজন কুইপার ২০২৫ সালে কাভারেজ বাড়িয়েছে। বছরটিতে বিশ্ব কেবল ৫জি-তে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিশ্বজুড়ে টেলিকম জায়ান্টরা ‘5G-Advanced’ বাণিজ্যিকীকরণ শুরু করেছে। এটি আগের ৫জি-র চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি গতি দিতে সক্ষম। এর ফলে 'রিয়েল-টাইম' রিমোট সার্জারি এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। হুয়াওয়ে এবং এরিকসনের রিপোর্ট অনুযায়ী, এ বছর বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশে ৫.৫জি নেটওয়ার্কের প্রাথমিক রোল-আউট সম্পন্ন হয়েছে।
অপরদিকে টেলিকম যন্ত্রপাতির বাজারে একক কোনো কোম্পানির (যেমন নোকিয়া বা স্যামসাং) আধিপত্য ভাঙতে ‘ওপেন র্যান’ প্রযুক্তি এ বছর ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন কোম্পানির হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার মিলিয়ে নেটওয়ার্ক তৈরি করা সহজ হয়েছে, যা টেলিকম অবকাঠামো নির্মাণের খরচ কমিয়ে দিয়েছে।
স্যাটেলাইট-টু-ফোন বিপ্লব
২০২৫ সালটি ছিল টাওয়ারবিহীন যোগাযোগের বছর। স্পেস-এক্স ও টি-মোবাইল: ইলন মাস্কের স্টারলিঙ্ক এ বছর তাদের ‘ডিরেক্ট-টু-সেল’ প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত করেছে। এখন সাধারণ স্মার্টফোন দিয়েই কোনো স্পেশাল হার্ডওয়্যার ছাড়াই সরাসরি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মেসেজ এবং কল করা সম্ভব হচ্ছে। এটি মূলত বিশ্বের ‘ডেড জোন’ বা নেটওয়ার্কবিহীন এলাকাগুলোকে চিরতরে মুছে দিয়েছে।
বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণা
চাঁদে মানুষ পাঠানোর চূড়ান্ত ধাপ এ বছর শেষ হয়েছে। নাসার আর্টেমিস মিশনের অধীনে চাঁদের কক্ষপথে মানুষের দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। নাসার পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানিগুলো চাঁদের কক্ষপথে লিজ নেওয়া শুরু করেছে। আইএএস (ISS) এর বিকল্প হিসেবে ব্লু অরিজিন ও স্পেস-এক্স তাদের নিজস্ব বাণিজ্যিক মহাকাশ স্টেশনের মডিউলগুলো উৎক্ষেপণ করেছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ সময় ধরে ফিউশন রিঅ্যাক্টর থেকে শক্তি উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন, যা আগামী দশকের ক্লিন এনার্জি বিপ্লবের ভিত্তি।
প্রকৌশল ও নতুন প্রযুক্তি
দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে পরীক্ষামূলক ৬জি নেটওয়ার্ক চালু হয়েছে, যার গতি প্রতি সেকেন্ডে ১ টেরাবিট পর্যন্ত পৌঁছেছে। টেসলার ‘অপ্টিমাস’ কিংবা বোস্টন ডিনামিকসের রোবটগুলো এ বছর কারখানায় মানুষের পাশাপাশি কাজ শুরু করেছে। বিশেষ করে বিপজ্জনক কাজে রোবটের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
২০২৫ সালে স্বাস্থ্য প্রযুক্তি মূলধারায়।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের বাণিজ্যিক যাত্রা
এতদিন কোয়ান্টাম কম্পিউটার কেবল গবেষণাগারে বন্দি ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে আইবিএম এবং গুগলের তৈরি কোয়ান্টাম প্রসেসরগুলো বাণিজ্যিকভাবে ডেটা সেন্টারে ব্যবহার শুরু হয়েছে। এর ফলে অতি জটিল রাসায়নিক সংকেত সমাধান এবং নতুন ওষুধ আবিষ্কারের গতি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
স্বাস্থ্য ও জেনোমিক্স
