শব্দতরঙ্গ ও আইওটি প্রযুক্তিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধের নতুন উদ্ভাবন

এডিস মশা শনাক্তে ঢাবি গবেষকদের স্মার্ট এআই ফাঁদ

  • শব্দতরঙ্গ ও ক্যামেরার মাধ্যমে এডিস মশা ধরে ক্লাউড এআই দিয়ে শনাক্ত করে
  • প্রচলিত ফাঁদের অর্ধেকেরও কম খরচে প্রতিটি স্মার্ট ফাঁদ তৈরিতে লাগে ১২ হাজার টাকা
  • ২০২৭ সালে দক্ষিণ সিটির বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় মাঠপর্যায়ে ফাঁদ বসানো হবে

এডিস মশা শনাক্তে ঢাবি গবেষকদের স্মার্ট এআই ফাঁদ
১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০১:১৩  

ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও নজরদারির লক্ষ্যে একটি আধুনিক ইন্টারনেট-সংযুক্ত স্মার্ট ফাঁদ তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একদল গবেষক। ‘MAST-CloudNet’ নামের এই ডিভাইসটি নির্দিষ্ট শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে মশা টেনে আনে, অভ্যন্তরীণ উচ্চপ্রযুক্তির ক্যামেরায় ছবি তোলে এবং ক্লাউড সার্ভারে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে প্রজাতি চিহ্নিত করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের ‘মাইক্রোসিস্টেমস অ্যান্ড ন্যানোইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব’ এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ‘মুঈদ রিসার্চ গ্রুপ’ (জিনোম গাইডেড ভেক্টর কন্ট্রোল অ্যান্ড ইনোভেশন ল্যাব) যৌথভাবে যন্ত্রটি উদ্ভাবন করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা তহবিলের অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণার ফল গত ৮ অক্টোবর বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘আইইইই ট্রানজ্যাকশনস অন ইন্সট্রুমেন্টেশন অ্যান্ড মেজারমেন্ট’-এ প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণাপত্রটির মূল লেখকদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যাপক ড. সাইয়েদ মাহমুদ উল্লাহ, সহযোগী অধ্যাপক ড. খন্দকার আশফাকুল মুঈদ, সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব, প্রভাষক আতিয়া সানজিদা শর্মী, এ এম এম মুনিফ খান, মো. সিয়াম সরকার, নিলয় হাওলাদার, ফাহাদ আরেফিন, আসিফ রহমান দীপ্ত এবং আতিক বিন জাকির।

প্রযুক্তিটির কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে জানা যায়, ওড়ার সময় স্ত্রী এডিস মশার ডানার কম্পাঙ্ক (৩৫০ থেকে ৫০০ হার্জ) হুবহু নকল করে অডিও লিউর বা শব্দ বাজায় ডিভাইসটি। শব্দে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ এডিস মশা কাছে এলে অভ্যন্তরীণ ফ্যান সেগুলোকে টেনে নিয়ে হলুদ আঠালো কাগজে আটকে ফেলে। এরপর ফাঁদের ক্যামেরা ছবি তুলে ক্লাউড সার্ভারে পাঠায়, যেখানে নিউরাল নেটওয়ার্ক ভিত্তিক এআই মডেল মশার প্রজাতি শনাক্ত করে লাইভ ড্যাশবোর্ডে পাঠায়। যেহেতু পুরুষ মশা স্ত্রী মশার আগেই প্রজননস্থলে জন্ম নেয়, তাই পুরুষ এডিসের উপস্থিতি দেখে ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের আগাম সংকেত পাওয়া সম্ভব।

গবেষণাগারে পরীক্ষায় দেখা গেছে, শব্দযুক্ত এই ফাঁদটি সাধারণ নীরব ফাঁদের তুলনায় প্রায় ৫ গুণ বেশি এডিস মশা ধরেছে। ঢাবি ক্যাম্পাসে প্রতিকূল বৃষ্টি ও বাতাসের মধ্যে টানা ৭২ ঘণ্টার ফিল্ড ট্রায়ালে ৪৯টি এডিস মশা ক্যাপচার করে যন্ত্রটি। প্রতিটি ফাঁদ তৈরিতে আনুমানিক ১২ হাজার টাকা খরচ পড়ে, যা আন্তর্জাতিক সিডিসি লাইট ট্র্যাপ (২৫ হাজার টাকা) বা বিজি-সেন্টিনেল ট্র্যাপের (২০ হাজার টাকা) চেয়ে অনেক সাশ্রয়ী। ব্যাটারির সাহায্যে এটি প্রায় সাশ্রয়ী শক্তিতে সাড় ৪ ঘণ্টা চালু থাকতে পারে।

গবেষক দল জানায়, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষার ফল দারুণ আসলেও বড় পরিসরে ব্যবহারে আরও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। এই লক্ষ্যে ২০২৭ সালের জুন-জুলাই মাসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি ফাঁদ বসিয়ে ডেঙ্গু হটস্পটের একটি আগাম মানচিত্র তৈরি করা হবে। ভবিষ্যতে এটি সৌরশক্তি চালিত করা, ওয়াই-ফাই ছাড়া তথ্য পাঠাতে LoRaWAN নেটওয়ার্ক যুক্ত করা এবং আবহাওয়া-সহনশীল করার কাজ চলছে।

যন্ত্রটি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম গবেষকদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি জানান, কোন কোন এলাকায় এডিস মশা বাড়ছে তা আগে থেকে জানা গেলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হয়। এ প্রযুক্তি সেক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।

//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমপি/এমআইএসটি//