নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা

মেকার নয়, সরকার হোক ডাটা কাস্টোডিয়ান ও রেগুলেটর

মেকার নয়, সরকার হোক ডাটা কাস্টোডিয়ান ও রেগুলেটর
১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:২৬  
১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১২:৪১  

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য (এমপি) এবং নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে আজ ১৭ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গলবার। প্রচলিত রীতি ভেঙে বঙ্গভবনের বাইরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে শপথ অনুষ্ঠান আয়োজন সম্পন্ন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির নতুন মন্ত্রিসভা শপথ নেবেন নব নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। তাদের মধ্যে কে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেবেন তা এখনও নির্ধারিত হয়নি। তবে বিএনপি এবং জামায়াতের ইশতেহারে এই খাতটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এই গুরুত্বের ওপর ভর করে নতুন সরকারের সামনের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা নিয়ে ডিজিবাংলায় নিজেদের অভিমত ব্যক্ত করছেন উদ্যোক্তা, নেতা ও খাত সংশ্লিষ্টরা। 

এদের মধ্যে আইসিটি খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য সরকারের ভূমিকার আমূল পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন আইটি উদ্যোক্তা নিটন মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান। তিনি মনে করেন, সরকারের নিজের সফটওয়্যার বা সিস্টেম তৈরির (মেকার) চেয়ে পলিসি মেকার এবং ডাটা কাস্টোডিয়ানের ভূমিকা পালন করা জরুরি। প্রচলিত টেন্ডার-নির্ভর অনুদান বা স্বল্পমেয়াদী পিওসি (POC) মডেলের পরিবর্তে একটি লাইসেন্স-ভিত্তিক টেকসই মডেল চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। যেখানে সেবার মান অনুযায়ী জনগণ সরাসরি সার্ভিস প্রোভাইডার নির্বাচন করবে এবং সরকার সেখান থেকে রাজস্ব আয়ের সুযোগ পাবে। এটি বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করবে বলে অভিমত এই ট্যাপওয়ার সলিউশনস লিমিটেড প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তার। 

ডাটা ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার উন্মুক্তকরণ: এস্তোনিয়ার মডেলের অনুসরণ

প্রযুক্তি খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো তথ্যের অবাধ ও নিরাপদ প্রবাহ। কামরুজ্জামানের মতে, সরকারকে সংবেদনশীল নাগরিক তথ্যের জিম্মাদার হতে হবে এবং এস্তোনিয়ার বিখ্যাত 'X-Road' মডেলের আদলে এপিআই (API) এক্সপোজার নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে বেসরকারি উদ্ভাবকরা সরকারি ডাটা ব্যবহার করে নতুন নতুন জনবান্ধব সেবা, যেমন—ডিজিটাল হেলথ অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা ইন্টিগ্রেটেড ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেম তৈরি করতে পারবে। সরকার মূলত 'ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার' (DPI) তৈরি করে দেবে, যার ওপর ভিত্তি করে উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসায়িক সেবা পরিচালনা করবেন।

ডিজিটাল আইডেন্টিটি ও ই-রেসিডেন্সি: উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ

উন্নত বিশ্বের আদলে বাংলাদেশেও একটি শক্তিশালী ডিজিটাল আইডি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন এই প্রযুক্তিবিদ। তিনি বলেন, এস্তোনিয়ার মতো ডিজিটাল আইডেন্টিটি ও ই-রেসিডেন্সি ব্যবস্থা চালু হলে উদ্যোক্তারা যেকোনো স্থান থেকে অনলাইনে কোম্পানি নিবন্ধন, ব্যাংকিং এবং কর প্রদানের সুবিধা পাবেন। এটি লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমিয়ে ব্যবসার পরিবেশকে সহজ (Ease of Doing Business) করবে। এছাড়া 'গভর্নমেন্ট অ্যাজ আ প্ল্যাটফর্ম' (GaaP) ধারণার বাস্তবায়ন প্রয়োজন, যেখানে থার্ড-পার্টি ডেভেলপাররা সরকারের নীতিমালা মেনে তাদের তৈরি সফটওয়্যার বা প্লাগিন মূল সিস্টেমের সাথে যুক্ত করতে পারবে।

গবেষণা ও বৈশ্বিক সক্ষমতা বৃদ্ধি

আইসিটি খাতে দীর্ঘমেয়াদী রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (R&D)-এর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন ও কর ছাড়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন নিটন মোহাম্মাদ কামরুজ্জামান। তিনি মনে করেন, স্থানীয় আইটি ফার্মগুলোকে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করতে হলে উচ্চপ্রযুক্তির গবেষণায় সরকারি সহায়তা অপরিহার্য। পাশাপাশি, নিজস্ব সিস্টেম তৈরির চেয়ে বেসরকারি খাতের সাথে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) বা স্পেশাল পারপাস ভেহিকল (SPV) মডেলে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি। এতে লাইসেন্সিং বা ট্রানজ্যাকশন ফি-র মাধ্যমে সরকার ও বেসরকারি খাত—উভয়ই দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবে।

কূটনৈতিক তৎপরতা ও সফটওয়্যার রপ্তানি প্রণোদনা

বিদেশের বাজারে দেশীয় সফটওয়্যারের পরিধি বাড়াতে শক্তিশালী কূটনৈতিক পদক্ষেপের বিকল্প নেই। বিশেষ করে জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোর সাথে যৌথ উদ্যোগ (Joint Venture) বাড়াতে ব্যবসায়িক নীতিমালা সহজ করার ওপর জোর দিয়েছেন কামরুজ্জামান। তার মতে, নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হবে লোন-নির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগ ও এসএমই-বান্ধব একটি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। রপ্তানি প্রণোদনা এবং সহজ বৈশ্বিক লেনদেন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশের আইসিটি ইন্ডাস্ট্রি খুব দ্রুতই বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।
ডিবিটেক/ডিএইচই/এমইউএম