২০২৫ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি হাত ধরাধরি করে চলেছে। ল্যাবরেটরিতে ত্রিমাত্রিক বায়ো-প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে মানুষের চামড়া এবং ছোট ছোট টিস্যু তৈরির বাণিজ্যিক অনুমোদন মিলেছে ইউরোপের বেশ কিছু দেশে। জেনেটিক ত্রুটির কারণে সৃষ্ট অন্ধত্ব ও রক্তের রোগ নিরাময়ে ক্রিসপার প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ এ বছর কয়েক গুণ বেড়েছে। বায়োএনটেক এবং মডার্নার ক্যান্সার ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছেছে। আশা করা হচ্ছে ২০২৬ সালেই এটি বাজারে আসবে। ত্রিমাত্রিক বায়ো-প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে তৈরি কৃত্রিম হৃদপিণ্ড সফলভাবে প্রাণিদেহে কাজ করেছে। এটি অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ইতিহাসে বড় অর্জন।
অটোমোবাইল: ড্রাইভারবিহীন পৃথিবীর দিকে
২০২৫ সালে টেসলা, ওয়েমো এবং চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের 'লেভেল-৪' স্বয়ংক্রিয় গাড়ি সাধারণ মানুষের জন্য বড় আকারে উন্মুক্ত করেছে। বিশ্বের বেশ কিছু স্মার্ট সিটিতে এখন চালকহীন ট্যাক্সি বা 'রোবোট্যাক্সি' একটি স্বাভাবিক দৃশ্য। সলিড-স্টেট ব্যাটারির কারণে বৈদ্যুতিক গাড়ির রেঞ্জ এখন এক চার্জে ১০০০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে।
সাইবার যুদ্ধের নতুন রূপ
প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিপদও। ২০২৫ সালে আমরা দেখেছি এআই-চালিত সাইবার অ্যাটাক। হ্যাকাররা এখন এআই ব্যবহার করে সেকেন্ডের মধ্যে হাজার হাজার পাসওয়ার্ড ভাঙার চেষ্টা করছে। এর বিপরীতে ‘কোয়ান্টাম এনক্রিপশন’ বা কোয়ান্টাম সুরক্ষা পদ্ধতি এ বছরই বিশ্বব্যাপী বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাধ্যতামূলক হতে শুরু করেছে।
জ্বালানি বিজ্ঞানে মহাবিপ্লব: নিউক্লিয়ার ফিউশন
বিজ্ঞানের জন্য ২০২৫ ছিল আশার বছর। ইউরোপ এবং আমেরিকার বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে 'নিউক্লিয়ার ফিউশন' (Nuclear Fusion) থেকে দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্ন শক্তি উৎপাদনে সক্ষম হয়েছেন। একে বলা হচ্ছে 'মিনি সান' বা কৃত্রিম সূর্য। এটি জীবাশ্ম জ্বালানি বিহীন পৃথিবীর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রথম বড় ধাপ।
২০২৬ এবং পরবর্তী সময়: আমাদের সামনে কী?
২০২৬ সাল হবে ‘ইনভিজিবল কম্পিউটিং’-এর বছর। স্ক্রিনের দাপট কমে আসবে, জায়গা করে নেবে অগমেন্টেড রিয়ালিটি (AR)। ২০২৬ সালে বিশ্বের প্রধান দেশগুলো এআই-এর নৈতিক ব্যবহার নিয়ে একটি বৈশ্বিক চুক্তিতে আসবে (যেমনটা হয়েছিল জলবায়ু চুক্তির ক্ষেত্রে)। সাধারণ এনক্রিপশন ভেঙে ফেলার মতো শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার বাণিজ্যিক রূপ পেতে শুরু করবে। ফলে সাইবার সিকিউরিটিতে নতুন যুদ্ধের শুরু হবে।শুধু গেম নয়, অফিস আদালত ও সামাজিক যোগাযোগ হবে ত্রিমাত্রিক মেটাবার্সে। ল্যাবরেটরিতে তৈরি মাংস (Lab-grown meat) এবং কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরির খরচ সাধারণের নাগালে চলে আসবে, যা চিকিৎসা ও খাদ্য সংকট সমাধানে বড় ভূমিকা রাখবে। নিউরালিংকের মতো প্রযুক্তিগুলো প্যারালাইজড রোগীদের বাইরে সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করবে। চিন্তা দিয়ে কম্পিউটার চালানোর ধারণাটি বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করবে।
ডিবিটেক/এমইউএম/সিএ







